বিশ্ব শিল্প পাঠে প্রায় সবসময়ই সমসাময়িক সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রে জ্ঞানগত ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলোর প্রতিফলন ঘটে দৃশ্যকলায়, ফলে শিল্প পায় নতুন মাত্রা। তাই বিশ্বজুড়ে একসময়ের নান্দনিক গুণের মানদণ্ডগুলো পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। সময়ের বাস্তবতা আর অভিজ্ঞতার ভাঁজ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে নতুন চিন্তার আবির্ভাব ঘটে আর এভাবেই দৃশ্যকলা তার নতুন মাত্রা নিয়ে বিকশিত হয়। প্রায় সূচনালগ্ন থেকে শিল্পকর্মের স্থায়িত্ব এবং এর সংগ্রহযোগ্যতাকে নিয়ে নানারূপ চর্চা হয়ে আসছে। উত্তরাধিকার থেকে প্রাপ্ত ধারণার প্রচেষ্টাকে আমরা আমাদের দেশে আজকের সময়েও দৃশ্য শিল্প বিচারের একমাত্র মানদণ্ড বা সারবস্তুর কিংবা গুণ হিসেবে গণ্য করে আমাদের শৈল্পিক অনুশীলনে সেগুলোকে আঁকড়ে ধরে আছি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত, চিন্তাগত সর্বোপরি জ্ঞানগত ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো আমাদের চর্চায় প্রায় উপেক্ষিত থেকে গেছে। বিংশ শতাব্দীতে দেখতে পাব পুঁজিবাদী অর্থনীতির উত্তরণের ফলে শিল্পকর্মকে পণ্যের মতো বা বাণিজ্যিক বস্তু হিসেবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যকে শিল্পীরা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অনিবার্যভাবে তখন থেকেই দৃশ্য শিল্পে এ আদর্শবাদী ও টেলিওলজিক্যাল সংস্করণের মৃত্যু ঘটেছে। স্থায়িত্ববোধের ধারণাকে শিল্পীরা নানাভাবে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানা স্থানে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনে শিল্পের এ টেম্পোরালিটি বা অস্থায়ী প্রকৃতির ধারণার চর্চা ছিল। আমাদের দেশে লৌকিক আচার ও লোকশিল্প রচনার ভেতর টেম্পোরালিটি বা অস্থায়িত্বের ধারণাটির প্রায়োগিক রূপ অত্যন্ত গভীরভাবে প্রোথিত। এখানে সরাসরি বিভিন্ন উৎসবে শিল্পবস্তু তৈরি করা হয়; বিয়ে, নবান্ন, পূজা বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় আলপনা, সাময়িক তোরণ ও মণ্ডপ এবং আচারভিত্তিক মাটির সামগ্রী ইত্যাদি। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সেগুলোর আর প্রয়োজন হয় না। বস্তুত এখানে শিল্পকে জীবনের প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো চিরস্থায়ী সত্তা হিসেবে দেখা হয়নি কখনই; বরং শিল্প এখানে জীবনেরই অংশ, সময় ও প্রকৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে দেখা হয়। যা-ই হোক, টেম্পোরালিটি বা অস্থায়ী শিল্প বলতে এমন শিল্পকর্ম বোঝায় যেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত সময়ের জন্য তৈরি করা হয়। ফলে শিল্পের এ টেম্পেরালিটি মূলত সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা সময়ের অধীনতাকে নির্দেশ করে। তাই বাংলায় একে কালিকতা, সময়গততা বা অস্থায়ী প্রকৃতি বলা যেতে পারে।

সমসাময়িক সময়ে আমাদের দেশের শিল্পচর্চার মূল ধারার স্রোতে বিচ্ছিন্নভাবে টেম্পোরালিটি বা কালিকতার চর্চা থাকলেও প্রায়ই প্রশ্ন উত্থাপন হয় ‘মাধ্যমটি কতকাল স্থায়ী থাকবে’, যেন স্থায়িত্বই শিল্পকর্মের শেষ আদর্শিক গুণ। অথচ আমরা দেখব ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালের দিকে মূলত শিল্পকর্মকে পণ্যীকরণের ধারণা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যই পাশ্চাত্যে টেম্পোরারি আর্ট বা অস্থায়ী শিল্পের ধারণাটির জন্ম হয়। আর তারই সূত্র ধরে পারফরম্যান্স আর্ট, স্থাপনা (Installation), ল্যান্ড আর্টসহ বহুবিধ জনরাগুলোর আবির্ভাব ঘটে।

