উনিশ শতকের খ্যাতনামা ফরাসি চিত্রকর পল গগ্যাঁর সর্বশেষ আত্মপ্রতিকৃতিটি ১৯০৩ সালে মারকেসাস দ্বীপপুঞ্জে বসে এঁকেছিলেন বলে জানা যায়। সেটা তার জীবনের শেষ সময়। এ চিত্রকর্মে একজন অসুস্থ ও ক্লান্ত শিল্পীর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে, যেখানে গগ্যাঁ চশমা পরে আছে এবং সম্ভবত হাসপাতালের পোশাক তার পরনে।
ফরাসি গবেষক ফ্যাব্রিস ফুরমানোয়াঁর দাবি, পল গগ্যাঁর শেষ আত্মপ্রতিকৃতি আসলে একটি নকল চিত্রকর্ম। তার অনুসন্ধানের ভিত্তিতে সুইজারল্যান্ডের বাজেলের কুনস্ট মিউজিয়াম ছবিটি পরীক্ষার জন্য নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়েছে। চিত্রকর্মটি ১৯৪৫ সাল থেকে তাদের সংগ্রহে আছে।
জাদুঘরটির মুখপাত্র দ্য আর্ট নিউজপেপারকে জানিয়েছেন, চিত্রকর্মটির সত্যতা নিয়ে করা দাবি তারা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। ছবিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘গগ্যাঁর জীবনের শেষ বছরকে আমরা যেভাবে কল্পনা করি, এখানে ঠিক তা-ই ফুটে উঠেছে। আগের আত্মপ্রতিকৃতিগুলোর মতো এটি সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী নয় বরং এখানে তিনি চশমা পরা, কারণ তার চোখের দৃষ্টি দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। তাকে এখানে বৃদ্ধ, ক্লান্ত ও দুর্বল দেখাচ্ছে। এছাড়া তার পরনে রয়েছে একটি সাদা গাউন, যা একটি পিন দিয়ে আটকানো।’
এখন পর্যন্ত চিত্রকর্মটি ১৯০৩ সালের ও প্রকৃত বলেই প্রায় সব বিশেষজ্ঞ মেনে নিয়েছিলেন। যদিও এতে গগ্যাঁর কোনো স্বাক্ষর নেই।
তবে গগ্যাঁ গবেষক ফুরমানোয়াঁ এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার মতে, চিত্রকর্মটি আসলে ১৯১৬ সালে আঁকা অর্থাৎ গগ্যাঁর মৃত্যুর ১৩ বছর পর। তিনি দাবি করেন এটি এঁকেছেন গগ্যাঁর বন্ধু কাই-ডং গুয়েন ভ্যান ক্যাম (১৮৭৫-১৯২৯)। তিনি ভিয়েতনামি বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং মার্কেসাস দ্বীপপুঞ্জের হিভা ওয়া দ্বীপে থাকতেন।
ধারণা করা হয়, গগ্যাঁ তাকে চিত্রাঙ্কন শেখান। এ আত্মপ্রতিকৃতি পরে একটি সাদাকালো ছবির ভিত্তিতে আঁকা হয় বলে দাবি ফুরমানোয়াঁর। প্রমাণ হিসেবে তিনি জানান, ১৯৮৪-১৯৯০ সালের মধ্যে তাহিতির রাজধানী পাপেতেতে তিনি কাই-ডংয়ের ছেলে পিয়েরে নেপোলিয়নের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হয়। পিয়েরে তাকে বলেন, ‘বাবা বলেছেন গগ্যাঁর আত্মপ্রতিকৃতি তিনিই এঁকেছিলেন।’
তিনি আরো জানান, চিত্রকর্মে গগ্যাঁর চোখ হালকা নীল দেখানো হয়েছে। অথচ ১৮৬৮ সালে তার নৌবাহিনীর নথিতে চোখের রঙ বাদামি বলা হয়েছে। গগ্যাঁর অধিকাংশ স্বীকৃত আত্মপ্রতিকৃতিতে চোখের রঙ জলপাই-বাদামি দেখায়। এছাড়া শেষ এ আত্মপ্রতিকৃতিতে তার নাকের গঠনও মেলে না।
এদিকে গগ্যাঁ ১৯০৩ সালে আত্মপ্রতিকৃতি আঁকার মতো শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে তিনি তার বন্ধু জর্জ-ড্যানিয়েল দে মঁফ্রেদকে লেখা চিঠিতে জানান যে তিন মাস ধরে তেমনভাবে তুলি ছুঁয়েই দেখেননি। আর এ চিঠি লেখার তিন মাস পরে গগ্যাঁ চিরবিশ্রামে চলে যান। ধারণা করা হয়, তিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
বাসেলের কুনস্ট মিউজিয়ামের চিত্রকর্মটির সবচেয়ে প্রাচীন নথিভুক্ত তথ্য পাওয়া যায় ১৯২৩ সালে। ওই সময় এটি ছিল আলোকচিত্রী লুই গ্রেলের মালিকানায়। লুই ছবিটির পেছনে একটি নোট লিখেছিলেন, যা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়: ‘এ ছবি আমাকে ১৯০৫ সালে আতুয়োনা (হিভা ওয়া দ্বীপে) কাই-ডং নামের একজন ভিয়েতনামি আন্দোলনকারী দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ছবিটি তাকে সরাসরি এর মালিক দিয়েছে।’ এক বছর পর ১৯২৪ সালে চিত্রকর্মটি লন্ডনের সথবি’সের নিলামে ওঠে।
১৯২৮ সালে বাসেলের সংগ্রাহক কার্ল হফম্যান এটি কিনে পরবর্তী সময় কুনস্ট মিউজিয়ামকে দান করেন।
গবেষক ফুরমানোয়াঁর মতে, বাসেলের চিত্রকর্মটি কাই-ডং আঁকলেও গ্রেলে এটি গগ্যাঁর নামে বিক্রি করেন। কেউ কেউ মনে করেন, এটি গগ্যাঁ ও কাই-ডংয়ের যৌথ কাজ হতে পারে।
সূত্র: দি আর্ট নিউজপেপার










