বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহায়তা কমে আসায় বিদেশী অনুদাননির্ভর বাংলাদেশের এনজিও খাতও ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়েছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা ২০২৫ সালে এক বছরের ব্যবধানে ১৯ শতাংশ কমিয়েছে। একই সময়ে দেশে বিদেশী অনুদাননির্ভর প্রতি ১০টি এনজিওর মধ্যে সাতটি অর্থায়ন সংকটে পড়েছে। ‘বিদেশনির্ভরতা পেরিয়ে: বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএসের সম্মেলন কক্ষে গতকাল এক সেমিনারে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল।
চলতি বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এনজিওর ওপর গবেষণাটি পরিচালিত হয়। জলবায়ু, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ওয়াশ ও আইনি সহায়তাসহ বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের এনজিওগুলোর জন্য বৈদেশিক অনুদান এসেছিল ৯৫ কোটি ডলারের বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৬৫ কোটি ডলারে। অবশ্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক অর্থায়ন বেড়ে ৮৩ কোটি ডলারে উঠলেও নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে অনুমোদিত প্রকল্প ছিল ২ হাজার ৬১টি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১ হাজার ৬৫৪টিতে নেমে আসে।
সেমিনারে ড. কাজী ইকবাল জানান, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ ছিল ২২৪ বিলিয়ন বা ২২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। পরের বছর তা ২১৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০২৫ সালে আরো ১৯ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৭৪ বিলিয়ন ডলারে। এ হিসাবে ২০২৩ সালের তুলনায় প্রকৃত বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তা কমেছে ২৩ শতাংশ।
সেমিনারে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাহায্য সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি) বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিও কয়েক বছরের জন্য সাহায্য বাজেট কমিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে সরিয়ে নিয়েছে। ফলে এসব অর্থায়ন আগের অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বিদেশী অনুদাননির্ভর এনজিওগুলোর ওপর। এ অবস্থায় ব্যাংক খাতের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) এবং সরকারের সেবামূলক কর্মসূচিকে নতুনভাবে সাজিয়ে সেখানে এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন বক্তারা। তাদের মতে, বিদেশী অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমাতে এনজিও, সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব জোরদার করা প্রয়োজন।
সেমিনারে প্রধান অতিথিরি বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ও সার্বিক সেবা সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে এনজিওগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। তবে বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে এনজিওগুলোর কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে টেকসই অর্থায়নের পথ সুগম করতে হবে।’ এজন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে নীতি প্রণয়ন ও তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এনজিও, বেসরকারি খাত ও সরকারের মধ্যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশীয় কারুশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রসার প্রয়োজন।’ আধুনিক ডিজাইন, উপযুক্ত মূল্য সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক মানের বিপণন ও প্রচারণার মাধ্যমে এসব পণ্যকে বিশ্ববাজারে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনে সরকারের কঠোর অবস্থান তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী চারটি বাধ্যতামূলক শর্তের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘যেকোনো নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে ভ্যালু ফর মানি, বিনিয়োগের বিপরীতে সম্ভাব্য রিটার্ন, কর্মসংস্থান বা নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনা ও সুরক্ষা শর্ত অবশ্যই শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।’ সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি বিনিয়োগে জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর সংখ্যা ২ হাজার ৮০৪। অনুদান কমে আসায় এরই মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিলের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) লাইসেন্স রয়েছে ৬৪৫টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে ৫৯৬টি প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র ঋণ ও সামাজিক সেবামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে। ১ হাজার ৭১১টি এনজিও শুধু সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। আর ঋণ ও সেবা—উভয় ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে ৯২টি প্রতিষ্ঠান।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকী বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সরকার চিন্তা করছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।’
বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হকের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এসএম শাকিল আখতার; জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, বহুজাতিক ব্যাংক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি) বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান; পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের এবং ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্সহ উন্নয়ন গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন এনজিওর প্রতিনিধিরা।










