উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়ে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম
বাংলাদেশেই প্রথম দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে ‘উন্নয়ন অধ্যয়ন’ বিষয়ে একাডেমিক পড়াশোনা চালু হয়। এ যাত্রার শুরুর গল্পটা যদি একটু বলতেন?
বাংলাদেশে স্পেশালাইজড শিক্ষার শুরুটা হয় বুয়েট বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইকোনমিস্ট তৈরি করেছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে বিশ্বব্যাপী ‘উন্নয়ন সমালোচনা’ শুরু হলো। দেখা গেল, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে ছুটতে গিয়ে প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিপর্যয় ঘটছে। অসমতা বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। এ ‘অতি উন্নয়ন’-এর নেতিবাচক দিকগুলো বোঝা এবং সামাল দেয়ার জন্যই উচ্চতর শিক্ষায় ‘ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’-এর ধারণা চালু হয়। আমাদের অঞ্চলে লিডিং ইউনিভার্সিটি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম এ বিষয়ের ওপর অনার্স প্রোগ্রাম শুরু করে, যাতে আগামী দিনের নীতিনির্ধারক ও সমাজ সংস্কারকরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্ঞান নিয়ে বের হতে পারেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে এ বিষয়ের সুযোগ খুবই সীমিত কেন?
বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন ঢাবি, রাবি এ বিষয়ে পড়ার সুযোগ আছে। বেসরকারি পর্যায়ে ব্র্যাক, নর্থ সাউথ বা আইইউবিতে মাস্টার্স প্রোগ্রাম থাকলেও স্নাতক পর্যায়ে শুধু ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ পড়ানো হচ্ছে। এর মূল কারণ হলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত মার্কেট ডিমান্ড দেখে প্রোগ্রাম খোলে। একসময় বিবিএর খুব চাহিদা ছিল, এরপর ইইই, আর এখন কম্পিউটার সায়েন্সে প্রচুর শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। তবে আমরা খুব ভালো রেসপন্স পাচ্ছি। আমাদের দেখে এখন অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ প্রোগ্রাম খোলার চিন্তাভাবনা করছে।
একজন শিক্ষার্থী কেন ‘ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ বা ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ পড়বে?
সহজ কথায় ভবিষ্যতের উন্নয়নের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জেফরি স্যাক্স বলেছিলেন, টেকসই উন্নয়নের প্রধান বাধা হলো এ বিষয়ে শিক্ষার অভাব। এ শূন্যতা পূরণ করতেই ডেভেলপমেন্ট এডুকেশন প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে যেখানেই কাজ করুক না কেন—হোক সেটা আইটি ফার্ম, করপোরেট সেক্টর বা সরকারি প্রতিষ্ঠান, তার যদি পরিবেশ ও সমাজ নিয়ে সম্যক জ্ঞান থাকে, তবে সে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারবে। আমাদের এখানে শিক্ষার্থীরা শুধু ক্লাসরুমের থিওরিতে আটকে থাকে না, প্রতি সেমিস্টারে তারা ফিল্ডওয়ার্কে যায়, এনজিও বা সরকারি প্রজেক্ট ভিজিট করে।
এ বিষয়ের পাঠ্যক্রম সাধারণত কেমন হয়?
এটি একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি বা বহুমুখী প্রোগ্রাম। উন্নয়ন বলতে আমরা সামাজিক ও প্রাকৃতিক দুই ধরনের উন্নয়নকেই বুঝি। তাই আমাদের সিলেবাসে বাংলাদেশ স্টাডিজ, পরিবেশ বিজ্ঞান, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোর চমৎকার সমন্বয় থাকে।
পড়াশোনা শেষে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ কেমন?
টেকনিক্যাল ফিল্ড ছাড়া প্রায় সব জায়গাতেই গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা রয়েছে। সরকারি চাকরি, আন্তর্জাতিক এনজিও এবং গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে তারা কাজ করতে পারে। এছাড়া বর্তমানে ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর খুব কদর বাড়ছে। যেমন ওয়ালটনের মতো বড় কোম্পানিগুলো সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করছে। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা চার বছর ধরে ক্লাসরুম ও ফিল্ডওয়ার্কের মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন করে, তা দিয়ে প্রাইভেট সেক্টরেও তারা দারুণ লিডারশিপ দিতে পারবে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কেমন?
বিদেশে এ বিষয়ের ওপর উচ্চশিক্ষার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী ফুল স্কলারশিপ নিয়ে কানাডা ও যুক্তরাজ্যে পড়ছেন। এছাড়া আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে মাস্টার্স ও পিএইচডি করার চমৎকার সুযোগ ও ফান্ডিং রয়েছে। উন্নয়ন অধ্যয়ন বা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশকিছু নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে কানাডার লেকহেড ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব গুয়েলফ, যুক্তরাষ্ট্রের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটি এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়া অন্যতম। এছাড়া নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি অব টুয়েন্টে এবং কৃষি ও পরিবেশ গবেষণার জন্য বিশ্বসেরা ভাগেনিঙেন ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড রিসার্চ।










