‘স্মৃতির জাদুকর’ বীরেন সোম। ‘শিল্পাঙ্গন’-এর আয়োজনে লালমাটিয়ায় ‘গ্যালারি ইলিউশন’-এ চলছে তার চতুর্দশ একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘স্টোরিজ অব মেমোরিজ’। প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে সেখানে বসেছে চিত্রকলার এক দুর্লভ মিলনমেলা। উদ্বোধনী সন্ধ্যায় গুরু রফিকুন নবী ও শিষ্য বীরেন সোমের সন্নিহিত উপস্থিতি ও ভাববিনিময় এ যুগের শিল্পকলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। উদ্বোধনের অংশ হিসেবে গ্যালারিতে প্রবেশের আগমুহূর্তে শিল্পী রনবী সাদা ক্যানভাসে নারী মুখাবয়ব অঙ্কন করেন। সঙ্গে প্রদীপ জ্বেলে আলোকিত করা হয়।

বাংলাদেশের চিত্রকলা ও মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা ইতিহাসে বীরেন সোম এক স্মরণীয় নাম। বীরেন সোমের চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে বাংলার মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীন বাংলার স্পৃহা। তেমনই জাগ্রত হয়েছে ভালোবাসা, স্মৃতি, রমণীয়তা ও বাংলা মায়ের রূপবৈচিত্র্য। এ প্রজ্ঞাবান শিল্পী তার তারুণ্যে ছিলেন অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফার মঞ্চ ও লে-আউট প্রস্তুত করেন তিনি। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে চারুকলার হোস্টেলে রাত জেগে আঁকতেন পোস্টার-ব্যানার। মুক্তিযুদ্ধের অনেক পোস্টারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতার বিড়লা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীতে তার আঁকা ‘দুঃস্বপ্ন’ ও ‘কান্না’ চিত্রকর্ম দুটি বিশ্বমঞ্চে একাত্তরের গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিল।

28

পাল আমলের প্রাচীন অনুচিত্র, মোগল মিনিয়েচার ও ওরিয়েন্টাল আর্টের (প্রাচ্যরীতি) সুমিত ভারসাম্যকে বীরেন আধুনিক চারুকলায় রূপান্তর করেছেন। জয়নুল আবেদিন ও এসএম সুলতানের বলিষ্ঠ রেখাকে রেখাচিত্রের মূল মেরুদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে এবং পটুয়া কামরুল হাসানের লোকজ শৈলীর নির্যাস থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বিমূর্ত প্রকাশবাদ।

তার জীবনের আরেকটি অনন্য অভিজ্ঞতা ছিল ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়াম’-এ প্রধান চিত্রশিল্পী হিসেবে দীর্ঘ চাকরিজীবন। স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে কাজ করার সুবাদে বিভিন্ন বিরল গাছপালা, লতা-গুল্ম ও ফুলের সূক্ষ্ম গঠন তাকে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ ও অঙ্কন করতে হয়েছে। লতাপাতা আর গাছের সূক্ষ্ম রেখাগুলোকে তিনি নিজের রোমান্টিক মননে মেখে ক্যানভাসে পরিণত করেছেন নারীদেহের বাঁক, চুলের ঢেউ কিংবা আলংকারিক রূপকল্পে। যেমনটি দেখা যায় সোনারগাঁর লোকজ সরাচিত্রে আঁকা লক্ষ্মী বা সরস্বতীর রূপকল্পের সঙ্গে গাছপালার সহজিয়া মেলবন্ধনে।

29

‘স্টোরিজ অব মেমোরিজ’-এ মোট ৫৩টি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে ‘রেড ফ্যান্টাসি’ শিরোনামের সুবিশাল ক্যানভাসটি অন্যতম আকর্ষণ। ক্যানভাসজুড়ে লাল রঙের ছোঁয়া, তার ওপর মেটালিক গোল্ডেন টেক্সচারের আলো-ছায়া। ছবিতে শিল্পীর ভেতরের অনুরাগ, জীবনের তেজ ও স্মৃতিকে তুলে ধরেছেন। চোখ আটকে যায় ঘোর কালো পটভূমিতে আঁকা ‘ওম্যান উইথ পিকক’ চিত্রকর্মটিতে। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সোনালি ও রুপালি কালির স্বতঃস্ফূর্ত টানে আঁকা হয়েছে এক রূপময়ী নারী ও ময়ূর। প্রাচ্যরীতি বা ওরিয়েন্টাল আর্টের যে সুচারু লালিত্য, তা যেন এ কালো ক্যানভাস ভেদ করে আলো হয়ে ফুটে উঠেছে।

‘ফ্রিডম’-এ প্রকাশ পাচ্ছে নারী মুক্তি, যেখানে খাঁচা ভেদ করা পাখিকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। কালো ক্যানভাসে আঁকা চিত্রকর্মগুলো এ প্রদর্শনীতে এক ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছে। বাঙালি নারীর কপালে বড় লাল টিপ, ঐতিহ্যবাহী নথ আর আলংকারিক সজ্জা। এছাড়া তার চিত্রকর্মে নারী চরিত্রের বিশেষ উপস্থিতি পাওয়া যায়, যেখানে রূপক হিসেবে জীবনবোধের নানা দিক প্রকাশ পায়। ছবিতে আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন সাঁইজির একনিষ্ঠ সমাগম।

‘ভিক্টরি’ টাইটেলের চিত্রকর্মের মধ্যে শিল্পী ধরে রেখেছেন একাত্তরের সেই শাশ্বত স্মৃতি। এ ছবিতে একাত্তরের উদিত রক্তিম সূর্য, উড্ডীন জাতীয় পতাকা, মুক্ত আকাশে উড়ন্ত পাখি এবং দৃঢ়প্রত্যয়ী অবয়ব, যা স্বাধীনতার চূড়ান্ত অর্জনকে উদ্ভাসিত করে। গ্যালারিতে আরো প্রদর্শিত হচ্ছে বাংলার ঐতিহাসিক স্থাপত্য, যা অন্য এক অতীত অভিযাত্রায় নিয়ে যায়। সময়ের করাল গ্রাসে স্মৃতির ক্ষয়কে রেখার আঁচড়ে ধরে রেখেছেন শিল্পী বীরেন সোম।

30

একাত্তরের সেই ‘তোবড়ানো ঘোড়ার আর্তনাদ’ ও ‘ঘৃণার দ্রোহ’র পথ ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন থেকে আজকের ‘স্টোরিজ অব মেমোরিজ’-এ এসে বীরেন সোমের তুলি যেন পৌঁছে গেছে নান্দনিক পূর্ণতা ও প্রশান্তিতে। বিড়লা একাডেমির রক্তঝরা দিন থেকে গ্যালারি শিল্পাঙ্গনের আজকের এ উৎসবমুখর পরিবেশ—বীরেন সোমের প্রতিটি ক্যানভাস যেন বাংলাদেশের ইতিহাস ও সৌন্দর্যের দলিল।

গত ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন শিল্পীর শিক্ষক, বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। গ্যালারি শিল্পাঙ্গনের কর্ণধার রুমি নোমান স্বাগত বক্তব্য রাখেন। শিল্প সমালোচক অধ্যাপক মঈনুদ্দিন খালেদও আলোচনা করেন।

আগামী ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ‘গ্যালারি ইলিউশন’-এ চলবে এ প্রদর্শনী।

লেখক: গবেষক ও পরিবেশকর্মী