গ্যালারি কায়ার কথা জানি অনেকদিন ধরেই। বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার অন্যতম পথিকৃৎ দেবদাস চক্রবর্তী (১৯৩৩-২০০৮) এবং অকালপ্রয়াত কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক সালেহা চক্রবর্তীর পুত্র শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী উত্তরায় তাদের পৈতৃক বাড়িতেই চিত্রশালাটি প্রতিষ্ঠা করেছেন বেশ অনেক বছর হলো। ঢাকার এত এত গ্যালারিতে যাই, এত প্রদর্শনী দেখি, অথচ কী কারণে জানি গ্যালারি কায়ায় যাওয়া হয়নি অদ্যাবধি; সম্ভবত তার তুলনামূলকভাবে দূরতর অবস্থানের কারণেই। সম্প্রতি সেই আক্ষেপ ঘুচল আমার। অকৃত্রিম কলারসিক এক প্রিয়দম্পতির কল্যাণে এক বিকালে ঘুরে আসা গেল গ্যালারি কায়া থেকে। প্রিয় শিল্পী ও সাহিত্যিকের স্মৃতিধন্য শিল্পশালাটির ঘরোয়া, অন্তরঙ্গ আবহটুকু প্রথমেই মন কাড়ল। সঙ্গে উপরি পাওনা হিসেবে জুটল ‘-----SCAPES’ শিরোনামে একটি অভিনব দলীয় প্রদর্শনী দেখার সুবর্ণ সুযোগ।

জানা ছিল, গ্যালারি কায়া অধিকাংশ সময়ই দলীয় প্রদর্শনীর আয়োজন করে, যেখানে নবীন-প্রবীণ, দেশী-বিদেশী শিল্পীদের সুবর্ণ সন্নিবেশ ঘটে প্রায়ই। এবারো তার ব্যতিক্রম ছিল না; মোট ২২ জন বিভিন্ন বয়সী শিল্পীর ৬২টি ছোট-বড় শিল্পকর্ম নিয়ে গ্যালারি কায়া সাজিয়েছিল উল্লিখিত শিরোনামে তার এই সর্বসাম্প্রতিক প্রদর্শনী। সেখানে প্রবীণদের পাশাপাশি নবীণ শিল্পীরা হলেন কামরুজ্জামান সাগর (১৯৭৭), সাদেক আহমেদ (১৯৭৮), রুহুল আমিন তারেক (১৯৮১), আনিসুজ্জামান মামুন (১৯৮৪), কামরুজ্জোহা (১৯৮৪), ওয়ারিয়র রহমান সামি (১৯৮৫), দিদারুল হোসেন লিমন (১৯৯০), সৈকত হোসেন (১৯৯১) ও সীমান্ত ঘোষ (১৯৯৯)। অথচ এর মধ্যে কয়েকজনের কাজ অত্যন্ত শক্তিশালী, শিল্পিত ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। যেমন ধরা যাক সাদেক আহমেদের পাশাপাশি স্থাপিত দুটো নগরদৃশ্যের কথা। ক্যানভাসের গায়ে অ্যাক্রিলিকে আঁকা দৈনন্দিন নগরজীবনের নানা অনুষঙ্গ, রঙে ও রেখায় যে রকম বাস্তব, বর্ণিল ও বাঙ্ময় হয়ে উঠে দর্শকের সমূহ ইন্দ্রিয়কে আকৃষ্ট ও আপ্লুত করে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। একই কথা প্রযোজ্য কামরুজ্জামান সাগরের বিমূর্ত চিত্রকর্ম How We Survive ওয়ারিয়র রহমান সামির অপর বহুমাত্রিক বিমূর্ত শিল্পকর্মটি সম্পর্কেও।
