কড়াইল ঢাকার ভেতরে এক অন্য ঢাকা, অধিকাংশ ঢাকাবাসীর কাছে এক অবিশ্বাস্য দুনিয়া। এর দৃশ্যমান অস্তিত্বই অনেকের কাছে অজানা। অভিজাত গুলশান-বনানীর ঠিক মাঝে এ দ্বীপসদৃশ এলাকায় মূলত কাজের সন্ধানে বা উন্নত জীবনের আশায় পুরো দেশ থেকে লক্ষাধিক মানুষ এখানে এসে বসতি গড়েছে। আর মানববসতি হিসেবে ঘরের যে সংজ্ঞা আমরা জানি—মাথার ওপরে একটা ছাউনি, চারদিকে দেয়াল—তার সবচেয়ে সহজলভ্য সংস্করণেরই দেখা মেলে এখানে। সংকীর্ণ গলি-ঘুপচির গা ঘেঁষে ঘেঁষে ছোট্ট ছোট্ট চার দেয়ালে অফুরান প্রাণের স্পন্দন।

17

দূর-দূরান্ত থেকে এসে এ শহরের ছোট চার দেয়ালকে ঘর বলে মেনে নিতে এখানকার বাসিন্দাদের কেমন লাগে? কড়াইলের শিশুদের কাছেইবা ঘর মানে কী? ঘর কি তাদের কাছে শুধুই আশ্রয়? নিরাপত্তা আর একটুখানি আরাম-আয়েশের যে নিশ্চয়তা দেয়ার কথা ঘরের সেটি কি এখানকার ঘর দিতে পারে? তারা ঘরকে কেমনভাবে দেখে, ঘরকে ঘিরে তাদের স্মৃতিগুলো কীভাবে তৈরি হয়? আমার কাছে ঘরের যে অর্থ, সেই অর্থ কি তাদের কাছে ভিন্ন?

অনেক সময় আমি মানুষের মধ্যেই ঘর খুঁজি, মানুষকেই ঘর মনে হয়। কিন্তু সেটি তো মূলত চিরন্তন খুঁজে ফেরার গান। আসলে ঘর কী? আমি কেন ঘর বদলের গল্প বলতে চাই, এর হৃদয়ছেঁড়া অনুভূতি ছড়িয়ে দিতে চাই চারপাশে? যেকোনো ধরনের মাইগ্রেশন বা স্থানচ্যুতিই নতুন দৃষ্টিকোণ এনে দেয় জীবনে। এ শহরে বহুবার আমার ঘর বদলেছে, যা আমার কাছে পরিচিত সময়ের মাত্রা ভেঙে দেশ-কাল বদলের মতোই এক গভীর অভিজ্ঞতা।

18

ঘনবসতিপূর্ণ কড়াইল এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা দিনমজুর, গৃহকর্মী, রিকশাচালক ও ছোটখাটো ব্যবসায়ী। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা থেকে ধারণা করা হয়, কড়াইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০-৪০ শতাংশই শিশু, অর্থাৎ ১৮ বছরের কম বয়সী। ‘মজা করি’ উৎসবে আমার ‘প্রসঙ্গটা ঘরের’ মূলত এসব শিশুর জন্য ঘরবিষয়ক গল্পের কর্মশালা ও প্রদর্শনী, যার আয়োজক ‘পাড়া’ ও গ্যেটে ইনস্টিটিউট।

ঘর বলতে এসব শিশু যা বোঝে সেসব অনুভূতি তারা লেখা আর ছাপার মাধ্যমে প্রকাশ করবে। ছাপা বলতে লিনোকাট। এর মাধ্যমে তারা এক নতুন শিল্পমাধ্যমের সঙ্গেও পরিচিত হবে।

