বিশ্বজুড়ে কফির দাম বাড়ার কারণে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আনছেন কফিপ্রেমীরা। দাম বাড়ায় সাধারণ গুঁড়ো বা ক্যাসুলেট কফির বদলে আস্ত দানা বা ‘হোল বিন’ কিনছেন তারা। সেই সঙ্গে ঘরেই কফি বানানোর মেশিনের (বিন-টু-কাপ মেশিন) দিকে ঝুঁকছেন তারা। ইতালির বিখ্যাত কফি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান লাভাত্জার মতে, মানুষ এখন ক্যাফে বা কফি শপের মতো স্বাদ ঘরে বসেই পেতে চান। তাই তারা আগের চেয়ে কম পরিমাণে কফি কিনছেন। তবে ভালোমানের স্বাদ পেতে আস্ত দানার কফিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
পারিবারিকভাবে পরিচালিত কোম্পানির চেয়ারম্যান জুসেপ্পে লাভাত্জা এ পরিবর্তনকে বর্তমান আন্তর্জাতিক কফি বাজারের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, মানুষ এখন ঘরে বসেই কফি শপ বা ক্যাফের আসল স্বাদ পেতে চান। ফলে পরিমাণের চেয়ে মানের দিকেই এখন তাদের মনোযোগ বেশি।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেলসেনের সাম্প্রতিক বাজার পরিসংখ্যানেও এই চিত্র স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। যুক্তরাজ্যে গত মে মাস পর্যন্ত এক বছরে আস্ত কফি দানার বিক্রি পরিমাণ ২০ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। যা সার্বিক কফি বাজারের ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি। কফি বিন বিক্রির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশে। সেই সঙ্গে ঘরেই বিন থেকে কফি তৈরির স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের বিক্রিও বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে টানা চার বছর ধরে চলমান অস্থিরতার কারণে মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিরূপ আবহাওয়া ও খারাপ ফলনের কারণে ২০২৫ সালে সেরা জাতের অ্যারাবিকা ও রোবস্তা—দুই ধরনের কফির দামই রেকর্ড স্পর্শ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খুচরা বাজারে ধাপে ধাপে দাম বাড়াতে বাধ্য হয়। হিসাব অনুযায়ী, কেবল যুক্তরাজ্যেই বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত কফির দাম নতুন করে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।
সাধারণত অ্যারাবিকার দাম বেশি হলে তুলনামূলক সস্তা রোবাস্টা কফি মিশিয়ে খরচ কমানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু এবার দুটি জাতের কফির দামই একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদকদের সেই সুযোগ ছিল না। ফলে বাড়তি খরচের প্রভাব সরাসরি ক্রেতাদের ওপরই পড়েছে।
শুধু যুক্তরাজ্যে নয়, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সে কফির বিনের দাম ৩৫ শতাংশ, ইতালিতে ৩৩ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৩১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপের বৃহত্তম কফি বাজার জার্মানিতে প্রথাগত গুঁড়ো কফিকে পেছনে ফেলে এখন শীর্ষে অবস্থান করছে আস্ত কফি বিন। ক্রেতারা ঘরে বসেই ক্যাপাচিনো বা ফ্ল্যাট হোয়াইটের মতো মানসম্মত কফি তৈরি করতে আধুনিক যন্ত্র কিনছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আস্ত কফির বিক্রি ৩ দশমিক ২ শতাংশ বাড়লেও ক্যাপসুল বা প্যাকেটজাত গুঁড়ো কফির বিক্রি কমেছে।
করোনা মহামারির সময়ে ঘরবন্দী মানুষ কফি বানানোর নানা সরঞ্জাম কিনতে শুরু করেন। অফিস ও ক্যাফে খোলার পরও সেই অভ্যাস বজায় রেখেছেন গ্রাহকেরা। যদিও সম্প্রতি বাজারে কফির দর কিছুটা কমেছে, তবে বাজার এখনো বেশ অস্থিতিশীল। যুক্তরাষ্ট্রে বিন বা বীজের বিক্রি বাড়লেও গুঁড়ো কফি ও সিঙ্গেল সার্ভ কফি পডের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। লাভাত্জা জানিয়েছে, এখনই দাম কমানোর কোনো সুযোগ নেই, বরং সামনে দাম আরো বাড়তে পারে। ব্রাজিল ও ভিয়েতনামের মতো শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোতে অন্তত টানা দুটি ভালো ফলন না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে কফির সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া কঠিন।
— ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে










