সামিট গাজীপুর ৪৬৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিশাল বিশাল যন্ত্রপাতি পেরিয়ে কিছুটা ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে সবুজ প্রাঙ্গণ। আর সেই সবুজের ওপরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে, আছে স্ক্র্যাপ দিয়ে তৈরি কিছু ভাস্কর্য। এ যেন প্রকৃতি আর যন্ত্রের এক মেলবন্ধন। পুরো বিদ্যুৎ কেন্দ্রেরই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মোট ৮৬টি ভাস্কর্য, যেগুলো নির্মাণ করেছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাস্কর ও শিল্পী অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান।

হামিদুজ্জামান খান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালের ১৬ মার্চ কিশোরগঞ্জে। এ শিল্পীর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন দেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদান রেখেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গভীর অর্থবহ ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য সিরিজ ‘রিমেমব্রেন্স ৭১’-এর মাধ্যমে তার প্রতিভা সর্বাধিক প্রকাশ পায়, যা প্রথম তিনি নির্মাণ করেন ১৯৭৬ সালে। পরবর্তী চার দশক ধরে থিমটি বিভিন্ন রূপ, শৈলী ও মাধ্যমে পুনরায় প্রকাশিত হয়েছে। এ শিল্পকর্মে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, পাখি ও স্বাধীনতার প্রতীককে নান্দনিকভাবে তুলে ধরেছেন। বঙ্গভবন, জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সিউল অলিম্পিক পার্কসহ দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন ভাস্কর্য উদ্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামিদুজ্জামান খানের ভাস্কর্য স্থায়ীভাবে স্থান পেয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ জুলাই এ শিল্পী পরলোকে পাড়ি জমান।

9

২০১৯ সালে নির্মিত হয় বাংলাদেশের প্রথম ভাস্কর্য পার্ক। যার নাম ‘হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য পার্ক’। সামিট গাজীপুর ৪৬৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রাঙ্গণে অবস্থিত এ পার্কে রয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘতম ম্যুরাল ‘শ্রম ও সৃষ্টি’। পাঁচ একরের বেশি জমি নিয়ে বিস্তৃত এ পার্কে বিভিন্ন থিম এবং মিডিয়ার ওপর নির্মিত ভাস্কর্য রয়েছে। ভাস্কর্যগুলো তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছে ধাতু, পাথর, গ্রানাইট, ইস্পাত তার ও সিমেন্ট, যেগুলোর বেশির ভাগই ছিল ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট।

সামিট গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান এই ভাস্কর্য পার্ক নির্মাণের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘একদিন অফিসে বসে হামিদ ভাইয়ের সাথে ভাস্কর্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, “বড় কিছু করতে চাই।” আমি বললাম, “চলুন, আমরা গাজীপুরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেসিপ্রোকেটিং বিদ্যুৎ কেন্দ্র—৪৬৪ মেগাওয়াট তৈরি করছি। সেখানে অনেক মেটালের টুকরো, স্ক্র্যাপ পড়ে আছে। এগুলো দিয়ে কিছু সৃষ্টি করেন।” সেই স্ক্র্যাপ দিয়েই তার কোমল হাতে গড়ে উঠল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য পার্ক। কী আনন্দই না হয়েছিল তার! এখানেই দিন-রাত কাজ করতেন, সৃষ্টি করতেন, আমাদের শেখাতেন—শিল্প কীভাবে শ্রম থেকে জন্ম নেয়, শিল্প কীভাবে মনুষ্যত্বকে উঁচু করে। আজ সামিট পরিবার, তার সেই সান্নিধ্যে উপলব্ধি করেছি শিল্প ও শিল্পায়ন একে অপরের পরিপূরক।’

শ্রম ও সৃষ্টি: দেশের দীর্ঘতম ম্যুরাল যার দৈর্ঘ্য ৩৪০ ফুট। ম্যুরালটি মানবসভ্যতায় বিদ্যুতের গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলেছে। সাদা অনুদৈর্ঘ্য পটভূমিতে নির্মিত এই ভাস্কর্যে বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত এবং বক্ররেখাসহ বিভিন্ন জ্যামিতিক আকার রয়েছে। এতে যান্ত্রিক এবং শিল্প সরঞ্জাম, যেমন টারবাইন, চাকা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে আকৃতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ম্যুরালটি স্টেইনলেস স্টিল, মার্বেল এবং লোহা দিয়ে তৈরি।

রিমেমব্রেন্স ৭১: এই ভাস্কর্যে একটি রিকশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে যেখানে চালক ও যাত্রী উভয়ের শহীদ মূর্তি রয়েছে। ২৫ মার্চের গণহত্যার আইকনিক আলোকচিত্রকে মূলত ভাস্কর্যের রূপ দেয়া হয়েছে।

10

গেস্ট অব দ্য নাইট: এই ভাস্কর্যটিও মেটাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। একজন মনোযোগী পাঠক স্ট্রিট লাইটের নিচে বসে বই পড়ছে, এমনই আকৃতি দেয়া হয়েছে ভাস্কর্যটিকে।

লাইফ অ্যান্ড লাইফলেস: এ ভাস্কর্যে একটি চাকা এবং তার ওপর একটি পাখির অবয়ব নির্মাণ করা হয়েছে। বিমূর্ত এই অবয়বের মধ্য দিয়ে প্রাণী এবং যন্ত্রের একটি মেলবন্ধন দেখানো হয়েছে।

এছাড়া বৈদ্যুতিক খুঁটিতে পাখির বিমূর্ত অবয়ব, পৃথিবীর গতিকে বোঝানোর জন্য ‘‌দ্য সিড অ্যান্ড হুইল অব সিভিলাইজেশন’, পাথর দিয়ে নির্মিত বিভিন্ন অবয়বসহ অনেকগুলো ভাস্কর্য রয়েছে পার্কটিতে৷

‘হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য পার্ক’-এর প্রত্যেকটি ভাস্কর্য দেশের লোকজ সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, বাংলা ভাষা, বাঙালির ঐতিহ্য ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের শৈল্পিক প্রতিফলন। এখানকার প্রত্যেকটি ভাস্কর্যের বিষয়বস্তু যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ এর শৈল্পিক দিক ও নির্মাণের কৌশল, যা বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে সুদূরপ্রসারী অবদান রাখবে।