শিল্প কখনো শুধু রঙ বা রেখা নয়—এটি মানুষের অভিজ্ঞতাকে দেখার আরেকটি জানালা, নগরের দ্রুতগামী জীবনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলোর নীরব পুনরুদ্ধার। এমনই এক উপলব্ধির আলোয় ঢাকার শিল্পপ্রীতি আবারো জেগে উঠল ভূমি গ্যালারির বৈশিষ্ট্যময় প্রদর্শনী ‘রেজিলেন্ট বিকামিং’-এর আনুষ্ঠানিক পর্দা তোলার মাধ্যমে। গতকাল রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে উত্তরা সেন্টার পয়েন্টে এ আয়োজন রূপ নেয় সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
ভূমি গ্যালারির যাত্রা শুরু হয় ২০২৪ সালে। মাত্র এক বছরে তারা আয়োজন করেছে ২২টির মতো প্রদর্শনী। সে যাত্রার আরেকটি সংযোজন এ প্রদর্শনী।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ছিল ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ, সত্য সুন্দর’ গানের তালে ‘বহর নৃত্যদল’-এর মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী। তিনি বলেন, ‘জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে কনিষ্ঠতম শিল্পীদের ছবি ও স্কাল্পচার আছে এখানে। আমরা ছবি আঁকি, দেখানোর জন্যই। “ভূমি” বৃহৎ পরিসরে সেই ব্যবস্থাটি করে দিয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের চিত্রকর্মগুলো পৌঁছে দেয়ার এ আয়োজন চমৎকার।’
বিশেষ অতিথি মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এয়ারপোর্টের পাশে হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখানে আসবে। এটা একটা অন্য রকম প্লাটফর্ম। এমন কমার্শিয়াল স্পেসে গ্যালারি করাটা বাংলাদেশে নতুন। আশা করি এটা চলমান থাকবে। এমন পদক্ষেপে সাধারণ মানুষ শিল্পের আরো কাছাকাছি আসবে।’

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও হেড অব করপোরেট এনামুল হক বলেন, ‘ব্যাংকার হিসেবে বলতে পারি মানি, কালচার, ইকোনমিকস একটি অন্যটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের পেইন্টিং শুধু বাংলাদেশের না, এটার ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট আছে। হংকং থেকে শুরু করে অনেক দেশ আমি ঘুরে দেখেছি, বাংলাদেশের পেইন্টিং কত দামে মানুষ কিনছে। তাই এটাকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।’
২১ দিনব্যাপী এ বিশেষ প্রদর্শনী ২১ নভেম্বর থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, শুধু সোমবার সেন্টার পয়েন্টের সাপ্তাহিক ছুটির দিন প্রদর্শনী বন্ধ।
প্রদর্শনীতে একসঙ্গে উপস্থাপিত রয়েছে বাংলাদেশের ১১৪ জন কিংবদন্তি, মধ্য প্রজন্মের এবং তরুণ শিল্পীর অনন্য সব সৃষ্টি। এখানে রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এসএম সুলতান, কাইয়ুম চৌধুরী ও মোহাম্মদ কিবরিয়ার চিরস্মরণীয় সৃষ্টি। পাশাপাশি রয়েছে সমসাময়িক শিল্পচর্চার উজ্জ্বল নাম রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, হাশেম খান, আব্দুস শাকুর শাহ, বীরেন সোম, অলকেশ ঘোষ, স্বপন চৌধুরী, নাইমা হক, আহমেদ শামসুদ্দোহা, শেখ আফজাল, মোহাম্মদ ইউনুস, জামাল আহমেদ, কনকচাঁপা চাকমা, মোহাম্মদ ইকবাল, মাকসুদা ইকবাল নিপাসহ আরো বহু প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম।

প্রদর্শনীর প্রতিটি অংশে রয়েছে অসাধারণ বৈচিত্র্য—চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, মাটির শিল্প, মিক্সড মিডিয়া এবং নানা পরীক্ষাধর্মী শিল্পভাষার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল।
সব বয়স, পেশা এবং বিদেশী অতিথিতে পরিপূর্ণ ছিল প্রদর্শনী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে পারফর্মিং আর্ট ও লাইভ পেইন্টিং দর্শকদের সামনে শিল্পের আবেগকে আরো ঘন, আরো স্পর্শযোগ্য করে তোলে।
অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, ঢাকার মতো ব্যস্ত মহানগরে একটি মেগা শপিং মলের ভেতরে এমন সমৃদ্ধ শিল্প প্রদর্শনী নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। সাধারণ মানুষ যারা সাধারণত গ্যালারির পথে হাঁটে না—তাদের সামনে শিল্পকে এনে দেয়ার এক দারুণ প্রয়াস এ আয়োজন।










