দারুণ অঘ্রাণের কাল। সোনার ধানের গন্ধে জেগে ওঠে গ্রাম। সঙ্গে উল্লাস বাড়ায় হলুদ খামে মোড়া শীতের আগমনি চিঠি। কৃষকের শুকানো ঘাম যেন কুয়াশার জলফোঁটায় ঝরে। শস্যহীন প্রান্তরে আজ গভীর পূর্ণতা। জীবনানন্দের মরা কার্তিকের পর রবিঠাকুরের ভরা অঘ্রাণ! মধুর হাসি ঠিকরে পড়ে ধানের বুকে, কৃষাণীর মুখে। মাঠজুড়ে ধান, ঘরজুড়ে ধান, পথে-ঘাটে, উঠানে ছড়াছড়ি। জসীম উদ্দীনের ভাষারূপে,
সারা মাঠে ধান, পথে ঘাটে ধান উঠানেতে ছড়াছড়ি,
সারা গাঁও ভরি চলেছে কে কবি ধানের কাব্য পড়ি।
তবে কেবলই কি কাব্য? মোটেও না। এমন হেমন্তকাল তো চিত্রশিল্পীর ক্যানভাসকে ফাঁকি দিতে পারে না।
গত শতকের খ্যাতিমান শিল্পী সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ হেমন্তকে এঁকেছেন বাংলার নিজস্ব ঋতুরঙে! ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় সেটি ছাপা হয় ‘হৈমন্তী’ শিরোনামে। তখন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে ছাপা হচ্ছে ‘প্রবাসী’তে। উপন্যাসের মাঝখানটাতে এমন রঙিন ছবির প্লেট পাঠককে চমকে দেবে। চিত্রভাষ্যে প্রকাশ পেয়েছে চিরায়ত ফসলী ঋতুর রূপ। দিগন্তজোড়া ধানীমাঠ। দলবেঁধে পাকা ধান কাটছেন কৃষক। কেউ ব্যস্ত ডাবা-হুক্কা নিয়ে, কারো আবার ক্ষুধা নিবারণের তোড়জোড়। পাশে সযতন আঁখি মেলে বসে আছেন গৃহস্থলক্ষ্মী। আধেক জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। ছড়িয়ে আছে মুঠো মুঠো ধান, সঙ্গে জলভর্তি একটি মাটির কলসি চোখ এড়ায় না। হেরি এ হেমন্ত—কী অপরূপ! কী পয়মন্ত!
বাংলার মাটি ও মানুষের শিল্পী এস এম সুলতানের চিত্রকর্ম থেকে আমাদের আন্দাজ হয় তিনি হেমন্তের ছবি বেশি এঁকেছেন অন্য মৌসুম বা ঋতুর তুলনায়। ফসল তোলা, ধানমাড়াইসহ বেশকিছু ছবিতে আমাদের কৃষি ও কৃষককে চিত্রদলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সুলতান তার চিত্রকর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করেছেন। তবে বাংলার প্রকৃতির চিরায়ত রূপকে বরণ করেছেন সাদরে।
শিল্পী কামরুল হাসান তার জলরঙে আঁকা ‘বাংলার রূপ’ চিত্রে মা-সন্তান ও কসলি কাঁখে বধূর পাশাপাশি হেমন্তের কৃষিজীবন এঁকে ছবির পূর্ণতা দিয়েছেন।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯৭০ সালে গ্রামবাংলার কৃষিজীবন নিয়ে আঁকেন তার বিখ্যাত ছবি নবান্ন। চিত্রটি সময়ের আবর্তে হয়ে উঠেছে বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণকারী একটি বিষয়।
জীবনানন্দ দাশ তার ‘অঘ্রাণ প্রান্তরে’ কবিতায় লিখেছেন— “অঘ্রাণ এসেছে আজ পৃথিবীর বনে”—তাই তো কেবল বাংলা নয়, জগদ্বিখ্যাত শিল্পীরাও হেমন্তে বিভোর হয়েছেন।
ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ‘অটাম ল্যান্ডস্কেপ উইথ ফোর ট্রিজ ছবিতে তিনটি বর্ণিল বৃক্ষের পাশে এঁকেছেন একটি পত্রহীন গাছ। বর্ণময়তার পাশাপাশি এখানে হেমন্ত খানিক বিষণ্ন।
ক্লদ মোনে তার ‘অটাম অন দ্য সেইন অ্যাট আখজেনতাই’ ছবিতে সুনীল আকাশের পরিবর্তে এঁকেছেন বিষণ্ন মেঘ। তবে সেইনের তীরের বর্ণিল বৃক্ষরাজি যেন আনল ডেকে হেমন্তকে!
জাপানি চিত্রশিল্পী কাটসুশিকা হোকুসাই উনিশ শতকের শুরুর দিকে ‘পিজেন্টস ইন অটাম’ চিত্রে তুলে ধরেছেন হেমন্তের চাষী ও তাদের ফসল তোলার দৃশ্য। প্রকৃতির পালাবদলে কীভাবে গাছের পাতা সবুজ থেকে হলুদাভ রূপ নিচ্ছে, শিল্পী তা দেখিয়েছেন সচেতনভাবে। এভাবে শিল্পী যেমন হেমন্তকে চিত্রভাষায় ব্যক্ত করেছেন, তেমনি কবি-সাহিত্যিকরাও শব্দবন্ধে হেমন্তকে আরো প্রাণময় করে তুলেছেন।
তবে ‘হায় হেমন্তলক্ষ্মী’— কবিগুরুর এমন হেমন্ত উপলব্ধির প্রশংসা করলেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না হেমন্তের পরিবর্তিত রূপ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে কিছুটা ছন্দ হারাচ্ছে হেমন্ত। যান্ত্রিক কৃষি, অব্যাহত পরিবেশদূষণ, ঐতিহ্য বিমুখতাসহ নানাবিধ কারণে ভাঙতে শুরু করেছে নিয়মের বলয়। আমরা চাই হেমন্ত দিগন্তে প্রসারিত হোক স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি। জীবনানন্দের পাড়াগাঁয়ে লেগে থাকুক রূপশালী ধানভানা রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ। ধানে আর ধানে ভরে থাকুক আমাদের হেমন্তের ভাঁড়ার।