পারফরম্যান্স আর্টে আমরা দেখি শিল্পীর শরীরকে ক্ষণস্থায়ীভাবে শিল্পবস্তু হিসেবে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। ল্যান্ড আর্ট হিসেবে শিল্পী রবার্ট স্মিথসনের স্পাইরাল জেটি শিল্পকর্মটি টেম্পোরারি আর্টের একটি বিশেষ উদাহরণ। এটি একটি বৃহৎ আকারের শিল্পকর্ম, যা মাটি ও নানা প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে তৈরি এবং পরিবেশগত কারণে এটি পরিবর্তনশীল, কখনো কখনো, এটি দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণরূপে পানির নিচে ডুবে থাকে, অন্য সময়ে, এটি সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত এবং লবণ স্ফটিক দ্বারা আবৃত থাকে। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলো ক্রমাগত এর রূপ পরিবর্তন করে এবং শিল্পকর্মটিকে ক্ষয় করে। টেম্পোরারি আর্টের আরো একটি উদাহরণ হলো শিল্পী ক্রিস্টো ও জিন-ক্লডের বৃহৎ আকারের পরিবেশগত স্থাপনাগুলো যেখানে আমরা দেখব একটি নির্দিষ্ট স্থান ও প্রেক্ষাপটের জন্য তৈরি একটি শিল্পকর্ম আবার নির্দিষ্ট সময়ের পরে সরিয়ে ফেলার প্রক্রিয়া। আলোচনার শেষ উদাহরণটিতে শিল্পকর্ম রচনা উপকরণগত মাধ্যমের টেম্পোরালিটির নয়; বরং এটি শিল্পকর্মের উপস্থাপনাসংক্রান্ত পরিকল্পনাগত টেম্পোরালিটি। দৃশ্যশিল্পে এসব টেম্পোরালিটির চর্চার প্রচেষ্টার কারণে দৃশ্যশিল্পের অভিনবত্বের উদ্ভাবন পরিধি যেমন বেড়েছে তেমনি বিংশ শতাব্দীর বাজার অর্থনীতির পণ্যীকরণে থেকে দৃশ্যশিল্পকে রক্ষা করে জ্ঞানতত্ত্বের উচ্চতায় উপনীত করেছে। মনে রাখতে হবে, সমসাময়িকতার জন্য আজকের লড়াই গতকালের মতো চলতে পারে না। নতুন প্রেক্ষাপটে শিল্পচর্চার অগ্রগামিতার জন্য অতীত অভিজ্ঞতার ধারণাগুলোকে আজকের শিল্পীরা চ্যালেঞ্জ করেন এবং নতুন অজানা যাত্রায় পা বাড়ান। শিল্পবোধের বিতর্ক নিরসনে এবং শিল্পের ভাষাকে নতুন নতুন মাত্রা প্রদানের শিল্প আলোচনার এ পর্বে আমরা দেখব ২০০৭ সালের প্রদর্শিত, উপস্থাপনাসংক্রান্ত পরিকল্পনাগত টেম্পোরালিটি-নির্ভর এক অপূর্ব শিল্পকর্মের অভিযাত্রা।

Rubber Duck and Hofman

রাবার ডাক এবং ডাচ শিল্পী ফ্লোরেন্টিন হফম্যান। ছবি: লেখক

ফ্রান্সের পশ্চিম উপকূলের সেন্ট-নাজাইর শহরের লোয়ার নদীতে অবিরাম জলরাশির ওপর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে ৪০ মাইল বিস্তৃত এলাকায় বাতাসের ধীরগতিতে ভেসে বয়ে চলা অদ্ভুত এক শিল্পকর্ম ‘রাবার ডাক’। বাংলায় যাকে বলা যেতে পারে রাবারের তৈরি হাঁস। শিশু খেলনার মতো দেখতে হলুদ রঙের অদ্ভুত বিশাল আকারের এই হাঁস মূলত ইনস্টলেশন ঘরানার একটি শিল্পকর্ম, রচয়িতা ডাচ শিল্পী ফ্লোরেন্টিন হফম্যান, যিনি তার বৃহৎ আকারের পাবলিক আর্টের জন্য ইদানীং বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখন পর্যন্ত ফ্লোরেন্টিন হফম্যানের তৈরি সবচেয়ে বৃহদাকৃতির রাবার ডাক প্রদর্শনী এটিই, উচ্চতায় ২৬ মিটার, প্রস্থে ২০ মিটার ও দৈর্ঘ্যে ৩২ মিটার (৮৫ ফুট × ৬৬ ফুট × ১০৫ ফুট)। পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আকৃতিতে রাবার ডাক হংকং, সিডনি, বেইজিং, পিটসবার্গ, অকল্যান্ড, সাও পাওলো, ওসাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হয়। প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে হংকংয়ে পৌঁছার আগে ‘রাবার ডাক’ চারটি মহাদেশের ১২টি স্থানে প্রদর্শিত হয়। বলা হয় ২০১৩-১৪ সালের মধ্যে রাবার ডাকটি ৩৫ মিলিয়নেরও বেশি দর্শকের সামনে প্রদর্শিত হয়েছে। অর্থাৎ বিশাল হলুদ স্ফীত হাঁসটি আজ পর্যন্ত হফম্যানের স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দর্শকনন্দিত উল্লেখযোগ্য একটি কাজ। বলা হয় এ রাবার ডাকই হাফম্যানের সিগনেচার ওয়ার্ক বা শিল্পীর স্বাক্ষর বহনকারী শিল্পকর্ম।

