সেই থেকে সারা বিশ্বে জন্ম নিয়েছেন বহু বিখ্যাত আলোকচিত্রী। আমাদের এশিয়া মহাদেশ, এরপর ভারতীয় উপমহাদেশ, তারপর আমাদের অবিভক্ত বাংলা অঞ্চল, এরও পরে বাংলাভাষীদের স্বদেশ আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশেও জন্মেছেন বহু আলোকচিত্রী। তারা সবাই সেলুলয়েডের ওপর জিলেটিনে লাগানো আলোক সংবেদনশীল রাসায়নিকের ওপর অথবা বর্তমান ডিজিটাল সেন্সরের পিক্সেলের ওপর নিজেদের শৈল্পিকতার নিদর্শন ফুটিয়ে তুলে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।
এ স্মরণীয়-বরণীয়দের মধ্যে পাঞ্জাবে জন্ম নেয়া হিন্দিভাষী রঘুনাথ রাই চৌধুরী ওরফে রঘু রাইকে কেন আমরা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের বাংলাভাষীরা মনে রাখব?
কারণ কি এটাই যে রঘু রাই অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের দৃশ্যমাধ্যমে এক অনন্য চিত্রভাষা নির্মাণ করেছেন, নাকি ভারতের রাজনীতি, বিপর্যয়, আধ্যাত্মিকতা এবং দৈনন্দিন জীবনের এক অনন্য ‘ভিজুয়াল আর্কাইভ’ নির্মাণ করেছেন। নাকি যুদ্ধ থেকে ধ্রুপদি শিল্পকলাকে নান্দনিকতার মোড়কে উপস্থাপন করেছেন, নাকি একটি বৃহৎ বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের বিচিত্র মানুষের জীবনের বেঁচে থাকার সংগ্রামের নানা দিক ক্যামেরায় এঁকেছেন? নাকি খুবই অল্প বয়সে ‘পদ্মশ্রী’ পেয়েছেন? নাকি বিশ্ববিখ্যাত ফটোগ্রাফি এজেন্সি ‘ম্যাগনাম’-এর এ অঞ্চলের প্রথম সদস্য হয়েছেন? নাকি তাকে ভারতীয় আলোকচিত্রের একটি বিশেষ ধারার জনক বলা হয়? কোন কারণে তাকে আমরা মনে রাখব?

না। যারা আলোকচিত্র নিয়ে চর্চা করেন, যারা বিশ্ব আলোকচিত্র নিয়ে পাঠ করতে সচেষ্ট তাদের কথা বাদ দিলে এর কোনোটাই রঘু রাইকে আমাদের সাধারণ বাংলাদেশীদের মনে রাখার কারণ নয়।
আমাদের মনে রাখার কারণটা হলো আমাদের দেশের জন্মের সময়কে, আমাদের জাতির জন্মযন্ত্রণাকে তিনি কেবল তার ক্যামেরার যান্ত্রিকতায় অ্যাপারচারের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করা লেন্সের প্রতিফলিত আলোর সঙ্গে শাটারের শব্দে ফ্রেমবন্দি করেননি, তিনি তার সাদা-কালো সেলুলয়েডের রাসায়নিক ক্যানভাসের পাশাপাশি একাত্তরের সংগ্রামকে, শরণার্থী মানুষের জীবনসংগ্রামকে, মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের সংগ্রামকে তার হৃদয়ের ক্যানভাসেও এঁকে নিয়েছিলেন। আমাদের জাতির জন্মের উত্তাল দিনগুলোতে তার ক্যামেরা ছিল কোটি গৃহহীন মানুষের প্রাণের কণ্ঠস্বর, মাতৃভূমিকে রক্ষায় জীবন বাজি রাখা মুক্তিযোদ্ধার বলিষ্ঠ সাহসের দলিল, পাকিস্তানি বুর্জোয়া মানসিকতার ঘাতকদের নির্মমতার প্রমাণ।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষে বছর দুয়েক চাকরি করে বাঁধাধরা নিয়মের প্রতি বিরক্ত তরুণ রঘু রাই তার ১১ বছরের বড় ভাই এস পলের দেয়া একটি ছোট ক্যামেরায় ফিল্ম ও এক্সপোজার (শাটার অ্যাপারচারের সমন্বয়) সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা নিয়ে নরম আলোয় ‘লো ডেপথ অব ফিল্ড’ (ব্যাকগ্রাউন্ড ঝাপসা) করে বাচ্চা গাধার ছবি তোলার মাধ্যমে আলোকচিত্রজীবন শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেলুলয়েডের জিলেটিনে তিনি তার স্বাক্ষর ও শৈলী বিকাশ করতে শুরু করেন। যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না তার। কম্পোজিশন, আলো-ছায়ার বিন্যাস আর ফিল্ম ডেভেলপিং ও প্রিন্টিংয়ের কাজ তিনি বড় ভাইকে দেখে দেখে শিখেছেন। তার বড় ভাই এস পল ছিলেন ‘দ্য এক্সপ্রেস’-এর আলোকচিত্রী, আর আরেক পথপ্রদর্শক কিশোর পারেখ ছিলেন ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর প্রধান আলোকচিত্রী। এ দুই অগ্রজ ও বন্ধুর পথ অনুসরণ করে রঘু রাই যোগ দেন ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায়।
