মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও এল নিনোর মতো আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে পণ্যবাজারে সরবরাহ চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো ও জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ বাড়ায় জ্বালানি ও ধাতুর চাহিদাও বাড়ছে। এতে বিশ্বজুড়ে পণ্যবাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য আরো কঠিন হয়ে উঠছে। বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে হংকংভিত্তিক ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ফুতুবুল।

এইচএসবিসি বলছে, বৈশ্বিক পণ্যবাজার এখন ‘সুপার স্কুইজ’ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ সরবরাহের তুলনায় চাহিদার চাপ বাড়ছে ও পণ্যের মজুদের সুরক্ষা স্তর দ্রুত কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সামনে নতুন কোনো সরবরাহ বিঘ্ন দেখা দিলে দাম আরো বাড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালে পণ্যের গড় দাম বাড়ার পূর্বাভাসও বাড়িয়েছে এইচএসবিসি। এর আগে ব্যাংকটি গড়ে ১৬ শতাংশ দাম বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল। এখন তা বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের দাম নিয়েও আগের পূর্বাভাসের তুলনায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে।

এইচএসবিসির গ্লোবাল কমোডিটিজের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল ব্লক্সহ্যাম বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও এল নিনো বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে এআই অবকাঠামো ও জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ জ্বালানি ও ধাতুর চাহিদা বাড়াচ্ছে। ফলে পণ্যের দামে আরো ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে।’

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এসব পথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পরও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পণ্যবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হরমুজ প্রণালি এখন অনেকটাই বন্ধ। এটি কখন ও কী শর্তে পুরোপুরি চালু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দামেও বেশ ওঠানামা চলছে।

লোহিত সাগরেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর জাহাজে হামলার কারণে বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব শুধু তেলের বাজারে সীমিত নেই। বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলেও এর প্রভাব পড়ছে।

এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পণ্যের বাজারে এখনো এ সংঘাতের প্রভাব কাটেনি। ডিজেল ও শস্যের মতো পরিশোধিত পণ্য ও কৃষিপণ্যের সরবরাহে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের বাইরে সালফার, সার, অ্যালুমিনিয়াম, হিলিয়াম, উড়োজাহাজের জ্বালানি ও ন্যাফথার মতো পণ্যের সরবরাহও বিঘ্নিত হয়েছে।

ফলে এবারের পণ্যমূল্য বাড়ার ঝুঁকি শুধু জ্বালানির বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। ধাতু, রাসায়নিক ও কৃষিপণ্যেও সরবরাহ সংকট ছড়িয়ে পড়ছে। ব্লুমবার্গ কমোডিটি সূচক চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৮ শতাংশ বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে সূচকটির বৃদ্ধি ২৪ শতাংশ।

এদিকে বাজারে পণ্যের মজুদ দ্রুত কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাভাবিক সময়ে বেশি মজুদ সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন সামাল দিতে সাহায্য করে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহ ব্যাহত হলে সে মজুদও দ্রুত কমে যায়। তখন নতুন কোনো সংকট সরাসরি দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এইচএসবিসির পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ‘ককলস’-এর হিসাবেও বিশ্ব পণ্যবাজার এখন ‘সুপার বুল’ পর্যায়ে রয়েছে। ব্যাংকটির মতে, এ ধরনের বাজার পরিস্থিতি সাধারণ পণ্যচক্রের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।