তিন চাকার যান চলছে। কখনো থেমে আছে যানজটে। আজকের দিনে বিষয়টি বিরক্তির। কেননা আমাদের জীবন খুব দ্রুতগতির। যানজটও বেড়েছে খুব। কিন্তু একটা সময় এত জটিলতা ছিল না। তখন যানজটে বসে অনেকে সামনের রিকশার দিকে তাকিয়ে থাকত। দেখত রিকশায় আঁকা নানা চিত্র। এগুলো রিকশা আর্ট নামে পরিচিত। রিকশার পেছনে একটা টিনের পাতে আঁকা হতো সিনেমার দৃশ্য, তাজমহল, ঢাকার কোনো দৃশ্য কিংবা মসজিদ। পরবর্তী সময়ে কেবল রিকশা নয়, রিকশার বাইরেও এ ধারার ছবি আঁকা হতো, যা রিকশা আর্ট নামে পরিচিতি পায়। সেই রিকশা আর্টকেই সবার সামনে নতুন করে নিয়ে এলেন শিল্পী নব কুমার ভদ্র।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার গুলশান শাখায় চলছে এ প্রদর্শনী। Rickshaw Artistry: A World Heritage নাম দেয়া হয়েছে আয়োজনের। ১০ জানুয়ারি অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রেক্স মোলার। প্রদর্শনীতে মোট ১৬টি চিত্রকর্ম, ১৭টি পেন্সিল স্কেচ ও টিনের ওপর আঁকা ৩৬টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে।

17

নব কুমার ভদ্র ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রিকশাচিত্রের প্রাচীন ঐতিহ্যকে লালন করছেন, ধারণ করছেন তার তুলিতে, টিনের ক্যানভাসে। তিনি আশির দশকে পেশাদার চিত্রকর হিসেবে ঢাকাই চলচ্চিত্রের রঙিন পোস্টার আর ব্যানার আঁকতে শুরু করেন। কিন্তু তার যাত্রা সেখানে থেমে থাকেনি। নব একসময় প্রবেশ করেছেন বহুবর্ষী প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রিকশাচিত্রের ভুবনে। নব এরই মধ্যে ঢাকার রিকশচিত্রের দৃশ্যপটে স্বতন্ত্র একটা পদচিহ্ন আঁকতে সক্ষম হয়েছেন এবং তার কাজ স্বীকৃতি পেয়েছে দেশে ও বিদেশে, সিনুয়া সংবাদ সংস্থা তার প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনীকে এশিয়ান চিত্রকলায় বিশেষ অবদান বলে উল্লেখ করেছে। তার এবারের কাজে উঠে এসেছে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ‘অ্যাকশনে থাকা’ মুখভঙ্গি ও নাটকীয় মুহূর্তগুলো; বাংলার গ্রামীণ জনপদের নৈসর্গিক শোভা ও প্রাচীন লোককথা। রিকশাচিত্রের পাশাপাশি নব তার আঁকা খুদে মডেল রিকশা, বিলুপ্ত হলুদ বেবিট্যাক্সি, মাটির সরা প্রভৃতি নিয়ে চিত্রকর্ম আছে প্রদর্শনীতে।

বেশ কয়েকটি চিত্রকর্মে রিকশা আর্টের সেই পুরনো ধাঁচ দেখা যায়। আশি-নব্বইয়ের দশকের রিকশাগুলো যারা দেখেছে তারা নব কুমারের আঁকা ছবিগুলো দেখে নস্টালজিক হবে। দেশের সিনেমা নিয়ে আগ্রহীরাও এ প্রদর্শনীতে খুঁজে পাবে ঢাকাই সিনেমার পুরনো আবহ। এছাড়া পেন্সিল স্কেচগুলোও চিত্র/শিল্পকর্ম হিসেবে খুঁটিয়ে দেখার দাবি রাখে।

নব কুমার ভদ্রের অনেক চিত্রকর্ম রিকশা পেইন্টিংয়ের সাহসী শৈলীতে প্রভাবিত, যা তার উজ্জ্বল রঙ ও নাটকীয় উপস্থাপনার জন্য বিখ্যাত, যা সাধারণ জীবনকে অসাধারণে রূপান্তর করে। তার বাংলা চলচিত্রের ওপর আঁকা চিত্রগুলো দেখে মনে হয়, যেন সেগুলোয় কিছু গতিশীলতা রয়েছে। যখন তিনি ‘প্রাণী কাহিনী’ নিয়ে কাজ করেন, তার চিত্রকর্মগুলোয় একটি স্বপ্নময় অনুভূতি তৈরি হয়, যেখানে প্রাণীরা মানুষের মতো আচরণ করে এবং পুরনো সিনেমার উজ্জ্বল চিত্রের সঙ্গে হাস্যরসের মিশ্রণ ঘটে। এ প্রাণীরা একটি সংঘাতপূর্ণ পৃথিবীতে বাস করে: মুরগি, যা শিয়ালের মতো বড়, তলোয়ার নিয়ে নায়ক চরিত্রের মতো দাঁড়ায়, আবার চিতাবাঘ হয়ে ওঠে এক চটকদার বারটেন্ডার এবং সিংহরা জীবনের সমস্যাগুলোর সঙ্গে মদ্যপান করতে আসে। তবে তার পেন্সিলের কাজগুলো আলাদা। এগুলো রঙে সাদাসিধে হলেও রিকশা পেইন্টিংয়ের শৈলীটি এখনো ফুটে ওঠে, তবে এটি আরো শান্ত ও গভীর অনুভূতি সৃষ্টি করে। এই সাদা-কালো চিত্রকর্মগুলো রিকশাশৈলীর একটি নতুন রূপ উপস্থাপন করে, যা একদিকে পরিচিত, আবার অন্যদিকে অচেনা।

এ সবকিছুই ফুটে উঠেছে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে নব কুমারের চিত্র প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীটি চলবে ২৪ জানুয়ারি। সোম থেকে শনিবার বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত।