টম ক্রুজকে এমন চরিত্রে খুব বেশি দেখা যায় না। ষাট পেরুনো টমকে এখনো সুদর্শন অ্যাকশন হিরো চরিত্রেই দেখা যায়। ডিগারে তিনি হাজির হয়েছেন ভিন্ন ধারার এক চরিত্রে। তিনি কোনো আদর্শবাদী নায়ক নন, গুপ্তচরও নন, পৃথিবী বাঁচানোর মিশনে ছুটে চলা অ্যাকশন হিরোও নন। তিনি তেল সাম্রাজ্যের সম্রাট। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষদের একজন মনে করেন। এ চরিত্রটিকে ক্রুজ যেভাবে ধারণ করেছেন, সেটিই ডিগারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে সমস্যাজনক দিক। মুক্তির আগে সিনেমাটি নিয়ে সমালোচকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে।
সিনেমার রিভিউ দিতে গিয়ে ভ্যারাইটিতে ওয়েন গ্লেইবার-ম্যান লেখেন, ‘ভারী মেকআপে বদলে যাওয়া মুখ, পাতলা এলোমেলো সাদা চুল এবং শরীরী ভাষায় বয়স ও ঔদ্ধত্যের ছাপ নিয়ে পর্দায় হাজির হন ক্রুজ। প্রতিটি সংলাপ তিনি প্রায় চিৎকার করে, বক্তৃতার ভঙ্গিতে বলেন। চোখেমুখে থাকে আত্মবিশ্বাস, অবজ্ঞা এবং এক ধরনের নিষ্ঠুর আনন্দ। ফলে ডিগার ধীরে ধীরে বাস্তব কোনো মানুষ না থেকে হয়ে ওঠে আমেরিকান পুঁজিবাদী অহমিকার এক বিশাল ব্যঙ্গচিত্র।’
ওয়েনের মতে, সিনেমায় ক্রুজের অভিনয় মনে করিয়ে দেয় ট্রপিক থান্ডারের লেস গ্রসম্যানকে। সেখানে স্টুডিও নির্বাহীর ভূমিকায় ক্রুজ যে অতিরঞ্জিত, হাস্যকর ও প্রায় ক্যারিকেচারধর্মী অভিনয় করেছিলেন, ডিগারে তারই অনেকটা বিস্তৃত সংস্করণ দেখা যায়। পার্থক্য হলো, লেস গ্রসম্যান ছিল নিছক বিনোদনের চরিত্র; ডিগারের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে জলবায়ু সংকট, পরিবেশ ধ্বংস এবং মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের মতো গুরুতর বিষয়।
সেখানেই সমস্যা শুরু। ওয়েন লেখেন, ‘ডিগার আসলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এক ধরনের ব্ল্যাক কমেডি বানাতে চায়। বরফ গলে যাচ্ছে, মিথেন ছড়িয়ে পড়ছে, একটি বিশাল বরফস্তর ইউরোপের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী যেন মহাবিপর্যয়ের মুখে। কিন্তু ছবির ব্যঙ্গ যতটা তীক্ষ্ণ হওয়ার কথা, ততটা হয়ে ওঠে না, বরং ইনারিতু ছবিটিকে এতটাই ভারী করে তোলেন যে এর রসবোধ অনেক সময় বক্তব্যের নিচে চাপা পড়ে যায়।’
সমালোচক টেসা স্মিথ লেখেন, ‘প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসার পরও যা নিয়ে দর্শক অনেকক্ষণ সিনেমাটি ভাববেন। ডিগার নিঃসন্দেহে দর্শকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করবে। তবে টম ক্রুজের অভিনয় যে দুর্দান্ত, এ বিষয়ে সবাই একমত হবেন। রিজ আহমেদও অসাধারণ অভিনয় করেছেন। সিনেমাটি অদ্ভুত এবং একেবারেই আপনার প্রত্যাশার মতো নয়।’
ওয়েনের মতে, ডিগার যেন একই সঙ্গে ড. স্ট্রেঞ্জলাভ, নেটওয়ার্ক এবং ডোন্ট লুক আপ হতে চায়। কিন্তু ওই সিনেমাগুলোর ব্যঙ্গের অন্যতম শক্তি ছিল সূক্ষ্মতা। টম ক্রুজের অভিনয় নিয়ে তিনি লেখেন, ‘তিনি সংযত নন, সূক্ষ্ম নন। ইচ্ছাকৃতভাবেই অতিরঞ্জিত। ডিগারের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, সংলাপ বলার ধরন এবং হাসি চরিত্রটির বিকৃত আত্মবিশ্বাসকে বড় করে তোলে। এ অভিনয় আলাদা করে দেখলে বেশ উপভোগ্য। ক্রুজ যে নিজের তারকা ইমেজকে এমনভাবে ভেঙে একটি হাস্যকর, বিকট চরিত্রে নিজেকে পরিণত করতে রাজি হয়েছেন, সেটি প্রশংসনীয়।’
পিটার হাওয়েলের মতে, ‘ইনারিতু দর্শককে নিজের উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বন্দ্বে রাখতে ভালোবাসেন। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। টম ক্রুজের চরিত্রটি নিয়েও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অনেক কিছু। শিরোনামের সেই চরিত্রটি এক বেপরোয়া ও দায়ী টেক্সাসের তেলসম্রাট—চুলে তেলের চকচকে ভাব, শরীরে মধ্যবয়সী বাবাদের স্বাভাবিক ভুঁড়ি, আর আত্মবিশ্বাসে কোনো কমতি নেই।’
তবে ওয়েনের মতে, ডিগারের সবচেয়ে বড় খামতি তাই বিষয় নির্বাচনে নয়, বরং বিষয়টি উপস্থাপনের ভারে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক সিনেমা বানাতে গিয়ে ইনারিতু ব্যঙ্গের চেয়ে বক্তব্যকে বড় করে ফেলেছেন। বিপুল বাজেট, বিশাল সেট, ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের দৃশ্য সবকিছুই সিনেমার গুরুত্ব বোঝাতে ব্যস্ত। এমনকি টম ক্রুজের জন্য ডিগার যতটা উপভোগ্য অভিনয়ের ক্ষেত্র, সিনেমা হিসেবে ততটাই অসম্পূর্ণ।
ভ্যারাইটি, নিউইয়র্ক পোস্ট ও দ্য সানডে গার্ডিয়ান অবলম্বনে আসরার আবেদিন










