চিত্রশিল্পী ফরিদা জামানের জন্ম ১৯৫৩ সালে, চাঁদপুরে। ১৯৭৪ সালে ঢাকা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে স্নাতক, ১৯৭৮ সালে ভারতের মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও ১৯৯৫ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে সুপারনিউমারারি প্রফেসর হিসেবে কর্মরত। চিত্রকর্মে রঙ, ধরন ও বিষয়বস্তুর নিখুঁত সমন্বয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম একুশে পদক ২০২০, বেইজিং অলিম্পিকে বিশ্বসেরা শিল্পী ২০০৮, অস্ট্রেলিয়া সরকারের সাংস্কৃতিক পুরস্কার ১৯৮৫। ফরিদা জামান তার শিল্পজগৎ এবং তরুণ ও শিশুদের ক্যানভাস নিয়ে কথা বলেছেন নভেরার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাশার খান

আপনার শিল্পজীবনের শুরু কীভাবে?

ছোটবেলায় আমি বুঝতাম না যে আমি আসলেই চিত্রশিল্পী হব। আমার স্কুলিং শুরু হয় চট্টগ্রামের কেপিএম হাইস্কুলে। স্কুলটা খুবই উন্নত মানের। ছবি আঁকার যে হাত, সেই জিনিসগুলো পেয়েছি ওই স্কুলে। সেখানে শিল্পচর্চাটা ছিল। মাটির কাজ হতো। পেইন্টিং বলতে ছোটরা যে রকম আঁকাআঁকি করে, সেগুলো করতাম। ওখান থেকেই আমার একটা গোড়াপত্তন হয়েছে—এটা আমার এখন মনে হয়। পরে ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হই। ছাত্রাবস্থায় প্রচুর কাজ করতাম। আমি পত্রিকার অলংকরণ ও বিভিন্ন ম্যাগাজিনে কাজ করেছি। বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনেরও প্রচ্ছদ করেছি।

বর্তমানে নারী শিল্পীরা নানা ধরনের প্রচুর কাজ করছেন। তবে প্রচ্ছদ আঁকায় তাদের এখনো সেভাবে দেখা যায় না। সম্ভবত আপনি বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রচ্ছদশিল্পী। প্রচ্ছদ তৈরিতে আগ্রহী হলেন কেন? এখন আবার সেটি কমিয়ে দেয়ার কারণ কী?

ছাত্রাবস্থায়ই প্রথম হাবীবুর রহমানের ‘বনমোরগের বাসা’ শীর্ষক বইয়ের প্রচ্ছদ করি। এখন কম্পিউটার ও প্রযুক্তির যুগ। কাজ করা অনেক সহজ। তখন হাতে ও ব্লকে কাজ করতে হতো। আমার একটা ইচ্ছা ছিল যে ছেলেরা অনেক কাজ করে। তাহলে আমি কেন পারব না। পাশাপাশি উপার্জনেরও একটা বিষয় ছিল। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করে কিছু টাকা উপার্জনও হচ্ছিল। তখন ছবি কম বিক্রি হতো। এখনো কম বিক্রি হয়। আমি বলব ছবি বিক্রির প্রচলনটা বাংলাদেশে তো ছিলই না। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করতে আমার ভালোও লাগত। সবটাই তো ছবি আঁকা। ইলাস্ট্রেশনও একটা ছবি। সে কারণে আমি সবকিছু করতাম।

21

পরের দিকে প্রচ্ছদ করা কমিয়ে দেয়ার কারণটা হলো দিন তো ২৪ ঘণ্টার। সবকিছু মিলিয়েই আমার জীবন। সংসার, সন্তান—সবকিছুই দেখভাল করতে হয়। আরেকটি বিষয়, এখন তো তরুণ শিল্পীরা প্রচুর প্রচ্ছদের কাজ করছে। তারা টেকনিক্যাল জায়গায় অনেক উন্নত। কিন্তু আমি তো সব হাতে-কলমে করি। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ কমিয়ে দেয়ার এটাও একটা কারণ হয়তো।

বাংলাদেশে আপনার সমসাময়িক নারী চিত্রশিল্পীর সংখ্যা খুবই কম অথবা নেই বললেই চলে। শিল্পজগতে প্রবেশকালে সামাজিক বা অন্য কোনো সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল কি?

নারীরা একেবারেই যে ছিল না এমন নয়। তারা হয়তো আমার মতো করে রেগুলার কাজ করছে না অথবা ঘটনাচক্রে কোনো কারণে প্রচারটা হয়নি। যেমন আমি নিজে প্রচার পছন্দ করি না। আসলে কন্টিনিউ করা নারী আর্টিস্ট কমই। রুমি ইসলাম বেশ নামকরা চিত্রশিল্পী। আমাদের অনেক সিনিয়র।

শিল্পজগতের জন্য আমাকেও অনেকগুলো বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। আমি আমার ভেতর থেকে সময়টাকে বের করে নিই। সীমাবদ্ধতা বা যে বাধাগুলো আসে—আমার ধৈর্য, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম দিয়ে আমি এগুলো অতিক্রম করতে পেরেছি। আমার তিন সন্তান। আমি সংসারের কাজ সেরে ব্যালান্স করে কাজ করেছি। এটা আমার ইচ্ছাশক্তির কারণেই সম্ভব হয়েছে।

জাল, জল, মাছ ও লতাপাতা আপনার চিত্রকর্মের অন্যতম অনুষঙ্গ। কাজের মধ্যে লোকজ বা গ্রামীণ উপাদান বেছে নেয়ার কারণ কী?

