হয়তো বাইরেরও তার একটা জীবন আছে, কিন্তু অনেকটা সময় থাকতে হয় ভেতরেই। তার গৃহস্থালিতে। এর মধ্যেই তার এক বা একাধিক পরিচয়, থাকে স্মৃতি, থাকে পরিবর্তন। কিন্তু সেসব উদযাপন করা হয় না খুব একটা। নারী, তার স্মৃতি, পরিচয়, পরিসর, গার্হস্থ্য ও পরিবর্তনকে নানা মাধ্যমের শিল্পকর্মে উপস্থাপন করেছেন শিল্পী সারা জাবিন। তার শিল্পকর্ম ও প্রদর্শনী মিলিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে নারীর বিভিন্ন পর্যায়।
শিল্পী বাঙালি তথা বাংলাদেশের নারীদের দেখেন দেশের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে। এ দেশের সংস্কৃতি নানাভাবেই নারীর সঙ্গে যুক্ত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসেছে পরিবর্তন। সারা জাবিন তার শিল্পের মাধ্যমে সেই সংস্কৃতি ও পরিবর্তন ধরতে চেয়েছেন। চারটি স্বতন্ত্র শিল্পধারায় তিনি এসব তুলে ধরেছেন।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে ঢুকেই হাতের বাম দিক থেকে শুরু হয় ‘আনফরগটেন’। এ অংশে তামার তার ও কাপড় ব্যবহার করে শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়েছে। এরপর আসে ‘শার্সি’। এ কাজগুলোর মধ্যে তিনি আশি ও নব্বইয়ের দশকের নারীর জীবনযাপন ফুটিয়ে তুলেছেন। এ সময়ে নারীদের একটা বড় অংশই বসবাস করতেন ঘরের অভ্যন্তরে। তার মধ্যেই নারীরা নানা সুচিকর্ম, কবিতা ও নানা মাধ্যমে নিজেদের ব্যস্ত রাখতেন। নানা ঘরোয়া উৎসবও হতো। সেসবেরই উপস্থাপনা ‘শার্সি’।
‘শার্সি’ নিয়ে সারা জাবিন বলেন, ‘শার্সি আসলে রূপক। শার্সি হলো কাচ। এখানে আশি ও নব্বইয়ের দশকের নারীদের জীবন খুব একটা রঙিন ছিল না। তারা বেশির ভাগ ঘরেই থাকত। চাইত ঘরটাকে সুন্দর করে রাখতে। ওয়ালম্যাট থেকে কুশন কভারে তারা নিজেদের শিল্পমন ফুটিয়ে তুলত। আমার মনে হয়েছে, সে সময় নারীদের জন্য তাদের ঘরটাই ছিল প্রতিদিনের একটা এক্সিবিশন। শার্সিতে সেটাই আনার চেষ্টা করেছি।’
এর পরেই আসে ‘আনফরগটেন’। এ সমাজে বহু রকম উৎসব ছিল। সেসবের অনেকগুলোই হারিয়ে গেছে। কিছু এখনো আছে। ‘আনফরগটেন’ সেই উৎসবগুলোকে মনে করার চেষ্টা। সারা জাবিন বলেন, ‘আমাদের ঢাকায় এখন অনেক উৎসব অনেক বড় হয়ে গেছে। গায়ে হলুদ, পিঠা উৎসব এখন বড় করে করা হয়। একটা সময় এগুলো ঘরোয়া ছিল। কান ফোঁড়ানোরও উৎসব হতো। বন্ধু, কাজিনরা আসত, পরিবারের বড়রা আশীর্বাদ করতেন। এখন সেসব প্রায় নেই। এ সিরিজে সেই উৎসবগুলোর একটা চিত্র উপস্থাপন করতে চেয়েছি।’
গ্যালারিজুড়ে শিল্পীর কাজের প্রতিফলন, আক্ষরিক অর্থেই। ‘আনফরগটেন’-এ তামার তার ও কাপড়ে শিল্পকর্ম তৈরি, ‘শার্সি’তে কাপড়। কিন্তু দুই ধারাতেই আলোর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। কাজগুলোর ওপর আলো পড়ে গ্যালারির দেয়ালে তৈরি হয়েছে এগুলোর ছায়া। কেবল সামনের কাজটির দিকে তাকালেই হবে না, প্রতিফলনে চোখ রাখলেই পূর্ণাঙ্গ চিত্রটি দেখা যায়। ‘শার্সি’র একটি কাজে দেখা যায়, দেয়ালে একদিকে সোফাসেট, আরেক দিকে একটি টেবিল ফ্যান। নব্বইয়ের দশকের পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু সোফা আর ফ্যান একই উপকরণের ওপর একসঙ্গে নেই। ছায়াতেই দুটো একসঙ্গে দেখা যায়।

নারীকে রূপকের বাইরেও সরাসরি দেখেছেন শিল্পী। ‘বন ভয়েড’ সিরিজে একজন নারীকে রেখেছেন। লিনোকাট ও ফটোগ্রাফে তাকে উপস্থাপন করেছেন। এ দুই ধারায় নারীর জীবনের দুই অধ্যায় তিনি এনেছেন। শিল্পী বলেন, ‘বিয়ের আগে তার জীবন এক রকম ছিল, বিয়ের পরে আরেক রকম। আগে তিনি ছুটে বেড়াতেন, স্বাধীন ছিলেন। কিন্তু এর পরের জীবনটা গার্হস্থ্য। আরেকটি খেয়াল করার মতো বিষয়, আগের ছবিগুলোতে তাকে দেখা যায়, তিনি সামনে তাকিয়ে আছেন; পরের ছবিগুলোতে দৃষ্টি নত।’
প্রদর্শনীতে ধবধবে সাদা কিছু ভাস্কর্য দেখা যায়। সোপ কম্পোজিট দিয়ে তৈরি এ সিরিজের নাম ‘বিয়োগ সময়’। পুরান ঢাকার স্থাপত্যকে তুলে ধরেছেন তিনি এর মাধ্যমে। সাবান ব্যবহার করেছেন এটা বোঝাতে যে চাইলে জিনিসটা সংরক্ষণ করা যায়। আবার অযত্নে রাখলে সেটা দ্রুতই নষ্ট হয়ে যায়।
চৌকাঠ—শব্দটির মধ্যে একটা বেদনা, একটা সীমাবদ্ধতা ধ্বনিত হয়। সারা জাবিন সেই বেদনা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই নারী, সময়, স্মৃতি ও আর্টকে উদযাপন করতে চেয়েছেন।










