যুক্তরাষ্ট্রে ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসলের বাম্পার ফলন সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে খাদ্যাশস্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। বিশ্বের শীর্ষ রফতানিকারক দেশটিতে শস্যের প্রাচুর্য দেখা গেলেও বিশ্বজুড়ে সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বেশ উদ্বেগের। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যাশস্যের এ মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহের ঘাটতি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা। খবর বিজনেস রেকর্ডার।
মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড এগ্রিকালচারাল সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ড এস্টিমেটস প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্বজুড়ে ভুট্টার বৈশ্বিক ভোগ বা চাহিদার তুলনায় উৎপাদন প্রায় তিন কোটি টন কম হতে পারে। সংস্থাটির মতে, চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের এ সম্ভাব্য ঘাটতি তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের এ পূর্বাভাস এরই মধ্যে দামে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সম্প্রতি বিশ্ববাজারে ভুট্টা, গম ও সয়াবিনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেবল আগস্টেই শিকাগোর বাজারে ভুট্টার দাম রেকর্ড ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত বছরের এ সময়ে নতুন ফসল বাজারে আসার কারণে শস্যের দাম কমতির দিকে থাকে। কিন্তু এবার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সেই সঙ্গে গম ও সয়াবিনের দামও আগের চেয়ে অনেকটা ঊর্ধ্বমুখী।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্যান্য বড় শস্য রফতানিকারক দেশগুলোতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এ কারণে এমন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। মূল রফতানিকারক দেশগুলোয় এক বছরের ব্যবধানে গম ও ভুট্টার সম্মিলিত উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। চাল ও গমের উৎপাদন কমার এ হার ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমের পর এক বছরে সবচেয়ে বেশি। শতকরা হিসাবে ২০১২-১৩ মৌসুমের ভয়াবহ খরা-পরবর্তী পরিস্থিতির পর এটিই শস্য উৎপাদনের সর্ববৃহৎ বিপর্যয়।
এ পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পণ্য পরিবহনে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের প্রভাব। ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণ সাগর দিয়ে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশ দুটিতে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্যের মজুদ তৈরি হওয়া সত্ত্বেও তা বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারছে না। ইউএসডিএর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইউক্রেনে গমের মজুদ ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি কৃষিজমির ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গত ২৫ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারের বড় রফতানিকারক দেশগুলো গমের তুলনায় ভোজ্যতেলের মূল কাঁচামাল বা তৈলবীজ উৎপাদনে বেশি জমি ব্যবহার করছে। ব্রাজিলের মতো দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণে সয়াবিনের চাষ বাড়লেও গমের আবাদযোগ্য জমি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
ফলে বৈশ্বিক চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়লেও আবাদি জমি না বাড়ায় শস্য উৎপাদন পুরোপুরি আবহাওয়া ও হেক্টরে একক ফলনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া বা বাণিজ্যি বাধা তৈরি হলেই আর কোনো বাড়তি জোগান নিশ্চিত করার সুযোগ থাকছে না। এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ গ্রাহক ও বিশ্ব খাদ্যবাজারে।










