একসময় শিল্পের জগতে প্রবেশ মানেই ছিল দীর্ঘ সাধনা। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো শিল্পীকে বছরের পর বছর মানবদেহ, প্রকৃতি ও আলোর ভাষা আয়ত্ত করতে হয়েছে। পাবলো পিকাসোর মতো শিল্পীও প্রচলিত শিল্পভাষাকে ভেঙে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছেন। অর্থাৎ শিল্পীর পরিচয় গড়ে উঠত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব সৃজনশীলতার দীর্ঘ চর্চার মধ্য দিয়ে। অথচ আজ সেই শিল্পের জগতে প্রবেশের দরজা খুলে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। গুহার দেয়ালে হরিণ এঁকে যে মানুষটি হাজার বছর আগে নিজের অস্তিত্বের চিহ্ন রেখে গিয়েছিল, আজ তারই উত্তরসূরি দেখছে, একটি যন্ত্র কয়েক সেকেন্ডে তার চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত ছবি তৈরি করতে পারে। কয়েকটি নির্দেশনা বা ‘প্রম্পট’ দিয়েই এখন তৈরি হচ্ছে এমন সব ছবি, যা রঙ, কম্পোজিশন ও নান্দনিকতায় অনেক সময় পেশাদার শিল্পকর্মের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ফলে দীর্ঘ সাধনা যেখানে ছিল সৃষ্টির প্রধান শর্ত, সেখানে এআই এসে প্রশ্ন তুলছে—শিল্পী হওয়ার জন্য এখন কি সত্যিই তুলির প্রয়োজন, নাকি প্রয়োজন শুধু একটি ভালো ধারণা ও তাকে ভাষায় প্রকাশ করার দক্ষতা?

সম্ভাবনা ও সংকটের এমন সময়ে দাঁড়িয়ে শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। হলিউডের চিত্রনাট্যকাররা এরই মধ্যে এআই দিয়ে তৈরি গল্পের প্রভাব থেকে নিজেদের কাজ রক্ষার জন্য পথে নেমেছেন। অন্যদিকে ‘আই-ডা’র মতো রোবট শিল্পীর কাজও নিলামে বিপুল অর্থে বিক্রি হচ্ছে। ফলে প্রশ্নটি আর কেবল ‘এআই কি শিল্প তৈরি করতে পারে?’র মধ্যে আটকে নেই। বরং প্রশ্নটা আরো অস্বস্তিকর, এআই যদি মানুষের চেয়েও নিখুঁত শিল্প তৈরি করতে পারে, তাহলে শিল্পীর প্রয়োজনটাই-বা কোথায়?

22

শিল্পের ইতিহাস অবশ্য এ ভয়কে একেবারে নতুন কোনো গল্প বলে মনে করে না। প্রযুক্তি যতবার শিল্পীর সামনে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে এসেছে, ততবারই শিল্প নিজের পথ বদলেছে। উনিশ শতকে ফটোগ্রাফির আবির্ভাবের সময়ও চিত্রশিল্পীদের মধ্যে একই আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। ১৮৪০ সালে প্রথমবার ছবি দেখার পর ফরাসি চিত্রশিল্পী পল দেলারোশ নাকি বলে উঠেছিলেন, ‘আজ থেকে চিত্রকলা মৃত!’

কিন্তু চিত্রকলা মরেনি। বরং ক্যামেরার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সে নিজের চেহারাই বদলে ফেলেছিল। ক্যামেরা যেখানে বাস্তব দৃশ্যকে হুবহু ধরে ফেলতে পারে, সেখানে চিত্রশিল্পীরা ভাবতে শুরু করলেন—যন্ত্র যা পারে না, আমি কী করতে পারি? সেই প্রশ্ন থেকেই শিল্পের ইতিহাসে খুলে গেল নতুন দরজা। ইমপ্রেশনিজম, ফভিজম, কিউবিজমের মতো আন্দোলনগুলো বাস্তবতার নিখুঁত অনুকরণ থেকে সরে গিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার দিকে ঝুঁকল। অর্থাৎ প্রযুক্তি চিত্রকলাকে শেষ করেনি; বরং তাকে বাধ্য করেছিল নিজের প্রয়োজন নতুন করে আবিষ্কার করতে।

এআইয়ের ক্ষেত্রেও হয়তো একই ঘটনা ঘটবে। তবে এবার প্রতিদ্বন্দ্বী ক্যামেরার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আগামী দিনে প্রযুক্তি আরো নিখুঁত হলে শিল্পের ‘কারিগরি’ অংশটি মানুষের জন্য আরো কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তখন শিল্পীর সামনে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠবে একটি বিষয় আর তা হলো নিজের সত্তাকে পুরোপুরি মেলে ধরা।

তখন হয়তো শিল্পের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার নিখুঁত হয়ে ওঠায় থাকবে না। বরং যে ছবিতে রেখাটি একটু কেঁপে গেছে, যে গল্পের কোথাও একটি অসমাপ্ত বাক্য পড়ে আছে, কিংবা যে শিল্পকর্মটি প্রথম দেখায় যেন ঠিকমতো কিছুই বলতে পারছে না—সেটিই হয়তো হয়ে উঠবে সবচেয়ে মানবিক। কারণ তখন নিখুঁতভাবে ছবি আঁকা, গল্প লেখা কিংবা সুর তৈরি করা আর মানুষের একক ক্ষমতা থাকবে না। সেসব কাজ করে ফেলবে এআই।