চিত্ররসিককেরা জানেন Landscape Painting নামে বিশ্বময় সুপরিচিত ও জনপ্রিয় একটি চিত্রধারা রয়েছে, যেখানে নিসর্গ, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, প্রান্তর, এককথায় প্রকৃতির যাবতীয় অনুষঙ্গ নিয়ে, প্রধানত অনুভূমিক বিন্যাসে ও বাস্তববাদী শৈলীতে, জলরঙ ও তেলরঙে বিবিধ আকৃতির ছবি আঁকা হয়। এ Landscape Painting-কে বাংলায় কেউ নিসর্গচিত্র, কেউ ভূদৃশ্য চিত্রকলা ইত্যাদি আখ্যা দেন, কিন্তু এর কোনো সর্বজনস্বীকৃত প্রতিশব্দ বাংলায় রয়েছে বলে আমার জানা নেই। এর কারণ সম্ভবত, ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং এখন কেবল নিসর্গদৃশ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বহির্বিশ্বে তো বটেই, এতদঞ্চলেও এখন অনেক শিল্পীই এ অভিধাকে বহুদূর প্রসারিত করে নিয়ে গেছেন নগরদৃশ্য, রাস্তাঘাট, প্রাত্যহিক জীবনের শব্দানুষঙ্গ এমনকি মানবমন ও তার স্বপ্নের জটিল জগতেও। এর সঙ্গে সংগতি রেখেই Landscape Painting-এর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে আরো বেশকিছু শিল্প অভিধা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য Cityscape, Riverscape, Cloudscape, Dreamscape, Landscape, Mindscape, Seascape, Skyscape, Snowscape, Soundscape, Streetscape। আলোচ্য প্রদর্শনীর পরিকল্পক গৌতম চক্রবর্তী বোঝাই যাচ্ছে এই বিষয়ে সম্যক অবগত, যে কারণে তিনি প্রদর্শনীর নাম রাখেন কেবল SCAPES এবং তার আগে জুড়ে দেন কয়েকটি ড্যাশ চিহ্ন, যেখানে শূন্যস্থান পূরণের নিমিত্তে উল্লিখিত বিবিধ SCAPES-এর তালিকাটিও জুড়ে দেন তিনি প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত পুস্তিকায়।

তবে প্রদর্শনী ঘুরে দেখা গেল অধিকাংশ চিত্রকর্মই আসলে Landscape Painting-এর ধ্রুপদি ঘরানার ফসল: নানা ধরনের গ্রামীণ দৃশ্যাবলির উপস্থাপনা, যেখানে নদী, নৌকা, সমুদ্র, ধানখেত, পাহাড়, পর্বত, মাঠ, পাথার, বৃক্ষরাজি, অরণ্য ইত্যাদিরই প্রাধান্য। সেসবে যেমন প্রবীণতম হামিদুজ্জামান খানের (১৯৪৬) ক্যানভাসগাত্রে অ্যাক্রিলিকে আঁকা উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তৃত বয়ান পাওয়া যায়, তেমনি তরুণতর শিল্পী দিদারুল হোসেন লিমনের নয়নাভিরাম পল্লীচিত্র চতুষ্টয় কিংবা সৈকত হোসেনের কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সারবাঁধা বহুবর্ণিল সাম্পানরাজির চোখ জুড়ানো ভূদৃশ্যেরও দেখা মেলে। প্রদর্শনীতে অপেক্ষাকৃত প্রবীণদের মধ্যে জামাল আহমেদের (১৯৫৫) বিখ্যাত বিহঙ্গচিত্র যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে এক তীক্ষ্ণদৃষ্টি, গতিময় মীন শিকারির নজরকাড়া প্রতিকৃতিচিত্র। তারই সমসাময়িক রণজিৎ দাশ (১৯৫৬) এ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন জলরঙে আঁকা দুখানি অনবদ্য নিসর্গচিত্রের মাধ্যমে। