আজকের বিশ্বে শিল্প কেবল সৃজনশীলতার প্রকাশ নয়; বরং এটি বিনিয়োগ ও সামাজিক মর্যাদার এক অনন্য প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মনকে মুগ্ধ করে আসা চিত্রকর্মগুলোর মাধ্যমে আমরা কেবল শিল্পের নান্দনিকতা নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মিলনের এক চিত্র দেখতে পাই।

বিশ্বজুড়ে নিলামে বিক্রি হওয়া চিত্রকর্মগুলো আজ শিল্পের সৃজনশীলতার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেমন লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অতিপ্রসিদ্ধ ‘মোনালিসা’র রহস্যময় হাসি শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের কল্পনাকে অনুপ্রাণিত করে আসছে। তবে এটি কিন্তু নিলামে কখনই বিক্রি হয়নি। যদিও প্যারিসের লুভর জাদুঘরে সংরক্ষিত এ চিত্রের আনুমানিক মূল্য ৯৭০ মিলিয়ন ডলার। তবে এটি কিন্তু বিক্রির জন্য নয়।

নিলামের শীর্ষ ১০ মূল্যবান চিত্রকর্মের মধ্যে প্রথমে আসে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘সালভেটর মুন্ডি’। ১৫০০-এর দশকে আঁকা চিত্রকর্মটি বিক্রি করা হয় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারে। ২০১৭ সালে নিউইয়র্কের নিলাম সংস্থা ক্রিস্টি’জের কাছ থেকে এটি কেনেন সৌদি আরবের এক রাজপুত্র। যদিও চিত্রকর্মটি নিয়ে বিতর্ক আছে, তবু শিল্প ও ইতিহাসের এক অসামান্য সমন্বয় হিসেবে এটি আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।

15

এরপর ডাচ-আমেরিকান চিত্রশিল্পী উইলেম ডি কুনিংয়ের ‘ইন্টারচেঞ্জ’ আসে, যার বাজারমূল্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার। ডি কুনিং তার চিত্রকর্মে রঙের খেলার সূক্ষ্ম সমন্বয়ের মাধ্যমে মানুষের জীবনের জটিলতা ফুটিয়ে তুলেছেন।

ফরাসি পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী পল সেজানের ‘দ্য কার্ড প্লেয়ার্স’ চিত্রকর্মটি কাতারের রাজপরিবার ২০১১ সালে ২৫০ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। চিত্রকর্মটিতে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরবচ্ছিন্নতা ও বাস্তবতার মিশেল দর্শকের মনকে স্পর্শ করে যায়।

ফরাসি চিত্রশিল্পী পল গগুইনের ‘নাফিয়া ফা আইপোইপো’ চিত্রকর্মে তাহিতিয়ান সংস্কৃতির ছোঁয়া ফুটে ওঠে। তাহিতিয়ান ভাষায় এর অর্থ দাঁড়ায় ‘তুমি কবে আমাকে বিয়ে করবে’। চিত্রকর্মটিতে একজন তরুণীকে চিত্রায়ন করা হয়েছে, যার চুলে সাদা ফুল রয়েছে (এটি তাহিতীয় সমাজে একজন ব্যক্তির বিবাহের প্রস্তুতির প্রতীক) এবং তার মা তার পাশে বসে তাকে আগলে রাখছেন। কাতারের এক ব্যক্তি ২১০ মিলিয়ন ডলারে চিত্রকর্মটি কিনে নেন।

বিক্রয়মূল্যের বিবেচনায় চিত্রকর্মের দুনিয়ার শীর্ষ দশের মধ্যে আরো আছে আমেরিকান চিত্রশিল্পী জ্যাকসন পোলকের ‘নাম্বার ১৭এ’, যা ২০০ মিলিয়ন ডলার দামে হস্তান্তর হয়। আবার ১৬৩৬ সালে আঁকা ডাচ স্বর্ণযুগের শিল্পী রেমব্রান্ডের চিত্রকর্ম ‘দ্য স্ট্যান্ডার্ড বেয়ারার’ বিক্রি হয় ১৯৮ মিলিয়ন ডলারে।

রাশিয়ান-মার্কিন চিত্রশিল্পী মার্ক রথকোর ‘নো. ৬ (ভায়লেট, গ্রিন, অ্যান্ড রেড)’ ২০১৪ সালে হাতবদল হয় ১৮৬ মিলিয়ন ডলারে। ২০১৭ সালে ১৮৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারে হাতবদল হয় অস্ট্রিয়ার গুস্তাভ ক্লিম্টের আঁকা ‘ওয়াসারশ্লেঞ্জেনI’ চিত্রকর্মের। রেমব্রান্ডের আরেক অসাধারণ সৃষ্টি ‘মার্টেন সুলম্যানস ও ওপজেন কপিট’-এর যুগল প্রতিকৃতি ১৮০ মিলিয়ন ডলারে নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্স দুই দেশের সরকারি সংগ্রহে স্থান পায়।

শীর্ষ দশের তালিকায় সর্বশেষে আছে পাবলো পিকাসোর ‘লেস ফেমে দ’আলজের (ভার্সন ও)’। ২০১৫ সালে কাতারের রাজপরিবার চিত্রকর্মটি ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে আলোচনায় আসে।

এ শীর্ষ ১০ চিত্রকর্ম শুধু শিল্পের নান্দনিকতা ও সৃজনশীলতার প্রকাশ নয়; বরং বিনিয়োগ ও সামাজিক মর্যাদার এক অনন্য মিলনস্থল। একেকটি শিল্পকর্মের পেছনে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক জগতের গভীর সম্পর্ক।