‘ভূত’ বলতে আমরা কী বুঝি? একসময় শব্দটি হোলি ট্রিনিটির তৃতীয় অংশকে বোঝাতে ব্যবহার করা হতো। অর্থাৎ হলি ঘোস্ট বা পবিত্র আত্মা। শিল্পে একে প্রায়ই কবুতর, অগ্নিশিখা বা আলোর রশ্মি আকারে দেখানো হতো। আজকাল ইংরেজিতে এ ধর্মীয় ব্যবহারটি অনেকটাই বিলুপ্ত। তার জায়গায় এসেছে ‘স্পিরিট’। কারণ ‘ঘোস্ট’ শব্দটি এখন মৃত মানুষের (বা প্রাণী) আত্মার প্রকাশ বা অবয়ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীরা ভূত, প্রেত, ছায়া ইত্যাদিকে নানাভাবে উপস্থাপন করেছেন।

ভূতদের ক্ষেত্রে লেখায় তার উপস্থিতি পুরনো। আর অন্যতম জনপ্রিয় হলো হ্যামলেটের বাবার ভূত। চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে শিল্পী উইলিয়াম ব্লেকের চিত্র ‘দ্য ঘোস্ট অব আ ফ্লিয়া’ বেশ বিখ্যাত। এটি তার ‘ভিশনারি হেডস’ সিরিজের অংশ। এটি তিনি শিল্পী ও জ্যোতিষ জন ভার্লির (১৭৭৮-১৮৪২) অনুরোধে করেছিলেন। ব্লেক ও ভার্লি একসঙ্গে বসে প্রেত নিয়ে আলাপ করতেন। আর একবার তেমন এক সেশনে নাকি এ ভূত তাদের সামনে হাজির হয়। ভার্লি আত্মাদের দেখতে পেতেন না, তাই ব্লেক তাদের আঁকতেন।

অতীতে রোগব্যাধির প্রেতছায়াকেও ‘ভূত’ হিসেবে দেখা হতো। ডিপথেরিয়া থেকে টিউবারকিউলোসিস সবকিছুকেই রহস্যময় বা ভূতের আছর বলে মনে করা হতো। আমাদের দেশে ওলাবিবির কথা তো জানাই। পশ্চিমেও এমন উদাহরণ আছে।

12

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বাস্তব বিভীষিকা অতিপ্রাকৃত দৃশ্যদর্শনের হার বাড়িয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈন্যরা মানসিক বৈকল্যে ভুগছিলেন। তারা সহযোদ্ধাদের ভূত দেখার দাবি করতেন। আক্ষরিক অর্থেও এর পেছনে একটা গল্প আছে। ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ‘ইভনিং নিউজ’-এ একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়। সেখানে ১৪১৫ সালের অ্যাজিঙ্কোর্ট যুদ্ধে নিহত ইংরেজ ধনুর্ধররা আধুনিক যুদ্ধে দেশের পক্ষে লড়তে ভূতরূপে ফিরে আসে। সাহিত্যের ভূত ছবিতেও আসতে শুরু করে।

কোপেনহেগেনে জন্মেছিলেন জর্জ এমিল গিলবার্ট। তার আঁকা একটি ছবি উত্তর ইউরোপের উনিশ শতকের রোমান্টিক ধারার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

ছবিতে দেখা যায়, একটি বরফ জমা নদীর ধারে তিনটি ছেলে খেলছে, আর মাঝারি দূরত্বে একটি ভূতুড়ে প্রাসাদ দেখা যাচ্ছে। ১৮৪৭ সালের কাজটি তিনি মিউনিখে গিয়ে করেছিলেন, যেখানে তিনি ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিডরিখ-প্রভাবিত রোমান্টিক শিল্পীদের এক দলকে দেখেন।

13

চিত্রকর ও নকশাবিদ জেমস ফেরিয়ার প্রাইড তার ভয়াল স্থাপত্যমূলক দৃশ্যগুলোর জন্য বিখ্যাত। ছবিগুলোতে বিশাল অন্ধকার ভবনের সামনে মানুষের আকৃতি তুচ্ছ হয়ে ওঠে। তার একটি ছবির নাম দ্য হন্টেড হাউজ। এর জানালায় যে ছায়ামূর্তি দেখা যায় তা দর্শকের মধ্যে ভৌতিক অনুভূতি তৈরি করতে বাধ্য।

ঘোড়া ও দৌড় প্রতিযোগিতা নিয়ে অসংখ্য চিত্র এঁকেছেন আলফ্রেড মানিংস। তবে ভূতুড়ে বিষয়েও হাত দিয়েছেন। তার প্রথম দিকে একটি ছবি ইন দ্য রুম: আ প্রবলেম পিকচার। ১৯৫২ সালে রয়্যাল একাডেমিতে প্রদর্শিত হলে এটি দর্শক ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে আলোড়ন তোলে। কারণ এটি মানিংসের স্বাভাবিক ঘরানার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শিল্পী বলেছিলেন, তিনি ছবিটিকে ‘নিজ থেকেই গড়ে উঠতে’ দিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি কেবল বিছানায় শুয়ে থাকা চরিত্রটিকেই এঁকেছিলেন। পরে তার মনে হলো ছবিতে একটি ভূত থাকা উচিত।’ গল্পের ব্যাখ্যা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘হয়তো বিছানার পাশে পড়ে থাকা মানুষটি কোনো দ্বন্দ্বযুদ্ধে ভূতটিকে হত্যা করেছিল।’

