বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে জাপান। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। জ্বালানি, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকিতে যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দুই দেশ। গতকাল জাপানের রাজধানী টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির শীর্ষ বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জাপান সরকার উৎসাহ দেবে। এ বিনিয়োগের লক্ষ্য হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রকল্প চিহ্নিত করা, সময়সীমা নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনার ওপর দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কার্যালয়ে পৌঁছলে তাকে স্বাগত জানান সানায়ে তাকাইচি। পরে তাকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শুরু হওয়া বৈঠক চলে প্রায় ২৫ মিনিট। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রী যৌথ সংবাদ ব্রিফিংয়ে অংশ নেন এবং যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। পরে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও সফরসঙ্গীরা।

দিনের অন্যান্য কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চিবা প্রিফেকচারের ফুতসুতে জাপানের জেরা পরিচালিত এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ইচিকাওয়ায় নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন। দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। ব্রিফিংয়ে শীর্ষ বৈঠকের আলোচনা ও ফলাফল তুলে ধরার পাশাপাশি জ্বালানি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, দক্ষ অভিবাসন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন প্রতিমন্ত্রী।

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন প্রকল্পে জাপানের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন, যেগুলো দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জাপানের বেসরকারি খাত থেকে প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুমানিক দুই লাখ কর্মসংস্থান হতে পারে। জাপান সরকারও দেশটির বেসরকারি খাতকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে।’

বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে দুই দেশের আলোচনা হয়েছে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন কোন খাতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে, কোন সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প এগিয়ে নেয়া হবে এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি কীভাবে নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের ও জাপানের বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করাও এ উদ্যোগের লক্ষ্য। দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠন ও বাণিজ্য চেম্বারগুলোকে সম্পৃক্ত করে সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করা হবে। এ লক্ষ্যে জাপান বাংলাদেশে একটি অর্থনৈতিক প্রতিনিধি দল পাঠাবে। প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা এগিয়ে নেবে।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচনা যেন শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য প্রকল্প চিহ্নিত করা এবং সরকারি ও মন্ত্রী পর্যায়ে সেগুলোর অগ্রগতি তদারকির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিনিয়োগের সুযোগগুলো দ্রুত নির্ধারণ করে দুই দেশের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’

জাপান সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৩৪০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও জানান হুমায়ুন কবির। এর মধ্যে উপজেলা গভর্ন্যান্স উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়টি রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ও জাপানের সহযোগিতার অন্যতম প্রধান কাঠামো হিসেবে যৌথ বিবৃতিতে উঠে এসেছে বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’। ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিকে সমন্বিত করে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তুলতে চায় দুই দেশ।

এ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চল। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি বন্দর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিল্পের মূল্য সংযোজনভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, আঞ্চলিক বাজারগুলোর মধ্যে সংযোগ বাড়ানো এবং বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর বিষয়টিও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ এবং শিল্পায়নে বাংলাদেশকে আরো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নেয়ার লক্ষ্য তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বানও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশে জ্বালানি অবকাঠামো, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যবস্থা, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জাপানি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়াতে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ উদ্যোগের অধীনে এটি প্রথম ইয়েন ঋণ প্রকল্প। জ্বালানি সরবরাহ, তেলের মজুদ, সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

গতকাল চিবা প্রিফেকচারের ফুতসুতে জাপানের জেরা পরিচালিত এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, বাংলাদেশে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ রয়েছে। জাপানে প্রতিষ্ঠিত একটি টার্মিনালের অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যবস্থা সরজমিনে দেখতেই এ সফরের আয়োজন করা হয়।