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে আহমেদ শামসুদ্দোহা (১৯৫৮) তার হরিদ্রাবর্ণ সষেরখেতের ছবি, শেখ আফজাল হোসেন (১৯৬০) তার ভিনদেশী সমুদ্র ও পর্বতের সঙ্গমস্থলের ছবি, মোহাম্মদ ইকবাল (১৯৬৭) তার সুনিপুণ পাহাড়ি দৃশ্য, আলপ্তগিন তুষার (১৯৬৮) তার শ্বেতশুভ্র Snowscape এবং ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিংয়ের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ও নন্দিত সোহাগ পারভেজ (১৯৮১) তাঁর বাংলার নদীনিসর্গ ও শাহানুর মামুন তার ঢেউয়ের (১৯৮৬) মতো বাস্তবানুগ শিল্পকর্মগুলোর মাধ্যমে তাদের সুনামের প্রতি সুবিচার করেছেন সন্দেহ নেই।
এছাড়া আনিসুজ্জামানের (১৯৭২) ব্যতিক্রমী লিথোগ্রাফির কাজটিতে নগরদৃশ্যের ভিন্নতা, বৈচিত্র্য ও শ্রেণীবৈষম্যের চিত্রটি বেশ ভালোভাবেই পরিস্ফুটিত হয়েছে। প্রতিভাবান শিল্পী নগরবাসী বর্মণ (১৯৭৩) দুটি আধাবিমূর্ত নদী ও নৌকা দৃশ্যের শিল্পকর্মের মাধ্যমে তার জাত চেনাতে সক্ষম হয়েছেন আরেকবার। অন্যদিকে প্রবলভাবে নজর কেড়েছেন তরুণ মেধাবী শিল্পী নবরাজ রায় (১৯৮৯) তার কমপ্লেক্স শীর্ষক বিমূর্ত ছবিটির মাধ্যমে, যা মূলত একটি মাইন্ডস্কেপধর্মী চিত্রকর্ম। তবে সামগ্রিক বিচারে সবাইকে টেক্কা দিয়েছেন প্রদর্শনীর প্রবীণতম শিল্পী চন্দ্রশেখর দে (১৯৪৬) তার দ্য অ্যানশিয়েন্ট বিউটি ছবিটির মাধ্যমে। এটি প্রথাগত অর্থে একটি নগরদৃশ্য তথা Cityscape-জাতীয় ছবি হলেও এর নরম, নীলাভ রঙ; এর প্রায় পরাবাস্তববাদী বিন্যাস, তদুপরি সম্মুখতলে স্থাপিত জনৈক প্রাচীনার রহস্যময় মুখাবয়ব, তার দৃষ্টির দূরগামিতা সব মিলিয়ে এটি খুব সহজেই মানবের মনোজগতের প্রতিবিম্ব তথা Mindscape-এর রূপ পরিগ্রহ করে। এমনকি কেউ কেউ এর মধ্যে একটি যথার্থ স্বপ্নদৃশ্য তথা Dreamscape-এর প্রতিফলন দেখতে পেলেও তাকে দোষ দেয়া যাবে না, কেননা ছবিটি তার কম্পোজিশন, রঙ ও রেখার প্রয়োগ, সর্বোপরি বিষয় ভাবনায় সত্যি সত্যি একধরনের পরাবাস্তব স্বপ্নময়তার বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি অর্জন করে। কিউরেটর গৌতম চক্রবর্তী তার প্রদর্শনী পুস্তিকাটির প্রচ্ছদচিত্ররূপে চন্দ্রশেখর দের এ ছবিকেই কেন বেছে নেন সেটি বুঝতে আমাদের তাই বিশেষ বেগ পেতে হয় না। সব মিলিয়ে প্রথমবারের মতো আমার গ্যালারি কায়া পরিদর্শন এবং সেখানে এমন একটি বহুমাত্রিক প্রদর্শনী দেখার অভিজ্ঞতাটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে সন্দেহ নেই।
লেখক: সমালোচক, অনুবাদক