এআইয়ের যুগে শিল্প যত বেশি ব্যক্তিগত হবে, তত বেশি অনুকরণ অযোগ্যও হয়ে উঠবে। আগে শিল্পীরা নিজেদের নির্দিষ্ট ‘স্কুল’ কিংবা আন্দোলনের মধ্যে পরিচিত করতে চাইতেন। ভবিষ্যতে হয়তো উল্টোটা ঘটবে। শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে তার স্বতন্ত্র কণ্ঠ। এআই পৃথিবীতে বাস করে না। তার কোনো শৈশব নেই, কোনো বিকালের স্মৃতি নেই, কোনো হারানো মানুষের মুখ মনে পড়ে না। সে কোনো শহরের গলিতে হেঁটে বড় হয়নি, কোনো সম্পর্কের ভাঙন দেখেনি, কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর জন্য অপেক্ষা করেনি। অথচ একজন শিল্পী তার জীবন নিয়েই পৃথিবীকে দেখেন। তার দেখা প্রতিটি দৃশ্যের সঙ্গে মিশে থাকে তার ব্যক্তিগত স্মৃতি, ভয়, ভালোবাসা, অভ্যাস ও দুর্বলতা। জীবন থেকে অর্জিত এসব অভিজ্ঞতাই হবে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

এখানে এসে শিল্পের সংজ্ঞায়ও এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটতে পারে। নিখুঁত হওয়াই হয়তো আর শিল্পীর একমাত্র লক্ষ্য থাকবে না; বরং অসম্পূর্ণতাই হয়ে উঠতে পারে শিল্পের নতুন সৌন্দর্য। ভুল করাটাই হয়ে উঠতে পারে শিল্পের নতুন কৌশল। আজ যে ভুলকে আমরা অদক্ষতা বলে মনে করি, তখন সেটিই হয়তো হয়ে উঠবে মানবিকতার চিহ্ন। শিল্পীর ব্যর্থতা তখন আর ব্যর্থতা থাকবে না; বরং এআইয়ের নিখুঁততার বিরুদ্ধে মানুষের নিজস্ব স্বাক্ষর হয়ে উঠবে। শিল্পী হয়তো আর মাস্টার হতে চাইবেন না। বরং আনাড়ি হয়ে থাকার মধ্যেই খুঁজে নেবেন স্বাধীনতা। কারণ দক্ষতার শেষ সীমায় পৌঁছানো মানুষকে তখন যন্ত্রের কাছাকাছি নিয়ে যাবে; আর ভুল, দ্বিধা, অদক্ষতা ও অসম্পূর্ণতা তাকে আবার ফিরিয়ে আনবে মানুষের কাছে।

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও শিল্পের ইতিহাসে এমন উল্টো পথে হাঁটার নজির কম নয়। দাদাইজম থেকে কনসেপচুয়াল আর্ট—শিল্প বারবারই প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণাকে প্রশ্ন করেছে। শিল্প কি কেবল চোখকে তৃপ্ত করার নাম, নাকি একটি চিন্তা, প্রশ্ন কিংবা অস্বস্তিও হয়ে উঠতে পারে শিল্পের ভাষা? মার্সেল দ্যুশাঁ একটি সাধারণ বস্তু গ্যালারিতে তুলে এনে যেমন প্রশ্ন করেছিলেন—শিল্পের মূল্য কি বস্তুটির মধ্যে, নাকি শিল্পীর নির্বাচনের মধ্যেই? আবার মাউরিজিও কাতেলান দেয়ালে একটি কলা টেপ দিয়ে আটকে সেটিকেই শিল্পকর্মে পরিণত করে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন শিল্পবাজার ও দর্শকের চেনা দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে শিল্প কখনো শুধু সৌন্দর্যের নির্মাণ নয়; কখনো তা আমাদের দেখার অভ্যাসে একটি প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়ারও নাম।

শিল্পের ইতিহাস তাই বারবার একই শিক্ষা দিয়েছে—প্রযুক্তি শিল্পীর জায়গা দখল করার চেয়ে শিল্পের সংজ্ঞাটাকেই বেশি বদলে দেয়। ক্যামেরা যেমন চিত্রকলাকে বাস্তবের নিখুঁত অনুকরণ থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল মানুষের অনুভূতি ও দৃষ্টিভঙ্গির দিকে, এআইও হয়তো শিল্পকে নিয়ে যাবে এমন এক জায়গায়, যেখানে কারিগরি দক্ষতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে একজন শিল্পীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও অনুভব। কারণ একটি যন্ত্র হয়তো অসংখ্য ছবি তৈরি করতে পারে, কিন্তু কোনো একটি ছবির পেছনে থাকা মানুষের জীবনটিকে বয়ে নিয়ে চলতে পারে না।