দৈনন্দিন জিনিসপত্রকে শিল্প রচনার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হফম্যানের শিল্পকর্ম রচনার একটি বৈশিষ্ট্য। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো "ফ্যাট মাঙ্কি। ২০১০ সালে সাও পাওলোতে রচিত ফ্যাট মাঙ্কি কাজটিতে শিল্পী উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন ১০ হাজার উজ্জ্বল রঙের সৈকতে ব্যবহৃত স্যান্ডেল। তাছাড়া ২০১৪ সালে তাইওয়ানে স্থাপন করেন ‘মুন র‍্যাবিট’ নামে তার আরেকটি শিল্পকর্ম। আমরা দেখি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি বিশাল খরগোশ রচনায় তিনি হালকা জলরোধী কাগজ ব্যবহার করেছিলেন। রাবার ডাক তৈরিতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন ৪৯ হাজার প্লাস্টিকের ব্যাগ। ফ্লোরেন্টিন হফম্যানের এ পাবলিক আর্টগুলো মূলত সাইট স্পেসিফিক ইনস্টলেশন, যার অর্থ হলো শিল্পকর্মটি তার আশপাশের অবস্থানের সঙ্গে নানা মাত্রায় আন্তঃসম্পর্কে প্রতিস্থাপিত। আরেকটু গুছিয়ে বললে বলা যায়, এখানে স্থাপনা বা ইনস্টলেশন রচনায় শিল্পী কেবল দৃশ্যত আকর্ষণীয় শিল্পকর্ম রচনায় খান্ত নন; বরং শিল্পকর্ম রচনা অঞ্চলের অবস্থানগত নানা সম্প্রদায়, ইতিহাস, সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, পরিবেশের পরিস্থিতি কিংবা ভূদৃশ্যের সঙ্গে শিল্পকর্মের উপস্থাপনাসংক্রান্ত বিষয়বস্তুগুলোর সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা করেন। বহু আগে থেকেই জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার তার ‘বিয়িং অ্যান্ড টাইম’ গ্রন্থে এ ধারণার ইঙ্গিত দেন, মানুষের অস্তিত্ব যেমন তার পরিবেশ ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তেমনি অস্থায়ী শিল্প প্রায়ই স্থান-নির্দিষ্ট, একটি নির্দিষ্ট স্থান এবং বিদ্যমান সময় ও শিল্পকর্মের আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে নানা মাত্রায় মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে শিল্পকর্মটি স্থান থেকে সামান্য স্থানান্তরিত হলে শিল্পকর্মের মূল তাৎপর্য হারিয়ে যায়। তাই শিল্পকর্মের অবস্থানের সঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত সম্পর্কের দ্বারা সাইট স্পেসিফিক ইনস্টলেশনের জনরাকে আলাদা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১১ সালে আমস্টারডামে রচিত "স্টিলম্যান" স্থাপনাটি অথবা লন্ডনে ২০১৪ সালে"হিপ্পোপোথেমস" স্থাপনাটি ফ্লোরেন্টিন হফম্যানের উল্লেখযোগ্য সাইট স্পেসিফিক ইনস্টলেশনের প্রকৃত উদাহরণ। আমরা দেখব এখানে শিল্পী শিল্পরূপের সঙ্গে স্থানের ভারসাম্যকে সুন্দরভাবে বজায় রেখেছেন। অর্থাৎ হফম্যান তার কাজে জোর দিয়েছিলেন যাতে"রূপ স্থানের কারণে এবং স্থান রূপের কারণে কোনোভাবেই যেন মলিন না হয়ে যায়"। ফরাসি কিউরেটর, শিল্প সমালোচক ও তাত্ত্বিক নিকোলাস বুরিউড কর্তৃক প্রণীত ‘রিলেশনাল অ্যাস্থেটিকস’ তত্ত্বটিতেও আমরা দেখব শিল্পের সামাজিক ও আন্তঃসম্পর্কের দিকগুলোর ওপর শিল্পতাত্ত্বিক আলোকপাত করেছেন। বুরিউডের আলোচনায় একই সঙ্গে উঠে এসেছে টেম্পোরারি আর্টের প্রসঙ্গ। তিনি ইঙ্গিত করেছেন টেম্পোরারি আর্টে প্রায়ই দর্শকদের অংশগ্রহণকে শিল্পের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা সহজাতভাবে ক্ষণস্থায়ী। ফলে শিল্পের সামাজিক বন্ধন ও ইন্টারেক্টিভ মাত্রাগুলোর ওপর বুরিউড বেশি জোর দিয়েছেন। শিল্পকর্ম কোনো স্থির বস্তু নয়; বরং একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। তাই শিল্পকর্ম দর্শককে একটি অনন্য অপূরণীয় মুহূর্তের সঙ্গে জড়িত করে। আর তখনই রাবার ডাক শক্তিশালী রিলেশনাল অ্যাস্থেটিকসের প্রতীকী রূপ হয়ে ওঠে।

পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে ‘রাবার ডাক’ স্থাপনার প্রদর্শনী হয়। প্রতিটি শহরের জন্য শিল্পী নতুন নতুন মাপের হাঁস নির্মাণ করেন, আকারের তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন করে শিল্পী স্থানের সঙ্গে শিল্পকর্মের মেলবন্ধন রচনার চর্চাকে সমুন্নত রেখেছেন। অন্যদিকে আমরা দেখব একই স্থানে প্রথম ভ্রমণের দশম বার্ষিকীকে স্মরণ রেখে ২০২৩ সালের ১০ জুনে হংকংয়ের ভিক্টোরিয়া হারবারে রাবার ডাক দ্বিতীয়বার প্রদর্শিত হয়, তখন শিল্পী ‘ডাবল ডাকস’ বা দুটি হাঁসের স্থাপনা প্রদর্শনের মাধ্যমে তার শিল্পকর্মে রূপান্তরমূলক যাত্রার সূত্রপাত ঘটান। ডাবল ডাকসের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে শিল্পী দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের সুন্দর একটি গল্প দর্শকের সামনে হাজির করেন। প্রতিটি শহরেই হাঁসের স্থাপনা নির্দিষ্ট সময়ের প্রদর্শন শেষে সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে নেয়া হয়। ফলে সরিয়ে নেয়ার পর রাবার ডাকের বিচরণের স্থানটি তার আগের অবস্থায় ফিরে যায়, কিন্তু হাঁসের স্মৃতি থেকে যায়। বস্তুত এই অনুপস্থিতিকেই বলা হচ্ছে নান্দনিক টেম্পরালিটি, রাবার ডাকের অনুপস্থিতির বা অস্থায়ী প্রকৃতি তথা টেম্পরালিটি নিশ্চিত করে যে এটি চলে যাওয়ার অনেক পরেও এর প্রভাব অনুভূত হয়, স্থান ও দর্শকদের মাঝে এর অভিজ্ঞতার অনুভূতি জাগ্রত থাকে। মূলত শিল্পকর্মটি এখানে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যক্তির বা দর্শকের মাঝে এমন কিছু নতুন স্মৃতি রেখে যায়, যার ফলে রাবার ডাক চলে যাওয়ার অনেক পরেও স্থানগুলোয় কল্পনায় রাবার ডাকের উপস্থিতি দর্শক অনুভব করে। এ ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বও হাইডেগারের ধারণাকে প্রতিফলিত করে যে ‘জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং সেই অর্থ বর্তমান মুহূর্তে উপলব্ধি হয়।’ হাঁসের অস্থায়ী প্রকৃতি দর্শকদের এখানে শিল্পকর্মটির সঙ্গে জড়িত হতে আমন্ত্রণ জানায়, বস্তুর স্থায়িত্বের চেয়ে বর্তমান অভিজ্ঞতার গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। হাইডেগারের ‘দ্য অরিজিন অব দ্য ওয়ার্ক অব আর্ট (১৯৩৫)’ দর্শকদের পরামর্শ দেয় যে ‘শিল্প কেবল একটি বস্তু নয় বরং একটি ঘটনা যা সত্য প্রকাশ করে।’ রাবার ডাকের বিন্যাস বিচরণের প্রতীকী প্রকৃতি দর্শকদের এক চিন্তামুক্ত অনাবিল সৌন্দর্যের দিকে আকৃষ্ট করে, দর্শক তার দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানাবিধ নিষ্পেষণকে ভুলে এ ঘটনার সঙ্গে নিজেকে একীভূত করে ফেলে। দর্শক শিল্পকর্ম পাঠের মধ্য দিয়ে আপন অভিজ্ঞতামূলক ঘটনার জন্ম দেয়, তৈরি হয় শিল্পকর্মের সঙ্গে সম্পর্কের রূপ, যা স্মৃতিতে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়। শিল্পকর্মের ক্ষণস্থায়িত্বের বার্তা দর্শককে আরো অনুরণিত করে। ফলে দর্শক শিল্পকর্মের সঙ্গে আরো গভীর সংযোগ খোঁজার প্রচেষ্টায় রত হয়। রাবার ডাকের ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব দর্শকের স্মৃতি ও কল্পনায় উপস্থিতির এক রূপ হয়ে ওঠে, যা অস্থায়ী প্রকৃতি তথা টেম্পরালিটি কীভাবে একটি শক্তিশালী নান্দনিক হাতিয়ার হতে পারে তা চিত্রিত করে। অর্থাৎ রাবার ডাককে এমন একটি ঘটনা হিসেবে দেখা যেতে পারে যা সময় ও স্থানের মধ্যে উদ্ভূত হয়ে প্রত্যেক দর্শকের জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। একটি জনপরিসরে শিল্পকর্মটির উপস্থিতি সেই স্থানের সর্বস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান ক্ষেত্র হিসেবে পরিণত হয়। এটি হাইডেগারের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—শিল্প সত্য প্রকাশ করে এবং বিশ্বের সব সত্তার মধ্যে পারস্পরিক অভিজ্ঞতার অনুভূতি আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ রাবার ডাককে সর্বজনীন প্রাণবন্ত আবেদনের অনুভূতি একটি জনগোষ্ঠীকে সম্মিলিত সম্পৃক্ততায় আবদ্ধ করে, যা অস্তিত্বের জনসংযুক্তির প্রকৃতির ওপর হাইডেগারের ধারণাকে প্রতিফলিত করে।

রাবারের তৈরি বাতাসের পরশে ভেসে চলা এ হাঁসের বিশ্ব ভ্রমণের মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয় যে এ হাঁস সভ্যতার ভৌগোলিক কোনো সীমানাকে পরোয়া করে না। শিশুদের জলের খেলনার মতো নির্দ্বিধায় ভেসে চলার অসীম স্বাধীনতা দর্শকের স্মৃতিকে জাগ্রত করে। বেঁচে থাকার আধুনিক কংক্রিট মায়াজালকে ছিন্ন করে আমাদের টিকে থাকার অর্থনীতির সব ধরনের দেনা-পাওনার ছককে বিচ্ছিন্ন করে মনের ভেতরে শিশুত্বের নিষ্পাপ স্মৃতিকে জাগ্রত করে। রাবার ডাক মূলত পেকিন প্রজাতির হাঁসের বাচ্চার আদলে তৈরি, যারা তাদের জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে উজ্জ্বল হলুদ রঙের হয়। হলুদ একটি অত্যন্ত দৃশ্যমান রঙ, বিশেষ করে জলে। জলের পরিবেশের সঙ্গে হলুদ রঙ শিল্পকর্মটিকে আলাদা করে তোলে। অন্যদিকে হলুদ রঙকে লিঙ্গনিরপেক্ষ রঙ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হফম্যানের শিল্পকর্মের হলুদ রঙ কেবল দৃশ্যত আকর্ষণীয়ই নয় বরং গভীরভাবে প্রতীকীও, যা একই সঙ্গে আমাদের শৈশবের পবিত্রতা, আনন্দ এবং সর্বজনীন আবেদনে প্রতিনিধিত্ব করে। শিল্পকর্মটি আমাদের জাগতিক দৈনন্দিন জীবনে অস্তিত্বের উত্তেজনাকে পাশ কাটিয়ে শিশুসুলভ প্রশান্তির নির্মহ ব্যাখ্যার বিবৃতি প্রদান করে।

শিল্পী ফ্লোরেন্টিন হফম্যান নিজেই বলেছেন, তার এ শিল্পকর্ম মানুষের সঙ্গে মানুষের সর্বপ্রকার বৈষম্যতার বিরোধী এবং এর কোনো রাজনৈতিক অর্থ নেই"। তবু আমরা দেখব নানা সংস্কৃতিতে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাবার ডাক ইমেজ হিসেবে সামাজিক ভাষ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের আন্দোলনকে দৃশ্যজ প্রতীয়মান করার জন্য ফটোশপ করে ট্যাংকের পরিবর্তে রাবারের হাঁস ব্যবহার করা হয়, তখন থেকে চীনে রাবারের হাঁস কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। এর ফলে চীনা সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলোয়"বিগ ইয়েলো ডাক" শব্দটি সেন্সরশিপের প্রতীকায়নরূপে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি দিলমা রুসেফ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় রাবার হাঁস ব্যবহার করা হয়েছিল, যা প্রশাসনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতারণার প্রতীক। ২০১৭ সালে রাশিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির সন্ধানে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভের বিলাসবহুল সম্পত্তির মাঝে হাঁসের জন্য একটি ঘরের সন্ধান মিলেছিল আর তাকে কেন্দ্র করেই বিলাসিতা ও দুর্নীতি প্রতীকায়নরূপে