কারণ হলো বাংলাদেশ। আমি আমার দেশকে ভালোবাসি। আমি মনে করি, আমার জীবন, আমার আচরণ, আমার ব্যবহার—আমি যা কিছু করি, সবই এ দেশের সঙ্গে জড়িত। আমার দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ধরার জন্য যেভাবে এগোনো দরকার, ঠিক সেভাবেই কাজ করেছি। চাঁদপুরে আমাদের গ্রামের নাম সাচিয়াখালী। গ্রামটি ডাকাতিয়া নদীর পারে। তখন ডাকাতিয়া নদী অনেক বড় ছিল। আমার খুবই পছন্দ ছিল নৌকা ভ্রমণ। আমি কখনই নৌকার ভেতরে থাকতাম না। আমার ভালো লাগত নৌকার গলুইয়ে বসে থাকা। চারপাশের প্রকৃতি দেখা, নদীর পানির ভেতরে কী কী আছে সেগুলো দেখা। তারপর নৌকার জাল—এ জিনিসগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখতাম।

আমি যখন কাজ করি, তখন আমি একটা আইডেন্টিটি খুঁজি। প্রকৃতি ও জীবন—এ দুটোই আমার কাছে দেশ। এভাবেই বিষয়গুলো আমার কাছে এসেছে। এগুলো আমাদের রুটস। মাছ ধরার জালগুলো যেভাবে রোদে ঝুলে ঝুলে শুকায়, মাছ ধরার সময় যেভাবে জাল ফেলা হয়, যেভাবে জালগুলো পড়ে থাকে—এ দৃশ্যগুলো আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। সে কারণেই বিষয়টা আমার ভেতরে খুব গভীরভাবে ঢুকে গেছে।

অন্য জীবন যা-ই থাকুক, ছবি আঁকার অঙ্গনটাই আমার প্রধান চিন্তার জায়গা। শিল্পচর্চায় আমি আমার দেশের শেকড় খুঁজেছি। এ শেকড় খুঁজতে গিয়েই আমি সুফিয়াকে পেয়েছি, ফোক এলিমেন্টসের লাইন পেয়েছি। বাঙালিয়ানা ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটা আমি আমার কাজে এনেছি। আর সুফিয়া আসলে একটা পথশিশু। সুফিয়া আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই নেয়া। পরে অবশ্য আমি সুফিয়াকে নানাভাবে অলংকৃত করেছি। সেখান থেকেই শুরু হয় ‘সুফিয়া সিরিজ’।

ছবি আঁকায় শিশুদের আগ্রহ অনেক। আপনি তাদের বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত করেন। তারা সাধারণত বাংলার গ্রাম, নদী-প্রকৃতি, শহীদ মিনার, জাতীয় পতাকা ও স্মৃতিসৌধের ছবি বেশি আঁকে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

বিষয়টি কিছুদিন আগেও একটা বড় অনুষ্ঠানে দেখেছি। বাচ্চাদের ছবিগুলো প্রায় সব একই টাইপের হয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে এটা একটা দুর্বলতা মনে হয়। এর কারণ হলো বাচ্চাদের দেখার জায়গাটায় একটা বড় গ্যাপ আছে। শহরের একটা ছেলে গ্রামের ছবি আঁকে, কিন্তু সে গ্রামটা তো সত্যি দেখে না। টেলিভিশনে দেখে, বইয়ে দেখে—সেটা দেখে ছবি আঁকে। আবার গ্রামের ছেলেমেয়েরা শহীদ মিনার, শাপলা আঁকে। কিন্তু তারা কী দেখে? অনেকেই হয়তো ঢাকায় একটুখানি আসে, সেটুকুই দেখে। আমি নিশ্চিত, প্রকৃতির কাছে না গেলে বাচ্চাদের চোখ কখনই তীক্ষ্ণভাবে খুলবে না। তাদের দেখা দরকার। আর দেখানোর ব্যবস্থাটা আমাদেরই করতে হবে। এ দায়িত্ব গার্ডিয়ানদের, স্কুলেরও। কিন্তু আমাদের এখানে সেই ব্যবস্থা নেই। অনেক বড় বড় নামকরা স্কুল আছে, কিন্তু সবই ওই চার দেয়ালের ভেতর। বাচ্চারা সত্যি সত্যি প্রকৃতিকে দেখার সুযোগ পায় না। বাচ্চাদের কল্পনা ও অনুভবের জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। টেলিভিশন ও মোবাইল ছাড়া কিছু চেনে না। এটা সত্যিই দুঃখজনক। আমি বলব, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ছবি আঁকা খুব জরুরি। সুন্দরের চর্চা করলে মন ভালো থাকে। এ সুস্থ মানসিকতাটা দরকার। একটা সুস্থ বাচ্চা বড় হয়ে একটা সুস্থ সমাজ দিতে পারে। কারণ আমাদের চারপাশে অসুস্থ জিনিসও আছে।

[সাক্ষাৎকারটি নভেরার সর্বশেষ আয়োজনে কেবল পত্রিকার প্রথম সংস্করণে প্রকাশ হয়। পাঠকদের সুবিধার্থে সাক্ষাৎকারটি সংক্ষিপ্ত আকারে পুনঃপ্রকাশ হলো]