যুগ চলছে ব্লকবাস্টারের। খুব বেশি জনপ্রিয় না হলে সে প্রবাহে টিকে থাকা মুশকিল। তার ওপর যদি সৃষ্টিশীল মানুষটা নিভৃতচারী হন। সেক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্ম কিংবা তার স্রষ্টা সম্পর্কে কিছু জানাটা কঠিন। তিরজাহ গারউড নামটা অনেকটাই সে রকম। তার সৃষ্টিকর্মের দিকে তাকালে বিস্মিত হতে হয়; অথচ মূলধারার চিত্রশিল্পে সেভাবে চর্চিত হয় না তার নাম।
১৯৫১ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে মারা যান তিরজাহ গারউড। তিনি মূলত পরিচিত ছিলেন এরিক রাভিলিয়াসের স্ত্রী হিসেবেই। এরিক অল্প বয়স থেকেই চিত্রশিল্পী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। সেদিক থেকে কিছুটা প্রভাব তার ওপর যে পড়েনি, তেমন না। কিন্তু শিল্পী হিসেবে তার নিজস্বতাও কম নয়। তাছাড়া তিরজাহ নিজেও যে প্রভাবিত করেছিলেন এরিককে; সেটাও দেখা যায় এরিকের কয়েকটি সৃষ্টিকর্মে। তিরজাহ প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিচিতি পান ১৯২৯ সালে আঁকা দ্য ক্রোকোডাইল চিত্রকর্মের জন্য। সেখানে এক সারি বালিকাকে আঁকেন তিনি। ছবিটা তিনি এঁকেছিলেন এসেক্সের গ্রেট বার্ডফিল্ডের বাসায়। তাদের পাশেই বসবাস করতেন চিত্রকর এডওয়ার্ড বাউডেন ও তার স্ত্রী শার্লোট।

তিরজাহ ও শার্লোট তাদের অধিকাংশ কাজই করেছেন গ্রেট বার্ডফিল্ডে। তবে তিরজাহ ছিলেন অনেক বেশি ব্যস্ত। তার কাজও ছিল অনেক বেশি অকৃত্রিম। ছবি আঁকাটা ছিল তার প্রধান শখ। তিরজাহের পিতা ছিলেন কর্নেল। সে হিসেবে শৈশব কেটেছে ইস্টবার্নে। বিয়ের আগে রাভিলিয়াস ছিল তার শিক্ষক। ১৯২৭ সালে তার দ্য ফোর সিজনস চিত্রকর্মকে সেরা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সোসাইটি অব উড। পরবর্তী সময়ে টাইম ম্যাগাজিনেও সেটার প্রশংসা করা হয়। ১৯৩০ সালে তিনি রাভিলিয়াসকে বিয়ে করেন। তার পরিবার পুরোপুরি মেনে নেননি এ সম্পর্ক। কিন্তু বিয়ে তার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। রাভিলিয়াসের পাশাপাশি গারউড নিজেও শিল্পকলায় মনোযোগ দেন এবং আশাতীত সাফল্য অর্জন করেন। তবে এসেক্সে শিফট হওয়ার পর তাদের সম্পর্ক ক্রমে জটিল হতে থাকে। তারা একটা পরিবার শুরু করেন ঠিক।
কিন্তু তাদের দুজনেই ভিন্ন প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যান। তিরজাহ প্রেমে পড়েন চিত্রশিল্পী জন আলড্রিজের। তবে সবকিছু স্বাভাবিক হয়নি আর। ১৯৪২ সালে একের পর এক আসতে থাকে আঘাত। তিরজাহ অসুস্থ হয়ে পড়েন ব্রেস্ট ক্যানসারে। কিছুদিনের মাথায় রাভিলিয়াস আইসল্যান্ডে বিমান দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হন। তিনি তার তিন সন্তানের মুখ আর দেখতে পারেননি। দেখতে পারেননি তিরজাহকেও।
তিরজাহ সবসময় আশাবাদী ছিলেন। তার কাজেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। হাসপাতালে থাকার সময় তিনি লিখতে শুরু করেন প্রবল আগ্রহ নিয়ে। তার স্মৃতিকথা লং লিভ গ্রেট বার্ডফিল্ড। রাভিলিয়াসের মৃত্যুর পর তিনি নতুন করে আবার পেইন্টিং শুরু করেন। তিনি আবার বিয়ে করে গুছিয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। তবে বারবার ফিরে এসেছে ব্রেস্ট ক্যান্সার। তিনিও প্রবল সহনশীলতার মতো মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছেন সৃষ্টির দিকে। জীবনের শেষ ভাগে বসেও তার সৃষ্টিকর্মের সংখ্যা বিশের কম হবে না।
তিরজাহ চলে গেছেন অনেক আগে। শিল্পবোদ্ধাদের কেউ কেউ মনে করেন তিরজাহর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে নিহিত পরাবাস্তব ভাব এসেছে ভিক্টোরিয়া যুগের চিত্রকলা থেকে। তরুণ শিল্পীদের জন্য তিরজাহ এখনো অনাবিষ্কৃত কিংবা আধা আবিষ্কৃত। হয়তো শিগগিরই তা সামনে আসবে। তিরজাহর জাদুর দুনিয়া আলোচিত হবে মূলধারায়।










