দশকের পর দশক ধরে শিল্পবাজারের হৃৎপিণ্ড ছিল নিউইয়র্ক, লন্ডন কিংবা হংকংয়ের মতো শহরে। কিন্তু সময় বদলেছে, তার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে অর্থের প্রবাহ আর বিলাসবহুল পণ্যের বাজারও, বাণিজ্যের ঢেউ আছড়ে পড়ে নতুন তীরে। চীনের বাজার যখন মন্দার ছায়ায় ঢাকা, শিল্পজগতের দৃষ্টি ঘুরেছে মরুর দেশের দিকে। উপসাগরীয় অঞ্চল, বিশেষত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আজ শিল্পবাজার বা আর্ট মার্কেটের নতুন মরূদ্যান। রুশ বিনিয়োগের জোয়ার, সৌদি ভিশন ২০৩০-এর সংস্কৃতি বিপ্লব, আর তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীল উদ্দীপনায় এখানে গড়ে উঠছে শিল্পের ভিন্ন এক মহাদেশ।
চীনে ২০২৪ সালে বিলাসবহুল পণ্য বিক্রি কমেছে প্রায় ১৮-২০ শতাংশ, আর শিল্পবাজারে পতন হয়েছে আরো বেশি, ৩১ শতাংশ। আর্ট বেসেল/ইউবিএসের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুসারে, এ পতনের ফলে চীন পিছিয়ে পড়েছে বিশ্ব শিল্পবাজারের তৃতীয় অবস্থানে, যার স্থান দখল করছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ‘টাকা যেখানে, শিল্পবাজার সেখানেই’—এ চিরন্তন নীতিই অনুসরণ করে সেদিকে ঝুঁকছে বড় বড় নিলাম সংস্থা ও গ্যালারি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, বিশেষ করে দুবাই বিশ্বের অন্যতম করমুক্ত এলাকা হওয়ায় এরই মধ্যে ধনীদের কাছে নিরাপদ বিনিয়োগস্থল হিসেবে পরিচিত। উপরন্তু দেশটি রুশ নাগরিকদের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। ফলে রাশিয়ার বিত্তবান নাগরিকদের অনেকেই বসবাস শুরু করেছেন এ শহরে। সাংস্কৃতিক পর্যবেক্ষক ভেরা আলখোভার ভাষায়, ‘আধা মস্কো এখন দুবাইয়ে।’ যদিও এ রুশ অর্থ এখন পর্যন্ত শিল্পবাজারে খুব একটা ঢুকেছে বলে প্রতীয়মান নয়, তবে সম্পত্তির বাজারে এর প্রভাব স্পষ্ট।
এ মুহূর্তেই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আর্ট বেসেলকে আবুধাবি আর্ট ফেয়ার পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হতে পারে। আবার আবুধাবির রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সথবি’সের মতো প্রতিষ্ঠানে ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের খবরও এসেছে।
শিল্পবাজারের ক্ষেত্রে আমিরাতের চেয়ে এগিয়ে সৌদি আরব। শিল্পবাজারের প্রকৃত নজর এখন ঘুরে গেছে সেদিকেই। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) নেতৃত্বে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে সংস্কৃতি ও পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প। তার মধ্যে অন্যতম আলউলা প্রজেক্ট। কয়েক বছর আগেও এটি ছিল জনমানবহীন মরুভূমি। এখন সেখানে চলছে আন্তর্জাতিক আর্ট ইনস্টলেশন, পারফরম্যান্স আর ডিজিটাল শিল্প প্রদর্শনী। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও আধুনিক শিল্পের মিশেল সেখানে তৈরি করছে সৌদি সংস্কৃতির এক নতুন পরিচয়।
এর পেছনে রয়েছে কৌশলী বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব। ইউরোপ ও এশিয়ার নামকরা কিউরেটর, শিল্পী ও গ্যালারি পরিচালকরা এখন সৌদি প্রজেক্টে অংশ নিচ্ছেন। এটি শুধু সৌদি আরবের শিল্পভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে না, বরং দেশের ভাবমূর্তিও এক নতুন কাঠামোয় নির্মাণ করছে।
এরই মধ্যে রিয়াদে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রথমবারের মতো আর্ট উইক এবং দ্বিতীয়বারের মতো ইসলামিক আর্টস বিয়েনালে, যা বেশ ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। জেদ্দায় গড়ে উঠেছে টিমল্যাব বর্ডারলেস জাদুঘর—এশিয়ার সর্বাধিক জনপ্রিয় ইন্টারঅ্যাক্টিভ আর্ট অভিজ্ঞতার একটি বিশাল শাখা, যাতে সৌদি সরকারের অঘোষিত বিনিয়োগ রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।