অবকাঠামো খাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেয়া এবং ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহন উন্নয়নে মেট্রোরেল প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়েও যৌথ বিবৃতিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে উড়াল সড়ক নির্মাণে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ ধরনের প্রকল্পে জাপানের আগ্রহ রয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও যৌথ বিবৃতিতে স্থান পেয়েছে। এ লক্ষ্যে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতার অভিপ্রায়পত্র এবং পরিবেশগত সহযোগিতা স্মারকের আওতায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশে একটি প্রযুক্তিনগর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে এ উদ্যোগের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি কর্মীদের সংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলেও সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশ আলোচনা করেছে। পাশাপাশি ছয়টি বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে উচ্চ গতির রেলপথ এবং দেশজুড়ে উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনায় জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল চিবা প্রিফেকচারের ইচিকাওয়ায় নিটসু লজিস্টিকস হাবও পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জাপানের এ লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। হাবটির ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে কী ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে, তা পরিদর্শনের সময় গুরুত্ব পেয়েছে।’

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এমন বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে চান, যেগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। লজিস্টিকস খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ ধরনের প্রকল্পে সরাসরি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটির আগ্রহ রয়েছে।’

বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের উন্নয়নে জাপানের সরকারি ও বেসরকারি খাতকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত এ চুক্তি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে মসৃণ ও টেকসই করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এলডিসি উত্তরণে সময় বাড়ানোর বাংলাদেশের অনুরোধের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি, বিগত বছরগুলোর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে সৃষ্ট অনিশ্চয়তাসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে।’

এছাড়া বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সংযোগ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে যোগ দেয়ার বাংলাদেশের অনুরোধ নিয়েও জাপানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, কর ও বিধিবিধান, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ স্থানান্তর ও লাইসেন্সপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়েও সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে।

কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও সহযোগিতা বাড়াতে চায় দুই দেশ। জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, উপকূলীয় টহল এবং বন্দর নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। জাপানের সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে একটি টহল জাহাজ ও পাঁচটি নৌযান দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

মুক্ত, অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গড়ে তোলার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান। আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বজায় রাখা, সংযোগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ হিসেবে উপজেলা গভর্ন্যান্স ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ইয়েন ঋণ, অবকাঠামোর মান উন্নয়ন, স্বচ্ছ ও ন্যায্য উন্নয়ন অর্থায়ন এবং ঋণ টেকসই রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতেও কারিগরি সহযোগিতার উদ্যোগ রয়েছে। শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দুর্যোগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, সামাজিক ও আর্থিক সহায়তা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়গুলোও দুই দেশের সহযোগিতার আওতায় রয়েছে।

জাপানে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘জাপানের সঙ্গে দক্ষ অভিবাসন নিয়ে কাজ চলছে। জাপানি ভাষায় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম শিক্ষক তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।’

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা বিষয়ে জাপানের বিশেষ দূত এবং নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। জাপান সরকার এ সংকট সমাধানে নিজেদের দিক থেকে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সভাপতিত্বের মেয়াদে রোহিঙ্গা সংকটকে উচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হিসেবে সামনে আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে জাপান ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ।’

যৌথ বিবৃতিতেও রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের পরিস্থিতির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের ওপর জোর দিয়েছে দুই দেশ।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে উত্তেজনা প্রশমন এবং হরমুজ প্রণালি দ্রুত ও সম্পূর্ণভাবে পুনরায় খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সামুদ্রিক চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নাবিক এবং বেসামরিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও যৌথ বিবৃতিতে রয়েছে। গাজা পুনর্গঠন, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এবং ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায়সংগত, স্থায়ী ও সার্বিক সমাধানের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে দুই দেশ। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং অপহৃত ব্যক্তিদের সমস্যা সমাধানের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, শীর্ষ বৈঠকে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে খোলামেলা ও আন্তরিক আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠা এবং নতুন করে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনার প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে।’

যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তিতে সম্পর্ক আরো গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তারেক রহমান।

এদিকে গতকাল নিজের এক্স পোস্টে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ঘোষণা দেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। একই সঙ্গে তিনি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে জোরালোভাবে সমর্থনের কথাও জানিয়েছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধে বিশ্বাসী বন্ধু হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানাতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। গণতান্ত্রিক সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত তারেক রহমানের সরকারকে দেশ গড়ার প্রচেষ্টায় জাপান জোরালোভাবে সমর্থন করবে।’