বিক্ষোভকারীরা মিছিলে রাবার হাঁস ব্যবহার করেছিল। সবশেষে থাইল্যান্ডে ২০২০ সালে গণতন্ত্রপন্থী সমাবেশে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে বিশাল আকারের ফুলে ওঠা রাবার হাঁস ব্যবহার করেছিল। ওপরের সব ঘটনা বিশ্লেষণে আমরা দেখব দমন-পীড়নের মুখে রাবার হাঁসের ব্যবহার আন্দোলনের একটি অহিংস প্রতিরোধের শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে কাজ করে। সামগ্রিকভাবে রাবারের হাঁস খেলনা হিসেবে তার মূল উদ্দেশ্যকে অতিক্রম করার এবং সামাজিক ভাষ্যের জন্য একটি বহুমুখী প্রতীক হয়ে ওঠার ক্ষমতা পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে সর্বজনস্বীকৃত। নৃবিজ্ঞানী আলেকজান্দ্রা আরখিপোভা প্রতিবাদে রাবার হাঁস ব্যবহারকে এসোপিয়ান ভাষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন; অর্থাৎ সীমাবদ্ধ বাকস্বাধীনতাময় পরিবেশে পরোক্ষভাবে বার্তা প্রেরণের জন্য ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী সাংকেতিক চিহ্ন। শিল্পী ফ্লোরেন্টিন হফম্যান রাবার ডাককে একটি মেটাফোর হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অথচ যখন রাবার ডাক কোনো প্রতিবাদ মিছিল বা বিক্ষোভে ব্যবহৃত হয় তখন এটি আর কেবল শৈশবের সরলতার প্রতীক থাকে না। এটি সেই নির্দিষ্ট প্রতিবাদ বা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। যখন রাবার ডাক বিভিন্ন দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে, তখন এর প্রতীকী তাৎপর্য মেটাফোরের স্তর ছাড়িয়ে মেটানমির দিকে অগ্রসর হয়। নিরীহ চেহারা এ খেলনা হাঁসকে আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ বলে মনে হলেও বিদ্রোহ-বিপ্লবে ব্যবহৃত এ হাঁস আইকন মেটানমি হিসেবে কল্পনাকে জ্বালিয়ে দেয়ার অসীম ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে। সৃজনশীল কাজ সহজাতভাবে ব্যক্তিগত, তবু আমরা দেখব শিল্পীর সৃজনশীল শিল্পকর্মের মধ্যে অনেক অবচেতন নানা সিদ্ধান্তের অপ্রত্যাশিত ফলাফল ক্রিয়াশীল থাকে, যা একজন শিল্পী হয়তো এসব অভিপ্রায়কে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করেন না। তবু শিল্পকর্ম নিয়ে শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে যে সংলাপ সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়া তৈরি হয়, সেখানে দর্শক শিল্পকর্মের অর্থকে নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

ব্যক্তি তথা মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করেই আলোকায়নের চিন্তার মধ্য দিয়ে সূত্রপাত ঘটেছিল আজকের আধুনিক যুগের। কালের বিচারে বাস্তবতার নতুন ধাপের কঠোর বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে কান্টের আলোকায়নের চিন্তাও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। চলমান চিন্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েই নতুন চিন্তার জন্ম হয়। চিন্তার বলয় এভাবেই নতুন চিন্তার বলয়ের দিকে ধাবিত হয়, যার পরিধি আগের চেয়ে অনেক বেশি। পুরনোকে সে ফেলে দেয় না ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি গ্রহণও করে না। আমাদের সভ্যতা কিংবা শিল্পকলার অভিযাত্রা সবই এভাবে অগ্রসর হয় নতুন অধ্যায়ের দিকে। ভুলে গেলে চলবে না, দৃশ্যকলার আলোচনায় বিশ শতকের আভঁ-গার্দ চিন্তাও আদর্শবাদী ও আধুনিকতাবাদী প্রকল্পের ঐতিহ্যের একটি অংশ। কোনো একটি বিশেষ আদর্শের প্রভাবকে ক্রমবর্ধমান একচ্ছত্র শক্তিশালী করার প্রকল্প, চিন্তার অভিনবত্বের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে