লন্ডনে আয়োজন হচ্ছে বিশেষ একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী। তবে সেটি কেবল শিল্প উপভোগেরই নয়, বরং ইতিহাস সংরক্ষণের এক জরুরি আহ্বান। কিংবদন্তি আলোকচিত্রী লি মিলারের প্রায় একশ বছরের পুরনো হাজার হাজার নেগেটিভ বাঁচাতে তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
‘লি মিলার আর্কাইভস’-এর সূচনা হয় ১৯৭৭ সালে মিলারের মৃত্যুর পর। তখন তার সাসেক্সের বাড়ি ফার্লিজ হাউজের অ্যাটিক থেকে হঠাৎ করেই আবিষ্কার হয় তার বিপুল আলোকচিত্র ও লেখার ভাণ্ডার। এত বছর ধরে অবহেলিত অবস্থায় থাকা এ সংগ্রহের বহু নেগেটিভ এখন চরম ঝুঁকির মুখে। সেগুলো সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে প্রায় ৬০ হাজার নেগেটিভ ও প্রিন্টকে হিমায়িত (ফ্রিজিং) করে রাখার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে লন্ডনের লিন্ডসি ইনগ্রাম গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনী ‘লি মিলার: পারফরম্যান্স অব আ লাইফটাইম’ থেকে বিক্রি হওয়া কাজের মাধ্যমে।
জানুয়ারিতে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে মিলারের কাজের একটি বিশেষ দিক তুলে ধরা হয়েছে। মূলত নাটক, মঞ্চায়ন ও পারফরম্যান্স তার আলোকচর্চার কেন্দ্রে ছিল। ১৯২৯ সালে তিনি প্যারিসে যান। সেখানে স্যুররিয়ালিস্টদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা হয়। এরপর তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ বছরগুলোয় ‘ভোগ’ ও ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনের যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। এ পুরো সময়ে লি মিলারের কাজগুলো নিয়েই প্রদর্শনী আয়োজন হয়েছে। প্রদর্শনীতে থাকা কাজগুলোর মূল্য ৩ হাজার ৮০০ পাউন্ড থেকে শুরু হয়েছিল। এর কিছু প্রিন্ট বর্তমানে ব্রিটেনেও প্রদর্শিত হচ্ছে।
লি মিলারের নাতনি ও আর্কাইভের পরিচালক আমি বুহাসান জানান, প্রায় ৫০ বছর আগে একেবারে আকস্মিকভাবেই এ সংগ্রহের সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমার মা-বাবা ছোটবেলার ছবি খুঁজতে অ্যাটিকে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে এলেন সেন্ট-মালো অবরোধের কন্টাক্ট শিট আর পাণ্ডুলিপি নিয়ে।’ সেটিই ছিল মিলারের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র কাভারেজ—যেখানে তিনি প্রথম দিককার নারী যুদ্ধ সংবাদদাতাদের একজন হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন। আশ্চর্যের বিষয়, মিলার নিজে কখনই তার পেশাগত কৃতিত্ব নিয়ে কথা বলতেন না। যুদ্ধের বিভীষিকা, বিশেষ করে ডাখাউ ও বুকেনভাল্ড কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মুক্তি প্রত্যক্ষ করার বিষয়টি তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাত ও প্রসবোত্তর বিষণ্ণতায় ভুগতে থাকা মিলার ধীরে ধীরে আলোকচিত্রচর্চা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। ১৯৪৯ সালে ফার্লিজ হাউজে চলে এসে তিনি তার সব নেগেটিভ ও প্রিন্ট বাক্সবন্দি করে রাখেন। আর কখনো খুলে দেখেননি।
আজ সেই বাক্সবন্দি স্মৃতিই বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। নরওয়ের প্রেউস মিউজিয়ামের সহায়তায় নেগেটিভগুলো ফ্রিজিং পদ্ধতিতে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা আলোকচিত্র সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে স্বীকৃত। ভবিষ্যতে পুরো আর্কাইভ ডিজিটাইজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে তা সম্পূর্ণভাবে তহবিলের ওপর নির্ভরশীল।
দীর্ঘদিন অবমূল্যায়িত থাকা এক নারী শিল্পীর কাজকে আজ যে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, তা সহজে আসেনি। বুহাসান বলেন, ‘একসময় তার কাজের দাম ছিল খুচরো পয়সার মতো। আমাদের লড়াই করতে হয়েছে তাকে তার নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠা করতে।’
সেই লড়াইয়ের ফল আজ স্পষ্ট।
ফার্লিজ হাউজকে একটি পূর্ণাঙ্গ দাতব্য প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার লক্ষ্য নিয়ে আর্কাইভ কর্তৃপক্ষ এগোচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লি মিলারের কাজ ও গল্প সংরক্ষিত থাকে। এ নিয়ে বুহাসান বলেন, ‘তাকে স্বীকৃতি দিতে এত কষ্ট হয়েছে। এখন যদি ভবিষ্যতের জন্য কিছুই না থাকে, সেটা হবে সবচেয়ে বড় দুঃখ।’
সূত্র: দি আর্টনিউজপেপার