নিজে যে এর আগে আমি খুব একটা কড়াইলে গেছি তা না। যতবার গেছি খুবই অল্প সময়ের জন্য, অন্য কারো সঙ্গে। এবারই প্রথম যেন আমি কড়াইলকে নিজের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করলাম। কত যে জীবন সমান্তরালে এখানে এঁকেবেঁকে চলছে এর গলি-তস্যগলিতে। আমার কয়েকটা দিন গেল এ বসতির নাড়িটা বুঝতে—খুব দ্রুতবেগে যেটা ভোর সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলমান। এখানকার বেশির ভাগ শিশুই নিজেদের মতো আনন্দের উপকরণ খুঁজে নেয়। আমি খুঁজে খুঁজে তার ভেতর থেকে আটজনকে বাছাই করলাম। তাদের বয়স ১০ থেকে ১৪ বছর, পড়াশোনা ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস নাইনের মধ্যে। দীর্ঘ সময় নিয়ে টানা কয়েক দিন তাদের জীবনের গল্প শুনলাম, চোখ বন্ধ করে ঘর বলতে তারা যা বোঝে তার স্বপ্ন বুনতে বললাম। কারো জন্য ঘরের কিছু নির্দিষ্ট স্থান গভীর বিষাদের—ঠিক এখানেই তার বাবা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে, কিন্তু তার মাঝেই তাকে থাকতে হয় প্রতিরাত—এ যে কী কষ্ট বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে সদ্য টিনএজে পা দেয়া মিশুর। ১২ বছরের কবিতার ঘরে থাকতে একদমই ভালো লাগে না, ঘরে থাকা মানেই তার নানা দায়িত্ব—ছোট বোনের দেখাশোনা থেকে শুরু করে অনেক কিছু। সিদ্দিকের কাছে ঘর মানে খেলার মাঠ, যেখানে সে মনের আনন্দে ক্রিকেট খেলতে পারে।

গত বছর বৃত্ত আর্টস ট্রাস্টের সঙ্গে মানুষের স্থানচ্যুতি নিয়ে আমার যে ভাবনা তা নিয়ে একটি বই তৈরি করেছিলাম, যা পরে বেশ কয়েকটি আর্ট ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়। ঘর নিয়ে আমার সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোও আমি কড়াইলের শিশুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চেয়েছিলাম।

ছোটবেলায় আমি যেখানে থাকতাম সেখানে একটা আমবাগান ছিল। আমি সেই আম গাছের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়িয়েছি, ঝড়ের দিনে আম কুড়িয়েছি। অনেক পুরনো বিল্ডিংও ছিল সেখানে। আমরা তিন ভাই-বোন আর পাড়ার ছেলেপেলে সবাই মিলে হইহুল্লোড় করে আমাদের শৈশব কাটে। সেই বাড়িটাতেই ছিলাম ২০ বছর। বাবার চাকরি সূত্রে পাওয়া আমাদের বাসা। আমার দাদি মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে এসে আমাদের বাসায় থাকতেন।

যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়া শুরু করলাম ঠিক তার কিছুদিন পরই আমাদের বাসা বদল হলো। এতদিনের চেনা ঘর যেন মুহূর্তের মধ্যে অচেনা হয়ে গেল। আমরা চললাম নতুন ঘরের দিকে। নতুন ঘর নতুন দেশের মতো। সবকিছুর সঙ্গে যেন আবার নতুন করে বন্ধুত্ব করতে হবে। ছোটবেলায় মনে হয় সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেয়া সহজ, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব কঠিন।

19

তার কিছুদিন পর আমার আরেকটা নতুন জীবন শুরু হয়। সেখানে আমি আর একটা টিকটিকি মিলে সারাদিন পার করতাম। মাঝে মাঝে কখন দিন হতো আর কখন সন্ধ্যা হতো টের পেতাম না। সেই ঘরে আমি মায়ের গন্ধ মিস করতাম অনেক বেশি। তাই তো তার একটা পুরনো কাপড় আমার কাছে রেখেছিলাম। প্রতিদিন সেটার গন্ধ শুঁকতাম। প্রকৃতির ইশারাতেই মনে হয় সে ঘরেও আমি বেশি দিন থাকিনি। আমি আবার ফিরে আসি আমার পুরনো সেই ঘরে। তবে আমার ফেলে যাওয়া ঘরটা আর আমার নেই ততদিনে। অনেক কিছু বদলেছে। আমি আবারো মানিয়ে নিতে শুরু করি। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি বাগানের পরিচর্যা শুরু করি।