অনাথ করে দেয়। আধুনিকতার মৃত্যু নয়, বরং এর আদর্শবাদের এক টেলিওলজিক্যাল সংস্করণের জন্ম দেয়। মনে রাখতে হবে, আধুনিকতাবাদের পরে আভঁ-গার্দ চিন্তার পতন সত্ত্বেও সমসাময়িক শিল্পের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে সমালোচনামূলক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে আভঁ-গার্দের প্রভাব এখনো স্পষ্ট। বহু ক্ষেত্রেই হফম্যানের রাবার ডাক শিল্পকর্ম আভঁ-গার্দ শিল্পচিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেমন প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং সময়গততার ওপর জোর দেয়া। তবু দেখা যাবে শিল্পকর্মটি আদর্শবাদী আভঁ-গার্দ বা আধুনিকতাবাদী প্রকল্পের ঐতিহ্যবাহী ধারণাকে পুরোপুরি ধারণ করে না। আমরা দেখব হফম্যানের রাবার ডাক সাংস্কৃতিক বা সামাজিক পটভূমি নির্বিশেষে সবার কাছে শিল্পকে অধিগম্যতা বা অ্যাকসেসযোগ্য করে তোলে, তথা শিল্পকে গণমুখী করার প্রচেষ্টাকে আমন্ত্রণ জানায়। শিল্পী স্পষ্টতই শিল্পকর্মকে জাদুঘর ও গ্যালারি শিল্পের অসহনীয় সীমাবদ্ধতায় বেঁধে ফেলতে বিমুখ। আনন্দ ও স্মৃতিচারণের মতো সর্বজনীন আবেগকে জাগিয়ে তোলে এমন পাবলিক স্থাপনাগুলোকে সমর্থন করেন তার উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে। রাবার ডাকে রিলেশনাল অ্যাসথেটিকস থেকে উদ্ভূত, তাই রেডিক্যাল সমালোচনা বা আদর্শগত চিন্তার চেয়ে মানসিক অনুরণন এবং সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততাকে তথা গণমুখী করার প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দেয়। হফম্যানের রাবার ডাকের সামঞ্জস্য আমরা খুঁজে পাব উত্তরাধুনিক পাবলিক আর্ট ইনস্টলেশনের সঙ্গে।

শিল্পকে গণমুখী করার প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন জার্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তার ‘দ্য ওয়ার্ক অব আর্ট ইন দি এজ অব মেকানিক্যাল রিপ্রডাকশন’ প্রবন্ধে। বেঞ্জামিন তার প্রবন্ধে শিল্পকে অ্যাকসেসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে প্রথমেই পুনরুৎপাদিত শিল্পকলা বলে একটা বর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। পুনরুৎপাদনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল কপি তথা অদ্বিতীয়তার ধারণাকে তিনি খর্ব করেন। যেমনটা আমরা ছাপচিত্র, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, কিংবা রেকর্ড করা গান ইত্যাদির মাঝে দেখতে পাই, এসব শিল্প পরিবেশনের ক্ষেত্রে কোনো একটি কপিকে ‘মূল’ কপি বলে গণ্য করা হয় না, বরং প্রতিটিই ‘মূল’ কপি। তিনি ইঙ্গিত করেছেন শিল্পকর্মকে সবার কাছে ভাগ করে নেয়া তথা শিল্পকে অ্যাকসেসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে এবং সবার মাঝে ছড়ানোর জন্য মানুষ যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছে। মূল কপির ধারণা বেশকিছু দৃশ্যশিল্পের মাঝে, বিশেষ করে ট্র্যাডিশনাল শিল্পধারা চিত্রকলা ও ভাস্কর্য ইত্যাদি মাধ্যমের সীমাবদ্ধতার কারণে পুনরুৎপাদনের সময়ে শিল্পকর্ম সম্ভবত কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে আমরা এমন কিছু হারাই যা কেবল মূল কাজটিতেই বিচ্ছুরিত ছিল। তার রচনায় এ হারানো গুণকে তিনি বলেন ‘অরা’। ইউনিকনেস ও অথেন্টিসিটি—দুই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে একটি শিল্পকর্মের সাংস্কৃতিক অন্তর্নিহিততা, সময় ও স্থানের মধ্যে তার শারীরিক উপস্থিতি মূলত অরার জন্ম দেয়। বেঞ্জামিন বুঝতে পেরেছিলেন যে মূল কপি থেকে যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের ফলে শৈল্পিক অরা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। কিন্তু হফম্যানের রাবার ডাক শিল্পকর্মে ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের অরা ধারণাটিকে যান্ত্রিক পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থাৎ রাবার ডাক বিশ্বব্যাপী নানা স্থানে পুনরুৎপাদন করা হয়, (যেমন, হংকংয়ের ভিক্টোরিয়া বন্দর, সিউলের সিওকচন হ্রদ ইত্যাদি) প্রতিটি পুনরুৎপাদনে তার অবস্থানের জন্য কাস্টম-পরিমাপ অবলম্বন করা সত্ত্বেও আমরা দেখব রাবার ডাকে অরা সবসময় প্রতিষ্ঠিত ছিল। মূলত বেঞ্জামিনের শৈল্পিক অরা শিল্পকর্মের স্বায়ত্তশাসনের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল, আর হফম্যানের রাবার ডাকের টেম্পারালিটি এবং জনসাধারণের সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে শিল্পকর্মটি শৈল্পিক অরা অর্জন করে। এখানেই হফম্যান বেঞ্জামিনের তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন আর এভাবেই চলমান দৃশ্যচিন্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েই পরিবর্তিত নতুন দৃশ্যের জন্ম হয়।

গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ শতকের দিকে বলেছিলেন, পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রুবক, অর্থাৎ কোনো কিছুই স্থির নয়, আজকে যাকে ধ্রুবক বলে মনে হয় আগামীতে তাও পরিবর্তনশীল—রূপান্তরের সাপেক্ষে। মনে রাখতে হবে, আজকের দৃশ্যশিল্প মূলত একটি সময়চিন্তার দৃশ্যমান রূপ। ফলে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান বাস্তবতার মধ্যে জীবনযাপনের সুবাদে নানাবিধ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে নতুন চিন্তার উত্তরণ ঘটবে আর জন্ম নেবে নতুন দৃশ্যের, এটাই স্বাভাবিক। অথচ আমাদের দেশে শিল্পকর্ম রচনায় স্থায়িত্বের ধারণার ফলে বিদ্যমান বাস্তবতার এ পর্বে শিল্পকর্ম হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক পণ্য এবং শিল্পের অভিনব উদ্ভাবন সম্ভাবনার ব্যাপ্তি হয়েছে সংকুচিত। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার চেয়ে দক্ষতা এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে। দৃশ্যশিল্প সময়চিন্তার দৃশ্যমান রূপ থেকে সরে গিয়ে হয়ে উঠেছে একধরনের টেলিওলজিক্যাল সংস্করণ। তাই রাবার ডাকের মতো সমসাময়িক দৃশ্যশিল্পের পাঠের মধ্য দিয়ে আজকের বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলোকে চিন্তার পরিমণ্ডলে স্থান দিয়ে রচনা করতে হবে আগামী দিনের দৃশ্যশিল্প। পরিশেষে মনে রাখতে হবে, দার্শনিক হেরাক্লিটাসের উক্তিটি ‘তুমি একই নদীতে দুবার পা রাখতে পারো না’ কেননা প্রবহমানতার ভেতর দিয়ে নদীটি মুহূর্তেই আর আগের মতো নেই; অন্যদিকে সময়ের নির্নিমেষ অভিজ্ঞতা আর আবেগের ক্রমাগত রূপান্তরের ভেতর দিয়ে বিকশিত মানুষটিও একই ব্যক্তি নয়। তাই ব্যক্তির রচিত শিল্পকলার দৃশ্যরূপও পরিবর্তনশীল। এখানে আমরা দেখব বহুকাল থেকেই রাবার ডাক একটি সাধারণ, দৈনন্দিন শিশুর স্নানের খেলনার উপাদান হিসেবে বিবেচ্য ছিল, কিন্তু শিল্পী হফম্যান তার চিন্তায় রাবার ডাককে গ্রহণ করে স্মারক শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত করেন। এ রূপান্তরের ভেতর দিয়ে শিল্পী আগামী দিনের শিল্পীদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পরিচিত বস্তুগুলোকে শিল্পবস্তু হিসেবে নির্বাচনে পরিবর্তিত সময়ের ভাবনার মর্মার্থ বিবেচনায় অনুসন্ধান ও পুনর্বিবেচনা করতে আমন্ত্রণ জানান।