পুরো পৃথিবী যুদ্ধ, হানাহানিতে ব্যস্ত। পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে প্রতিদিন রক্ত ঝরছে মানুষের। আবার একই পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও প্রতিনিয়ত হচ্ছে প্রাণের উৎসব, হাসি-আনন্দের নৃত্য। কিন্তু মৃত্যু ও নৃত্যের মধ্যে কে কাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে? এ প্রশ্ন কিংবা এর উত্তর দুটোই যেন কাগজের ওপর কলমের আঁকিবুঁকিতে তুলে ধরেছেন শিল্পী মোবাশ্বির আলম মজুমদার। নিজের চিত্রকর্মে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন মৃত্যু ও নৃত্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা অন্তহীন যোগাযোগ।

মৃত্যু ও জীবনের ছন্দকে রেখার আঁকিবুঁকিতে বিমূর্ত করে তুলেছেন শিল্পী। প্রতিটি চিত্রকর্মে শিল্পীর মস্তিষ্ক ফুঁড়ে বের হয়ে আসা রেখা আর কাটাকুটির নান্দনিক রূপ মোহাচ্ছন্ন করে রাখে দর্শককে। এক স্তরের ভাবনার দেয়াল ভাঙতে না ভাঙতেই সামনে এসে দাঁড়ায় আরেক দেয়াল। এক, দুই, তিন... করে দেয়াল ভেঙে ভেঙে দর্শক যেখানটায় পৌঁছয় সেখানে সব রঙ, সব নাচ রাঙিয়ে দিয়ে যায় মৃত্যুকে। ছান্দসিক সে মৃত্যু যতটা না শারীরিক, তার চেয়ে অনেক বেশি আত্মিক।

শিল্পী মোবাশ্বির আলমের ক্যানভাসে মৃত্যুর পাশাপাশি ফুটে উঠেছে জীবন। নৃত্যের তালে তালে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঘুরে বেড়িয়েছে ‘অন্তঃসত্ত্বা আত্মার আগমনী বার্তা’। সেই সঙ্গে রেখার আঁকিবুঁকিতে পাওয়া যায় অজস্র তৃণের সমাহার। সে তৃণরাশি থেকে হুটহাট বের হয়ে আসে একটি হাত, একটি পা কিংবা সতর্ক দৃষ্টির চোখ। শিল্পী মোবাশ্বির আলম একে এক শব্দে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘আড়াল’ হিসেবে। শিল্পীর ভাষায়, ক্যানভাসে অজস্র পাতা-তৃণ-বৃক্ষের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাসি-আনন্দ-বেদনা-মৃত্যু—জীবনের নিগূঢ়-জটিল সত্য।

‘ও মৃত্যু ও নৃত্যের’ সবক’টি চিত্রকর্মের অন্যতম একটি বিশেষত্ব হলো, সিরিজের প্রতিটি চিত্রকর্ম সবসময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক। এ কথা বলছিলেন শিল্পী মোবাশ্বির আলমের বন্ধু, বাতিঘরের প্রধান নির্বাহী জাফর আহমদ রাশেদ। তিনি বলেন, ‘সমসাময়িক রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা স্বাধীনতা উত্তরোত্তর বাংলাদেশের সময়কালের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ—চাইলে একই ছবিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব দু্ই সময়ের রূপক হিসেবেই।

জীবনের অভিজ্ঞতা, আনন্দ-বেদনা উদ্দাম নৃত্য করেছে শিল্পী মোবাশ্বির আলম মজুমদারের ক্যানভাসে। প্রতিটি চিত্রকর্মে রয়েছে অসংখ্য স্তর। কারণ যেকোনো চিত্রকর্মই একজন শিল্পীর মনোজগতের নানা দ্বন্দ্ব, বাস্তব কিংবা পরাবাস্তবের এক অমীমাংসিত খেলা। তাই ‘ও মৃত্যু ও নৃত্য’র ছবিগুলো ক্রমানুসারে দেখলে অনুভব করা যায়, ধারাবাহিকভাবে ক্যানভাসগুলোয় বেড়েছে সাবজেক্ট। আবার সে সাবজেক্টগুলো যেন নেচে বেড়াচ্ছে শূন্যে, ঠিক যেমন করে শূন্যে নেচে বেড়ায় প্রজাপতি, পাখি, বাতাস কিংবা পত্র-পল্লব। জীবনের সব রঙকে শিল্পী চিত্রিত করেছেন মহাকালের গভীর অন্তর্গত ভাষায়।

‘‌ও মৃত্যু ও নৃত্য’ প্রদর্শনীটি শিল্পী মোবাশ্বির আলম মজুমদারের বন্ধুদের উৎসাহে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বন্ধুদের উৎসাহেই ২৯ বছর পর চিত্রপ্রদর্শনী করছেন শিল্পী। জীবন-মৃত্যুর অমীমাংসিত সংযোগের পাশাপাশি গ্যালারি পাড়ায় এ প্রদর্শনী তাই হয়ে উঠেছে বন্ধুত্বের প্রতীকও। প্রদর্শনীটির আয়োজক ছায়াসভা। ছায়াসভা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে শিল্পী ও তার বন্ধু রাশেদ বলেন, ‘ছায়াসভার কোনো অফিস নেই। নেই কোনো সাইনবোর্ড। ছায়াসভার সব সদস্য একে অন্যের বন্ধু, ছায়ার মতো।’

গত মঙ্গলবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে শুরু হয়েছে শিল্পী মোবাশ্বির আলম মজুমদারের একক চিত্র প্রদর্শনী ‘ও মৃত্যু ও নৃত্য’। চলবে আজ রাত ৮টা পর্যন্ত।