মানিংসের এটিই একমাত্র অতিপ্রাকৃত কাজ নয়। তার আরেকটি ছবির বিষয়বস্তু হয়তো রবার্ট বার্নসের একটি কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত। আত্মজীবনীতে তিনি বিষয়টিকে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে—‘একটি গ্রামীণ যুগল, চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে, এক নারী প্রেতাত্মার দিকে চেয়ে আছে। তার বাহু প্রসারিত, সুন্দর মাথা আকাশের তারার দিকে তুলে ধরা, সাদা পোশাক ঝুলছে শান্ত জলে, যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে তার আলোকিত অবয়ব ও চাঁদের কাস্তে।’

14

কারেল ভিক্টর মরলেইস রাইট (১৯০৮-১৯৯৭) দীর্ঘদিন লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব আর্টের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তার একাকী শৈশব ছিল ভূতের স্বপ্নে পরিপূর্ণ—সেই অতিপ্রাকৃত অনুভূতি তার অনেক কাজেই ধরা পড়ে। ১৯৮০ সালের ঘোস্ট ইন গার্ডেন ভূতকে সরলভাবে আঁকার একটি উদাহরণ। এতে কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো প্রতীকও নয়। হয়তো সেটাই ছবির শক্তি—ভূত যেমন ব্যাখ্যাতীত, ছবিটিও তেমনি।

আরেকটি ব্যতিক্রমী কাজ হলো এক চিত্র, যেখানে স্থানীয় প্রত্নতাত্ত্বিক (এবং শিল্পী) জেমস বেন্টলি ব্রুকহিল, বাকলির (ফ্লিন্টশায়ার, উত্তর ওয়েলস) মাটিতে মধ্যযুগীয় মৃৎপাত্র খনন করছেন। তাকে ঘিরে আছেন সেই মৃত কুমারদের প্রেতাত্মারা, যারা একসময় এ হাঁড়িগুলো তৈরি করেছিলেন, এখনো যেন কৌতূহলভরে দেখছেন তাদের পুরনো কাজ।

অস্বস্তি তৈরি করে এমন কাজগুলোর একটি হলো ফিনিশ শিল্পী কিম সিমনসনের ঘোস্ট নামের ভাস্কর্য। চকচকে সাদা পাথরের মতো দেহ, নিষ্প্রাণ চোখ—এ ভৌতিক শিশুর মূর্তি যেন হরর সিনেমা থেকে উঠে এসেছে। শিল্পী জোহান স্যোস্ট্রমের কথায়, ‘তার গ্লেজড স্টোনওয়্যারের ভাস্কর্যগুলো সচেতনতা ও অবচেতনের সীমারেখার দুই পাশেই কাজ করে। এগুলো এমন এক অজানা ভূমির নীরব দূত, যাদের মধ্যে এক অদ্ভুত কালাতীত গুণ আছে।’ অর্থাৎ এদের সময়ের মধ্যে বাঁধা যায় না।

ভৌতিকের বাইরে গিয়েও এমন অনেক ছবি পাওয়া যায় যেগুলোকে ভয়জাগানিয়া বলা যায়। এর মধ্যে মাস্টার পেইন্টারদের ছবিও আছে। ১৫৯৮-৯৯ সালের মধ্যে কারাভাজ্জিও আঁকেন ‘জুডিথ বিহেডিং হোলোফার্নস’। এটি বাইবেলের একটি ঘটনার চিত্ররূপ। এ ঘটনায় এক নারী তার নিজ গোত্রের মানুষদের মুক্ত করেন শত্রুদের নেতাকে হত্যা করে। ছবিতে একটি শিরশ্ছেদ চিত্রিত হয়েছে।

তেমনিভাবে তিশিয়ানের একটি ছবিও এ ঘরানায় ফেলা যায়। দ্য পানিশমেন্ট অব মার্সিয়াস বা দ্য ফ্লাইং অব মার্সিয়াস শিরোনামের ছবিটি ওভিদের একটি গল্প থেকে অনুপ্রাণিত। এতে দেখা যায়, উল্টো করে ঝোলানো জীবন্ত মার্সিয়াসের শরীর থেকে মাংস তুলে নেয়া হচ্ছে। আর এ শাস্তিপর্ব রীতিমতো উদযাপিত হচ্ছে।

১৬০৮-১১ সালের মধ্যে পিটার পল রুবেনস আঁকেন ‘ম্যাসাকার অব ইনোসেন্টস’। এটিও বাইবেলের একটি ঘটনার মোটিফ। এতে অ্যান্টওয়ার্পের আট হাজার মানুষের হত্যাকাণ্ড প্রতীকীভাবে চিত্রিত হয়েছে। রুবেনস দুটি ছবি এঁকেছিলেন, যার একটা হারিয়ে গিয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় সপ্তদশ শতাব্দীর শেষে। এটি অন্যতম ‘বারোক পাস্টারপিস’ হিসেবে গণ্য।