বিশ্বখ্যাত অকশন হাউজ সথবি’স ও ক্রিস্টি’স উভয়ই এরই মধ্যে সৌদি আরবে নিজস্ব কার্যক্রম শুরু করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সথবি’স ডিরিয়াহ শহরে প্রথম নিলামটি আয়োজন করে। বহুমাত্রিক এ আয়োজনে ব্যাংকসি, মাগ্রিত কিংবা রেফিক আনাদলের শিল্পকর্ম থেকে শুরু করে বিলাসবহুল হ্যান্ডব্যাগ ও গহনা পর্যন্ত ছিল তালিকায়। যদিও হ্যান্ডব্যাগ ও গহনার বাজার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, তবে শিল্পকর্মের বিক্রি তুলনামূলক ভালো হয়। নিলামটি আয় করে ১ কোটি ৭৩ লাখ ডলার এবং ৬৭ শতাংশ আইটেম বিক্রি হয়।
বহিরাগতদের কাছে এটি লাভজনক মনে না হলেও সথবি’সের মুখপাত্র জানিয়েছেন, এটি আর্থিকভাবে লাভজনক ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ক্রেতাদের ৩৫ শতাংশ এ হাউজের সঙ্গে প্রথমবার লেনদেন করেছেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংগ্রাহকদের একটি বড় অংশ প্রথমবারের মতো বাজারে পা রেখেছেন।
সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশই ৩০ বছরের নিচে। অর্থাৎ মিলেনিয়াল ও জেনারেশন জেড—দুই শ্রেণীকেই ধরে রাখতে পারলে শিল্পবাজারের ভবিষ্যৎ এখানে নিরাপদ। আর এদের আকর্ষণের মাধ্যম হতে পারে ডিজিটাল আর্ট, ইন্টারঅ্যাক্টিভ এক্সপেরিয়েন্স ও ফিউশনধর্মী প্রদর্শনী। আজকের তরুণদের কাছে শিল্পের অর্থ কেবল দেয়ালে টাঙানো চিত্র নয়; বরং সেটি হতে পারে একটি ইমারসিভ, প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রা।
ধনকুবেরদের সংখ্যা বাড়লেও শিল্পের বাজার সম্প্রাসরণ কিন্তু প্রায় স্থবির। প্রশ্ন উঠছে, এ বিপুল সম্পদের মালিকরা কেন শিল্পে বিনিয়োগ করছেন না? বিলাসবহুল পণ্যকে অনেকেই শিল্পে বিনিয়োগের ‘গেটওয়ে ড্রাগ’ বলেন। এ গেটওয়ে থেকে কেউ কেউ হয়তো সত্যিকারের সংগ্রাহকও হয়ে ওঠেন। সৌদি আরবের প্রথম নিলামের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিলাসপণ্যের তুলনায় শিল্পকর্মের বিক্রি ভালো হয়েছে। এটি শিল্পবাজারের জন্য একটি চমকপ্রদ ইঙ্গিত। এটি যদি কাজে লাগানো যায়, তবে এ নতুন অঞ্চল হতে পারে পরবর্তী বৈশ্বিক শিল্প রাজধানী।
বাণিজ্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতির এ মোড়ে উপসাগরীয় অঞ্চল একটি বড় ভূমিকা নিতে যাচ্ছে। নিউইয়র্ক কিংবা প্যারিস নয়; আগামী দশকে হয়তো রিয়াদ, জেদ্দা কিংবা আবুধাবি হবে সেই শহর, যেখানে বিশ্বখ্যাত শিল্পীরা প্রদর্শনী করবেন, যেখানে তরুণ সংগ্রাহকরা গড়ে তুলবেন নতুন শিল্প ঐতিহ্য। উপসাগরীয় অঞ্চলে শিল্পবাজারের উত্থান হয়তো শুরু, তবে নিশ্চিত নয় এটি টেকসই হবে কিনা। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টায় এ সাংস্কৃতিক জোয়ার গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ। কিন্তু এটি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, কতটা জনভিত্তিক এবং কতটা স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পারবে, তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, শিল্পের মানচিত্র এখন বদলাচ্ছে। আর এ নতুন মানচিত্রে মরুভূমির বুকে হয়তো রঙিন রেখা আঁকবে আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। কে জানে একদিন হয়তো সৌদি আরবে পিকাসোর একটি অর্ধসমাপ্ত স্কেচের দাম উঠবে কয়েক মিলিয়ন ডলার। হয়তো দেখা যাবে একসময় মরুভূমিতে ফ্যালকন শিকারি একজন ব্যাখ্যা করে দেবেন সালভাদর দালির এক বিমূর্ত স্বপ্নের মানে। কেবল তেল ও রত্নের বাজার নয়; হয়তো তারা খুঁজবেন ভ্যান গঘের উন্মাদ রঙ, ম্যাগ্রিতের নিঃশব্দ ধাঁধা, ক্লদ মোনের আলো-ছায়ার খেলা, পিকাসোর ভাঙা চেহারা কিংবা জর্জিয়া ও’কিফের মরুপ্রান্তরের বুনো সৌন্দর্য। হয়তো এমন দৃশ্যও দেখা যাবে আলউলার বালুকাবেলায় গড়ে উঠছে আধুনিক গ্যালারি, যেখানে রিয়াদের ধনকুবেররা দল বেঁধে যাচ্ছেন—কে না চায় এক টুকরো ম্যাটিস কিংবা অরফোর একফোঁটা রঙ নিজের দেয়ালে?










