‘দেশ আর্ট গ্যালারি’র প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৬৯। সেই বছরে ঘটে গণ-অভ্যুত্থান। এ আন্দোলনে ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা। তিনি আমাদের দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। তারই কন্যার সাবিনা জোহার হাত ধরে পাঁচ দশক পর আবার দেশ গ্যলারির যাত্রা। বিষয়টি আনন্দের। তবে তা শুধু শিল্পী সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ইতিহাসের সঙ্গে অনন্য এক সেতুবন্ধনের ঘটনাও।
ইতিহাসের পুনর্জাগরণের মুহূর্তটি দেখতে ৯ আগস্ট সকালে উপস্থিত হই রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১২ নম্বর সড়কের ১৩/১ নম্বর বাড়িতে। উদ্বোধক ছিলেন শিল্পী রফিকুন নবী। তিনিও আবেগে মথিত হয়ে পড়েন গ্যালারির ইতিহাস জানাতে গিয়ে। বলেন, ‘এই গ্যালারি আমাদের কালের, আমাদের সময়ের।’
বরেণ্য এ শিল্পীর কাছ থেকে জানা যায়, আমাদের দেশের আর্ট গ্যালারি শুরু হয়েছিল ছোট্ট একটা শপ থেকে। ষাটের দশকে বাণিজিক যেসব গ্যালারির নাম পাওয়া যায়—ধানমন্ডির ‘আর্টস অনসম্বল’, গুলশানের ‘সাজু আর্ট গ্যালারি’ ও শাহবাগের ‘জিরাজ গ্যালারি’ এবং ‘দেশ আর্ট গ্যালারি’র নাম অন্যতম। সাবিনা জোহার খালু ইউসুফ সাঈদ ছিলেন দেশ গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা। সাবিনা জোহার কাছে অনুভূতি জানতে চাইলে বলেন, ‘১৯৭৪ সালে গ্যালারি যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন আমি শৈশব পার করছি। তিন বছর বয়সে আমি বাবাহারা হয়েছি। খালুর গ্যালারিতে আমার কাটানো সময়গুলো ছিল আনন্দময়। সেই স্নিগ্ধতা ভরা শৈশবের স্মৃতিকে ফিরে আনতে আমাদের এ প্রচেষ্টা। এটি চালু করা ছিল আমার আজীবনের লালিত স্বপ্ন।’
কথাগুলো বলতে বলতে তিনি আবেগে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। বারিধারার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ গ্যালারির অবস্থান, যা দেশের শিল্প সমাজের জন্য আনন্দের খবর। জানালেন শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের শিল্পীদের পেইন্টিং বিদেশীদের কাছে তুলে ধরার অনন্য এক সূত্র হিসেবে কাজ করবে বলে আশা রাখি।’
দেশের স্বনামখ্যাত ও স্বশিক্ষিত শিল্পীসহ ৩৮ শিল্পীর চিত্রকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছে গ্যালারির দেয়াল। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এসএম সুলতান, হামিদুজ্জামান খানের মতো বিখ্যাত শিল্পীর পাশাপাশি নবীন শিল্পীদের কাজও প্রদর্শিত হচ্ছে। মাস্টার পেইন্টারদের কাজগুলো শুধু প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে।
ছবি গ্যালারির শোভাবর্ধন করেছে এমন অনেক ছবি রয়েছে। আবদুস শাকুর শাহের ‘গ্রামের গল্প’ শিরোনামে একটি চিত্রকর্ম দর্শনার্থীদের অনেকখানি ভাবিয়ে তোলে। লোকজ ধারার কাজ, মূর্ত, বিমূর্ত নানা ধরনের কাজ রয়েছে গ্যালারির দেয়ালে। শাকিলা খান চয়নের ‘আমার বাংলা’ শিরোনামের একটি চিত্রকর্মে চোখ আটকে গেলে। এ দৃশ্যচিত্রে তিন রমণী কলসি কাঁখে জল ভরে ফিরছে কি নদীর ঘাটে যাচ্ছে! তা জানা না গেলেও রমণীদের দেখে বোঝা যায়, তারা গল্পে মশগুল। তিন রমণীর মধ্যে মিতালির ভাবটিও শিল্পী নিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন। আবহমান বাঙালি রমণীদের চিত্রটি কালারে কম্বিনেশনেও চিত্তাকর্ষক। মনোহারিণী। মায়াময়।
গ্যালারি ঘুরে দেখছি। এরই মধ্যে এক তরুণকে দেখি কনকচাঁপা চাকমাকে বলছেন, ‘আপা এটি আমার কাজ।’ নন্দিত এ শিল্পীকে তার কাজটি দেখালেন। মুহূর্তটি আমার হৃদয়ে গেঁথে রইল। আনন্দের ঢেউ খেলে যেতে দেখলাম তরুণের চোখে-মুখে। নাম তার রাকিন নওয়ার। চারুকলার একাডেমিক পাঠ এখনো সমাপ্ত হয়নি। গ্যালারিতে তার যে কাজটি রয়েছে সেটির শিরোনাম ‘টমটম’। ঢাকার গুলিস্তান এলাকার দৃশপট। বরেণ্য শিল্পীদের সঙ্গে তার কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে, যারপরনাই আনন্দিত তিনি। দেখা হয়, নওয়ারের আরেক সতীর্থ সিরাজুম মনিরার সঙ্গে। তিনি এঁকেছেন ‘কালারস অব পুরান ঢাকা’ শিরোনামে একটি কাজ। চিত্রকর্মটিতে পুরান ঢাকার খাদ্য সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন তুলে ধরেছেন। চোখ ধাঁধিয়ে দেয় তার কাজটি। রয়েছে আফজাল হোসেনের ‘পরিবার’ শিরোনামের একটি কাজ, যেখানে দেখা যাচ্ছে মা ও ছেলেকে। ছেলের প্রতি মায়ের মমত্ববোধের চিত্র ফুটে উঠেছে এখানে। শিল্প সমঝদাররা এসব চিত্রকর্ম সংগ্রহ করতে পারবেন।
মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত গ্যালারির দুয়ার খোলা দর্শনার্থীদের জন্য। উল্লেখ্য, গ্যালারি প্রদর্শনী চলমান থাকবে অনির্দিষ্টকালের জন্য।