এদিকে বাবার চাকরি সূত্রে পাওয়া ঘরটাও ৩৪ বছর পর আমাদের আসলেই চিরকালের জন্য ছাড়তে হবে সেটা ভাবতে বাবার অশ্রুসজল চোখ আমি দেখেছি বহুবার। অবশেষে আমাদের জীবনে সেই ভয়ংকর দিন চলে এল। আমরা সেই চিরচেনা বাবার রাজত্ব ছেড়ে চলে আসি বৃক্ষবিহীন এক উঁচু দালানে।

আমার ঘরকেন্দ্রিক এসব স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছিলাম কড়াইলের শিশুদের স্মৃতি। প্রথম দিনের ওয়ার্কশপে বললাম, ‘ঘর ফেরার জায়গা, কখনো মুক্তির। আসো আমরা সেই মুক্তির গান লিখি কালো আর নীলের লিনোকাটের ছাপে।’ কীভাবে আঁকতে হয়, কীভাবে লিনোতে খোদাই করতে হয় একটু শিখিয়ে দিতেই তারা দ্রুত ধরে ফেলল কী করতে হবে। এরপর তাদের অবিরাম এঁকে যাওয়া। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি কী গভীর আগ্রহেই না মনের কথাগুলো এঁকে যাচ্ছে। হনুফা পড়ে কড়াইলেরই একটা স্কুলে, নবম শ্রেণীতে। সে এঁকেছে একটা ছোট্ট ঘর, সেখানে একটা জানালা, তার বাইরে ফুলের বাগান। হঠাৎ লক্ষ করলাম সবার আঁকার মধ্যেই একটা কমন জিনিস আছে—জানালা। এমনিতে ঘরের অনুষঙ্গ হিসেবে জানালা খুবই স্বাভাবিক মনে হলেও জানালাযুক্ত ঘর কড়াইলে এক বিলাসিতারই নাম।

দেখতে দেখতে একেকজন ৮-১০টা করে ছবি এঁকে ফেলল। আমি, তৌসিফ ও শাবস মিলে তাদের শেখালাম কীভাবে রোলারে রঙ লাগিয়ে কাগজে ছাপ নিতে হয়। এ আনন্দের মাঝেই তারা এক-দুই পাতা করে লিখল ঘর নিয়ে তাদের ভাবনা।

এবার এক সপ্তাহের বিরতি। এই এক সপ্তাহ আমি তাদের লেখা আর ছবিগুলো দিয়ে একটা বইয়ের আকৃতি বানিয়ে ফেললাম। তাদের কাছ থেকে আগেই জেনে নিয়েছিলাম, কে কোন নাম দিতে চায় নিজের বইয়ের। ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকল আস্ত একটা বই।

ডিসেম্বরের ৭-৮ তারিখ ছিল তাদের কর্মশালা। আর পরের সপ্তাহে মানে ১৩-১৪-তে তাদের বইয়ের প্রদর্শনী। ছাপা, বাঁধাই করে বইগুলো নিয়ে যখন হাজির হলাম তাদের সামনে, একেকজন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না, নিজের নাম দিয়ে সত্যি সত্যি একটা করে বই তৈরি হয়েছে। জান্নাত, মিশু, নুরজাহান, কবিতা, মীম, আলামিন, সিদ্দিক ও হনুফা প্রত্যেকেই এখন একজন সত্যিকারের বইয়ের লেখক। তারা বইগুলো উল্টে দেখে, পাল্টে দেখে। চোখে-মুখে তাদের কী যে গর্ব। তা দেখে মনে হলো, আমি যা করতে চেয়েছিলাম তা মনে হয় একটু হলেও পেরেছি।

কড়াইলের এরশাদ মাঠের ‘মাচান’-এ যখন তাদের বইয়ের প্রদর্শনী চলছিল, আমিও তখন অন্য অনেকের মতোই দর্শক। একটু দূরে বসে দেখছিলাম বইয়ের লেখকরা কী গভীর সৃষ্টির আনন্দে হাত-পা নেড়ে তাদের ঘরের গল্প বলছে দর্শকদের, যে ঘরে আমরা দিন শেষে সম্ভবত কেউ ভালো থাকি না।

লেখক: ভিজুয়াল আর্টিস্ট