বিশ শতকের সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেখানে ছিল নানা রাজনৈতিক সমীকরণ। সিনেমাও তার বাইরে ছিল না। নিছক বিনোদন নয়, সে সময় সিনেমা ছিল রাষ্ট্রের আদর্শ নির্মাণের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। কোন গল্প বলা যাবে, কোন আবেগ দেখানো যাবে, কোন উৎসব জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে, সবই নির্ধারিত হতো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এই বাস্তবতায় খুব নীরবে সন্দেহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল ‘ক্রিসমাস’।

১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে গঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্রটি ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিল। পরবর্তীকালে জোসেফ স্তালিনের শাসনামলে এই নীতি আরও কঠোর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা হয়। আর সংস্কৃতির ক্ষেত্রগুলো—বিশেষ করে সিনেমা—রাষ্ট্রের আদর্শিক তত্ত্বাবধানে চলে আসে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শুরু হয় ‘কোল্ড ওয়ার’। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি সোভিয়েতের সতর্কতা আরও বেড়ে যায়। ক্রিসমাস-ভিত্তিক পশ্চিমা চলচ্চিত্রগুলো তখন কেবল উৎসবের গল্প ছিল না, সেগুলো সোভিয়েত রাষ্ট্রের চোখে হয়ে উঠেছিল আদর্শিক ‘সফট পাওয়ার’। ফলে এসব সিনেমা প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ না হলেও সোভিয়েত প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের অনুমতি পায়নি।

MV5BMjQxNTM4Mjg1NV5BMl5BanBnXkFtZTgwNDYyNzM4NjM@._V1_

ইট্‌স আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ সিনেমার দৃশ্য। ছবি: আইএমডিবি

এই অনুপস্থিতির পেছনে ধর্মীয় কারণ যতটা ছিল, রাজনৈতিক কারণ ছিল তার চেয়েও গভীর। পশ্চিমা ক্রিসমাস নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলো ব্যক্তিমানুষের গুরুত্ব, ব্যক্তিগত নৈতিক সিদ্ধান্ত এবং পারিবারিক আবেগকে কেন্দ্র করে গল্প বলত, যা সোভিয়েত সমষ্টিকেন্দ্রিক আদর্শের সঙ্গে সূক্ষ্ম দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিল। থিয়েটারে নিষিদ্ধ হয়েছিল তাই বেশকিছু সিনেমা।

ইট্‌স আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ (১৯৪৬)

ফ্র্যাঙ্ক কাপ্রা পরিচালিত সিনেমা ‘ইট্‌স আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ’ (১৯৪৬)। সিনেমাটি সোভিয়েত দর্শকের কাছে অদৃশ্যই থেকে যায়। জেমস স্টুয়ার্ট অভিনীত এই চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছিল এক সাধারণ মানুষের জীবন সমগ্র সমাজের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই ভাবনাটি সোভিয়েত আদর্শের সঙ্গে মেলেনি। সিনেমাটির অলৌকিক উপাদান নয়, বরং তার আবেগী সিদ্ধান্ত, একজন ব্যক্তির জীবনের অন্তর্নিহিত মূল্যই ছিল প্রকৃত আপত্তির বিষয়।

মিরাকল অন থার্টি ফোরথ স্ট্রিট (১৯৪৭)

মিরাকল অন থার্টি ফোরথ স্ট্রিট (১৯৪৭) পরিচালনা করেন জর্জ সিটন। সিনেমাটি সোভিয়েত পর্দায় জায়গা পায়নি। কল্পনা, উদারতা ও শিশুমনের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই গল্প, তার সঙ্গে যুক্ত ভোগবাদী আমেরিকান বাস্তবতা। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের চোখে সিনেমাটি ছিল সন্দেহজনক। এখানে সান্তা ক্লজের উপস্থিতি নয়, বরং আনন্দের অরাজনৈতিক রূপটাই ছিল তাদের কাছে অস্বস্তিকর।

হোয়াইট ক্রিসমাস (১৯৫৪)

স্তালিনের শাসনের শেষভাগে (১৯৫০-এর দশকে) সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া হয়। এ সময়ের সিনেমা মাইকেল কার্টিজ পরিচালিত হোয়াইট ক্রিসমাস (১৯৫৪)। সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন বিং ক্রসবী। সিনেমাটি কার্যত সোভিয়েত দর্শকের নাগালের বাইরে থেকেই যায়। এই ধরনের চলচ্চিত্রে উৎসব ছিল গান, নস্টালজিয়া ও বিনোদনের সমন্বয়ে এক আবেগী প্রদর্শনী, যা রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ছিল অপ্রয়োজনীয় বিলাস।

তবে এখানেই শেষ নয়। সোভিয়েত সিনেমার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, তা উৎসবকে মুছে ফেলেনি, বরং রূপান্তরিত করেছে।

ক্রিসমাসের পরিবর্তে সোভিয়েত রাষ্ট্র নববর্ষকে প্রতিষ্ঠা করে বছরের প্রধান উৎসব হিসেবে। ক্রিসমাস ট্রি হয়ে যায় নববর্ষের গাছ। ধর্মীয় প্রতীকগুলো সরে যায়, আর পশ্চিমা সান্তা ক্লজের জায়গায় আসে একটি লোকজ, ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র দেদ মরোজ (গ্র্যান্ডফাদার ফ্রস্ট)।

এই পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটে সিনেমাতেও।

1735552923_864f63fa2e7b1def5ce0_1220x851_c0_mr1_q90

‘দ্য আইরনি অব ফেট, অর এনজয় ইয়োর বাথ’-এর দৃশ্য। ছবি: আইএমডিবি

১৯৭৫ সালে, লিওনিদ ব্রেজনেভের শাসনামলে এলদার রিয়াজানোভ নির্মাণ করেন ‘দ্য আইরনি অব ফেট, অর এনজয় ইয়োর বাথ’। আজও রাশিয়া ও সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে নববর্ষের প্রাক্কালে সিনেমাটি প্রদর্শন হয়। প্রেম, নতুন শুরুর গল্প বলে এ সিনেমা। ঠিক একটি ক্রিসমাসের সিনেমার মতো তবে ক্রিসমাসের কোন চিহ্ন নেই সেখানে।

একই রকমভাবে ‘কার্নিভাল নাইট’ (১৯৫৬) তারুণ্য, সংগীত ও আনন্দকে নববর্ষের আবহে তুলে ধরে। এখানে উৎসব আছে, কিন্তু ধর্ম নেই। উষ্ণতা আছে, কিন্তু কোনো অলৌকিকতার দাবি নেই।

MV5BNDUzOTk1ODItNGRlMC00ZTRjLTk1ZjktNzEzZGJjMjkzZGVlXkEyXkFqcGc@._V1_FMjpg_UX1000_

কার্নিভাল নাইটের দৃশ্য। ছবি: আইএমডিবি

‘কোল্ড ওয়ার’ এর সময়ে দাঁড়িয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্র এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক সমীকরণ তৈরি করেছিল। ক্রিসমাস শব্দটি অনুপস্থিত ছিল, কিন্তু তার আবেগ কাঠামো রয়ে গিয়েছিল নতুন নামে, নতুন ভাষায়। পশ্চিমা সিনেমা যেখানে বলেছিল অলৌকিকতার কথা, সোভিয়েত সিনেমা সেখানে দেখিয়েছে নতুন সূচনার ইঙ্গিত।