এ অঞ্চলের আলোকচিত্রে তখন প্রাকৃতিক দৃশ্য, বৃদ্ধ মানুষের কুঁচকে যাওয়া মুখ, সুন্দর মেয়ে, ছোট ছোট শিশুর ছবি তোলাই ছিল সাধারণ ঘটনা। কিন্তু রঘু রাই এসবের চেয়ে বাস্তবতার কাছাকাছি যেতে চেষ্টায় রত ছিলেন প্রথম থেকেই। তাই তো রঘু রাইয়ের কাজে ফরাসি আলোকচিত্রী ‘অরি কার্তিয়ের-ব্রেসোঁ’র ‘ডিসাইসিভ মোমেন্ট’-এর ধারাবাহিকতা দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ঘটনা ঘটার বিশেষ মুহূর্তকে আলোকচিত্রে ধরে রাখার সেই শিল্পশৈলীকে বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে আলোকচিত্রে একেকটি মুহূর্তকে নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ করেছিলেন।
রঘু রাইয়ের কর্মজীবনের শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি দেখেছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। ১৯৭১ সাল, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণে অগণিত বাঙালি জীবন বাঁচাতে ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে, দলে দলে থাকছে গাছতলায় আর যৎসামান্য তাঁবু-জাতীয় শিবিরে। আর দলে দলে আসছে ক্ষুধায় কাতর, আশ্রয়হীন মানুষ, জীবন বাঁচাতে, শাসকদের বর্বরতা থেকে রক্ষা পেতে অতি সাধারণ শেষ সম্বল বগলে নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা-বাবা ও পরিবারের নিষ্পাপ শিশুদের নিয়ে কাদামাটি, বৃষ্টি, বন্যা মাড়িয়ে আসছে তো আসছেই। বনগাঁও, বেনাপোল আর যশোর রোডে হাজারে হাজারে মানুষ, বৃদ্ধ-শিশু বাঁচার আশায় ঠাঁই খুঁজছে।

রঘু রাইয়ের তখন বয়স ৩০ বছর পুরো হয়নি। তিনি সে সময়েই স্টেটসম্যান পত্রিকার পেশাগত কাজে কলকাতা হয়ে পৌঁছেন বাংলার দুঃখী মানুষের কাছে। পরম মমতায় আলোকচিত্রের ক্যানভাসে তুলে ধরেন তাদের জীবন, তাদের সংগ্রাম আর তাদের বিজয়। বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জন করতে মানুষকে যে সীমাহীন মূল্য দিতে হয়েছে, তা তিনি আলোকচিত্রের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছেন। তিনি শরণার্থী শিবির, সীমান্ত অঞ্চল এবং যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক মূল্যকে ধারণ করে অসংখ্য মর্মস্পর্শী ছবি তুলেছেন। সেসব ছবিতে ক্ষুধা, ক্লান্তি ও আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে বেড়ানো শরণার্থীদের অসহায়তা ফুটে উঠেছিল, যা সারা বিশ্বে গভীর সাড়া জাগিয়েছিল। ছবিগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক শক্তিশালী ভিজুয়াল দলিল রূপে রয়ে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭২ সালে ভারতে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত হন। পরে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার অনার’ প্রদান করে। তিনি বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। যে বাংলাদেশকে তিনি জন্মাতে দেখেছেন সেই বাংলাদেশ যে তাকে ভোলেনি, এটা দেখে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন।
আজ রঘু রাই নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ১৯৭১ সালে তোলা প্রতিটি আলোকচিত্রের নেগেটিভ, প্রিন্ট ও অ্যালবাম আমাদের রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে বাংলাদেশের বাঙালির প্রজন্মের পর প্রজন্মান্তরে রয়ে যাবে। ফ্রেমবন্দি সেই মুহূর্তগুলো কখনো পুরনো হবে না। তা মনে করিয়ে দেবে কতটা ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলার এ স্বাধীনতা। তিনি কেবল একজন আলোকচিত্রী নন, ছিলেন সময়ের এক নির্মোহ সাক্ষী এবং আমাদের অমোঘ বন্ধু। শরীরী অস্তিত্বে তিনি আজ না থাকলেও বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণা আর মুক্ত বাতাসের স্পন্দনে তার ধারণ করা সেই অমর মুহূর্তগুলো বেঁচে থাকবে চিরকাল।
তার বিভিন্ন কাজ
মাদার তেরেসা, ইন্দিরা গান্ধী, দালাই লামা, বোম্বের ওপর কাজ, দিল্লি, খাজুরাহ, তাজমহল, কলকাতা, মুম্বাই, ভোপাল ট্র্যাজেডির কাজসহ বাংলার মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া দুর্দশা, সেই দুর্দশা থেকে বাঁচার জন্য বাঙালির বিদ্রোহ ও সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামে বাঙালির বিজয়কে ধরে রাখার ছবির জন্য বাংলাদেশের মানচিত্র আর লাল-সবুজ পতাকার প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে রঘু রাইয়ের নাম মিশে থাকবে পরম কৃতজ্ঞতায়।
মীর শামছুল আলম বাবু: আলোকচিত্রী










