প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও বরিশাল সিটি করপোরেশনে (বিসিসি) গড়ে ওঠেনি পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ৫৮ বর্গকিলোমিটারের বরিশাল সিটির প্রতিদিনের ২০০-২৫০ টন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে কাউনিয়ার আবাসিক এলাকার উন্মুক্ত ভাগাড়ে। এসব বর্জ্য, বর্জ্য থেকে নির্গত দূষিত পানি ও প্লাস্টিক গিয়ে মিশছে পাশের খালে ও কৃষিজমিতে। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে আশপাশ এলাকায়। দুর্গন্ধ থেকে রেহাই পেতে এলাকাবাসীকে হাঁটতে হয় নাক-মুখ চেপে। বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এতে নগরীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। ভাগাড়ের আশপাশ এলাকায় বসবাস করা অনেকের দূষণজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে।

বিসিসি সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ গঠিত হয়। বর্তমানে বরিশাল সিটিতে প্রায় ছয় লাখ মানুষের বসবাস। নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে বাসাবাড়ির বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য ও প্লাস্টিক রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। সরজমিনে দেখা গেছে, নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের জিয়া নগর সাগরদী খালপাড়ের এলাকায় ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা খালে ও যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছে। একই পরিস্থিতি নগরীর বাইরের দিকের ওয়ার্ডগুলোরও।

সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে ভ্যানের মাধ্যমে তা নির্ধারিত স্থানে নেয়া হয়। পরে ট্রাক ও লোডারের সাহায্যে এসব বর্জ্য পরিবহন করে ফেলা হয় ডাম্পিং স্টেশনে। তবে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শেষ গন্তব্য কাউনিয়ার উন্মুক্ত ভাগাড়টি। দুই যুগ আগে ছয় একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় এ ডাম্পিং স্টেশন।স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গন্ধে ভাগাড়ের আশপাশ এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভাগাড়ের কাছাকাছি রয়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে শিক্ষার্থীদেরও নিয়মিত দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণের মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভাগাড়ে বর্জ্যের স্তূপ বিশাল পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। দুর্গন্ধ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এ এলাকায় চলাচলের সময় নাক চেপে রাখতে হয়। আশপাশের জমিতে আগের মতো ফসলও জন্মায় না বলে অভিযোগ তাদের। তাদের মতে, এসব বর্জ্য যথাযথভাবে পৃথক্‌করণ ও প্রক্রিয়াজাত না করে উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এটি প্রতিরোধে কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নেয়া জরুরি। নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলে তা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাতের ব্যবস্থা করা হলে এ দুর্ভোগ কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

পুরানপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. জহির বলেন, ‘উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশন চালুর পর এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। পুরানপাড়া, সরদারকান্দা, রাঢ়িমহল, শ্রীপুর কলোনি, মতাশার, কাউনিয়া হাউজিং এবং চরবাড়িয়ার সাপানিয়া ও উলালঘুনি গ্রামের অন্তত ২৫ হাজার পরিবার এ ডাম্পিং স্টেশনের কারণে বিভিন্নভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।’

আল-আমীন কাজী নামে আরেক বাসিন্দার দাবি, আবর্জনার দুর্গন্ধে টিকতে না পেরে নিজেদের বাড়ি রেখে নগরীর অন্যত্র বাসাভাড়া নিয়ে থাকছে ১৫-২০টি পরিবার। যারা থাকছেন, উৎকট গন্ধে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়।

ভাগাড়কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে ভাঙারি পণ্যের ব্যবসাও। বর্জ্য থেকে বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ ও বাছাই করে বিক্রি করেন শ্রমজীবী মানুষ। পরে সেগুলো কিনে নেন ভাঙারি ব্যবসায়ীরা। বর্জ্য সংগ্রহকারী এক ব্যক্তি জানান, এ কাজ করেই ছয় সদস্যের সংসার চালান তিনি। ভাঙারি ব্যবসায়ীরা জানান, ভাগাড় থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন সামগ্রী তারা কিনে রাখেন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি, পানি ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বরিশালের কাউনিয়া ময়লার ভাগাড়ে পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করেছি। এতে দেখা যায়, আগে মেডিকেল বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব বর্জ্য অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে একত্রে ফেলা হচ্ছে। অথচ মেডিকেল বর্জ্য ইনস্ট্যান্ট হ্যাজার্ড (তাৎক্ষণিকভাবে বিপজ্জনক)। মেডিকেলের বর্জ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া ও রোগজীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে এসব বর্জ্য পুড়িয়ে বা নিরাপদে অপসারণ করা না হলে তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কাউনিয়া ময়লার ভাগাড়ে বর্জ্য ফেলার কারণে বায়ু, পানি ও মাটিদূষণ হচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, ভাগাড়ের আশপাশের মানুষের মধ্যে অন্য এলাকার তুলনায় অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা বেশি দেখা যায়। অনেকের ক্ষেত্রে এসব স্বাস্থ্য সমস্যা সারা বছরই লেগে থাকে। এছাড়া বায়ু, মাটি ও পানিদূষণের কারণে আশপাশের কৃষিজমিতে ফসলের উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় কমে গেছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে ভাগাড়ের বর্জ্য ও দূষিত পদার্থ আশপাশের জমি, খাল ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পানিদূষণ বাড়ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।’

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘বর্জ্য উৎপাদন বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমাদের পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। বর্জ্য উৎপাদনের উৎসেই তা পৃথক করতে হবে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বাসাবাড়ির পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরি করা সম্ভব।’

ভাগাড়টি নগরীর বাইরে সরিয়ে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে বর্তমান ডাম্পিং স্টেশনটি সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান বায়োটেকের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেবে বলে জানান তিনি।

সিটি প্রশাসক আরো জানান, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও সম্পদে রূপান্তর করা গেলে দুর্গন্ধ কমে আসবে। কাউনিয়ার বর্তমান জায়গাটি বড় হলেও এটি আবাসিক এলাকা এবং আশপাশে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই ভাগাড়টি আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে নগরীর বাইরে নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য নগরীর বাইরে একটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।