আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রির মূল্য নির্ধারণের নিয়মে বড় পরিবর্তন এনেছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে প্রতিষ্ঠানটির জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘মারবান ফিউচার্স’ পদ্ধতির বদলে আবার ‘প্লাটস দুবাই’ সূচকে ফিরছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ও নৌপথে জ্বালানি পরিবহনে অস্থিরতার কারণে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানটি। খবর রয়টার্স ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

আবুধাবির অনশোর (স্থলভাগ) ও অফশোর (জলভাগ) সব ধরনের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেই এ নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের মতো নিজস্ব একটি জ্বালানি তেলের বাজার গড়ে তুলতে চেয়েছিল ইউএই। তবে পাঁচ বছর চেষ্টার পর সেই পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে এল কোম্পানিটি।

অ্যাডনকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মারবান, দাস, উম্মে লুলু ও আপার জাকুমসহ সব শীর্ষমানের জ্বালানি তেলের দাম নতুন নিয়মে নির্ধারিত হবে। এর পাশাপাশি জাহাজে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বোঝাই করার আগের মাসে অ্যাডনক নির্দিষ্ট একটি প্রিমিয়াম বা সংযোজিত মূল্য ঘোষণা করবে। মূলত বিশ্বজুড়ে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের কাছে বাজার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

চলতি বছরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতির কারণেই আবুধাবির নিজস্ব মারবান ফিউচার্স চুক্তির কিছু ত্রুটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ ব্যবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারিত হতো সরবরাহের প্রায় দুই মাস আগে। এতে করে ক্রেতারা জাহাজের সময়সূচি, অর্থায়ন ও পরিবহনের বিষয়গুলো গুছিয়ে নেয়ার সুযোগ পেতেন।

যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে পরিস্থিতির চিত্র বদলে যায়। মারবান জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয় ফুজাইরাহ বন্দর দিয়ে, যা হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপত্তার বিচারে মারবান তেলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝুঁকি বা ‘নিরাপত্তা প্রিমিয়াম’ যুক্ত হয়। এতে করে চাহিদা ও দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

পরবর্তীতে সাগরের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও ক্রেতাদের সেই বেশি দামেই জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছিল। এ কারণে আন্তর্জাতিক তেল ব্যবসায়ীরা চরম লোকসানের মুখে পড়েন এবং বহুজাতিক ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় অ্যাডনক পুরনো দুবাই বেঞ্চমার্কে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

পাঁচ বছর আগে জ্বালানি তেলের প্রথাগত বাজারব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে নিজস্ব আইসিই ফিউচার্স আবুধাবি (আইএফএডি) এক্সচেঞ্জ চালু করেছিল ইউএই। সে সময় এ উদ্যোগকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী দেশগুলোর জন্য বিশ্ববাজারে একটি স্বাধীন ও পরিবর্তনশীল সূচক তৈরি করা। কিন্তু সাম্প্রতিক বাজারের তীব্র ওঠানামা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মুখে সেই নীতি দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে আইসিই ফিউচার্স আবুধাবি এক্সচেঞ্জে যেসব মারবান চুক্তির সক্রিয় লেনদেন রয়েছে, সেগুলো আপাতত চালু থাকবে, বাকিগুলো স্থগিত করা হবে। বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক জ্বালানি ক্রেতা ও ট্রেডার এখন ক্যাশ-সেটেল্ড দুবাই সূচকের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

অবশ্য দাম নির্ধারণের নীতি পরিবর্তন হলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ আর্থিক ও বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতায় কোনো প্রভাব পড়বে না বলে নিশ্চিত করেছে অ্যাডনক। প্রতিষ্ঠানটির ইস্যু করা গ্লোবাল মিডিয়াম টার্ম নোট (জিএমটিএন) কিংবা সুকুক বন্ডের মতো আর্থিক সনদের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী অনশোর ও অফশোর থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে দ্য বিজনেসলাইন সংবাদ মাধ্যম জানায়, দাম নির্ধারণের কাঠামো বদলানোর পাশাপাশি এশিয়ার বাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ বজায় রাখতে স্পট টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি বাড়িয়েছে অ্যাডনক। হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প উপায় অবলম্বন করা হচ্ছে। ছোট শাটল জাহাজের মাধ্যমে ওমান সাগরে বড় জাহাজে তেল স্থানান্তর করে রফতানি চালু রাখা হয়েছে।

জুন থেকে এখন পর্যন্ত সাতটি স্পট টেন্ডারের মাধ্যমে প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে অ্যাডনক। এর মধ্যে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন (আইওসি) ২০ লাখ ব্যারেল আপার জাকুম তেল কিনেছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইউনিপেক, পেট্রোচায়না ও সিনোচেম ৬০ লাখ এবং জাপানের রিফাইনার ইদেমিৎসু কোসান ২০ লাখ ব্যারেল দাস ক্রুড কিনেছে। আঞ্চলিক সরবরাহ সংকটের কারণে মধ্যে এশীয় ক্রেতারাও কিছুটা বেশি দাম হলেও অ্যাডনকের এ বিকল্প জ্বালানি তেলের দিকে ঝুঁকছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, দুবাই বেঞ্চমার্কে ফিরে আসার মাধ্যমে অ্যাডনক এশীয় গ্রাহকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো দৃঢ় করছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের বাজার যাতে স্বাভাবিক থাকে সেটিও নিশ্চিত করছে।