বৈশাখ মানেই বাংলার শেকড়ে ফেরার তোড়জোড়। বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে দেখার প্রয়াস আরেকটু গভীরভাবে। সংস্কৃতিকে দেখার সেই উৎসব বিম্বিত হয় হরেক রকম রঙ আর অবয়বে। বাংলার জনজীবনের বৈশাখে একেক রকম রঙ, ডিজাইন ও মোটিফ প্রধান হয়ে ওঠে। শত বছর ধরেই বাঙালি নারীরা হলুদ, কয়লা, বেটে নেয়া চালের পেস্ট, খয়ের ইত্যাদি দিয়ে উঠানে আলপনা আঁকতেন। আলপনার প্রতিটি রেখায় ফুটে উঠত গ্রামের সরল জীবনের গল্পকথা। আধুনিক সময়ে সেই মোটিফে পরিবর্তন ঘটেছে। এখন দেশের প্রধান ফ্যাশন হাউজগুলো পোশাকে রঙ ও রেখার ঐতিহ্যবাহী কারুকার্য ফুটিয়ে তোলে। স্ক্রিনপ্রিন্ট, ব্লক ও এমব্রয়ডারির ভেতর দিয়ে বিম্বিত করে বৈশাখের আলপনা।

19

বাংলাদেশের দেয়াল কিংবা শাড়িতে নকশা তোলার সময় প্রাধান্য পায় লোকজ উপাদান। বাঘ, শেয়াল, পাখি, টেপা পুতুল তার মধ্যে অন্যতম। নগরায়ণের যুগে এখন রিকশার মোটিফ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। রঙের উজ্জ্বল ব্যবহার ও নকশায় দেশী মোটিফ এবং বাংলা লেখা চিত্রের কারণে রিকশা নিজেই একটা চলমান শিল্পকর্ম। ফলে পহেলা বৈশাখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দেয়ালচিত্র ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাকে দেখা যায় রিকশার প্রতিকৃতি। রিকশার পাশে থাকে টমটম গাড়ি। ছোটবেলায় বৈশাখী মেলা থেকে টমটম গাড়ি কিনে পাড়া চষে বেড়ানোর স্মৃতি যার নেই, তাকে দুর্ভাগা বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। সেই বাহনটি জায়গা করে নিয়েছে শিল্পীর মননে। প্রাণীর মধ্যে একটি বড় অংশজুড়ে আছে পেঁচা। আরো বিশেষ করে বললে রঙিন পেঁচা। ফ্যাশনে মোটিফ হিসেবে পেঁচা অসম্ভব শক্তিশালী। কেননা শুধু একটি রঙিন পেঁচা দিয়েই যেকোনো বাঙালিকে পহেলা বৈশাখের উৎসব বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব। মূলত স্ক্রিন প্রিন্টের মাধ্যমে বৈশাখী পেঁচাকে বিভিন্ন স্টাইলে ফুটিয়ে তোলা হয়। তবে এককালে বৈশাখী মেলার সবচেয়ে জমজমাট কোণটি থাকত টিয়াপাখির দখলে। সাধারণ মানুষের মজার ভাগ্য গণনা খেলার মূল খেলোয়াড়ই তো ছিল সে! কালের বিবর্তনে খেলাটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে; পরিণত হয়ে আছে মোটিফে। এছাড়া আছে ফুচকা-চটপটির ভ্যানের মোটিফ।

ফ্যাশন হাউজগুলো লোকজ উপাদানকে আশ্রয় ধরে তৈরি করে নিজস্ব স্টাইল। সে বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়েই নকশা করা হয়েছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাকসহ সব ধরনের পোশাক। বিভিন্ন সময়ে বৈশাখী মোটিফ হিসেবে বেছে নেয়া হয় মুখোশ, শখের হাঁড়ি, টেরাকোটা ও সরাচিত্র। এর মধ্য দিয়ে দেশ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শতভাগ বাঙালিয়ানার থিম, মোটিফ, নকশা দিয়ে করা হয় বৈশাখী পোশাক। পোশাক পরিকল্পনার অনুপ্রেরণা হিসেবে নেয়া হয় নকশিকাঁথা, টেরাকোটা, পুরনো জমিদার বাড়ি, শখের হাঁড়ি, সরাচিত্র, মুখোশ, রিকশা, লুঙ্গি-গামছা, হাতপাখা, পালকিসহ আরো কত কী! অনেকটা হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে নতুন করে পরিচয় করাতে ফ্যাশন হাউজগুলোর প্রয়াস থাকে। এভাবে গেরস্তের ঘরের দেয়াল থেকে শুরু করে ফ্যাশন হাউজের পণ্য পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে বাঙালিয়ানার শিল্পভাবনা।