শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘দেবদাস’। উপন্যাসটি বহুবার চলচ্চিত্রে রূপান্তর হয়েছে। প্রত্যেক পরিচালক তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে দেবদাসকে ব্যাখ্যা করেছেন। বিমল রায়ের ১৯৫৫ সালের সংস্করণ ছিল ক্ল্যাসিক ধারার। এর আগে ১৯৩৫ সালে দেবদাস নির্মাণ করেছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া। অনুরাগ কাশ্যপের ‘দেব-ডি’ (২০০৯) ছিল দেবদাসের মূল ধারা থেকে ভিন্ন আধুনিক পুনর্ব্যাখ্যা। বাংলাদেশেও ১৯৮২ ও ২০১৩ সালে দুবার চাষী নজরুল ইসলাম দেবদাস নির্মাণ করেন। ১৯৮২ সালে দেবের চরিত্রে দেখা যায় বুলবুল আহমেদকে এবং ২০১৩ সালে দেখা যায় সাকিব খানকে। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৯ সালে দেবদাস নির্মাণ হয়। কেন্দ্রীয় চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ২০০২ সালে শক্তি সামন্তের নির্মাণে দেবদাস হয়েছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। একই বছর সঞ্জয় লীলা বানসালির পরিচালনায় দেবদাস হয়েছিলেন শাহরুখ খান। সিনেমা মুক্তির পর দুনিয়াজুড়ে দর্শকের চোখে তিনিই যেন দেবদাসের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠলেন।

সঞ্জয় লীলা বানসালি দেবদাসকে রূপ দেন এক অপেরাটিক, দৃষ্টিনন্দন মহাকাব্যে। সিনেমাটি বিস্তৃত সেট, বিলাসবহুল পোশাক, রঙের নানাবিধ ব্যবহার ও নৃত্যকলা, সংগীত ও আবেগের সংমিশ্রণে এমনভাবে তৈরি হয়েছে যা দেবদাস মুখার্জি নামের চরিত্রটির অন্তর্দাহকে সেলুলয়েডে উপস্থাপন করলেও দর্শক তা নিজের মধ্যে অনুভব করেন। বিমল রায়ের ১৯৫৫ সালের সংস্করণটি ছিল সংযত আবেগে নির্মিত। কিন্তু বানসালি সেখানে ছাড়িয়ে গেছেন সব সীমারেখা। তিনি উপন্যাসটিকে এক প্যানোরামিক মেলোড্রামা বানিয়েছেন বৈশ্বিক দর্শকের জন্য।

এ বিশাল পরিসর শাহরুখ খানের জন্য তৈরি করেছিল এমন মঞ্চ, যেখানে তিনি সূক্ষ্ম দৃষ্টি ও ক্ষীণ আবেগের বিনিময়েও দর্শককে নাড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। বানসালির বিস্তৃত পরিসরের এ নির্মাণে শাহরুখের ছোট ছোট অভিনয় চয়নের মুহূর্তগুলোও গভীরভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, কখনো নিঃশব্দ দৃষ্টিতে, কখনো নীরব কান্নায়।

পঞ্চাশের দশকে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য অন্য রকম এক ভালোবাসার প্রতীক ছিলেন দিলীপ কুমার ও সুচিত্রা সেন। দুই কিংবদন্তি অভিনীত দেবদাস সে সময় ৫০ লাখ রুপিতে নির্মিত। আয় করেছিল প্রায় ১ কোটি রুপি। ফলে একটি মধ্যম আয়ের সিনেমা হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। তবে বিমল রায়ের এ সিনেমা ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পেয়েছে তার নির্মাণ ও দিলীপ-সুচিত্রার অভিনয়ের জন্য। অন্যদিকে বাংলায় সেই ভূমি, যেখানে এ গল্পের জন্ম। ১৯৭৯ সালে দিলীপ রায় নির্মাণ করেন দেবদাস। মূল চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দর্শক মোটামুটি পছন্দ করলেও সিনেমাটি তেমন আর্থিক সাফল্য পায়নি। অন্যদিকে প্রমথেশ বড়ুয়ার সিনেমাটি বহু আগে নির্মিত। সেকালে দারুণ জনপ্রিয় হলেও একালে সিনেমাটি দর্শকের কাছে প্রায় অপরিচিত। বাংলাদেশ নির্মিত দুই দেবদাস মুক্তির পর প্রশংসিত হলেও এখন তা নিয়ে আলোচনা হয় না। অর্থাৎ দর্শকের মনে টিকে থাকেনি।

অন্যদিকে শাহরুখ খানের দেবদাস ছিল ২০০২ সালের অন্যতম সর্বাধিক আয় করা ভারতীয় চলচ্চিত্র। শুধু ভারতেই ব্লকবাস্টার নয়, ছিল বিশ্বজয়ী। প্রায় ১০০ কোটি রুপি বিশ্বব্যাপী আয়, যুক্তরাজ্যে ব্যাপক সাফল্য, কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শনী এবং ভারতের অস্কার এন্ট্রি। ১০টি ফিল্মফেয়ার, একাধিক জাতীয় পুরস্কারও পায় সিনেমাটি। শাহরুখ শুধু দেবদাস চরিত্রে অভিনয়ই করেননি, তিনি যেন স্বয়ং তালসোনাপুরের নারায়ণ মুখার্জির ছেলে দেবদাস মুখার্জি হয়ে উঠেছিলেন।

সমাজের উচ্চ ও নিম্নশ্রেণীর বিভেদকে তুলে ধরা একটি উপন্যাসকে এক প্রেমের আখ্যানে পরিণত করেছে শাহরুখের অভিনয়ের আবেদন। এ সাফল্য দেবদাসকে কেবল একটি রিমেক নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক ঘটনার মর্যাদা দেয় এবং সে ঘটনায় শাহরুখ খানের স্টারডম দর্শক টানার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু শাহরুখ তার অভিনয় দিয়ে নিজের স্টারডমকেই ছাপিয়ে গিয়েছিলেন।

শাহরুখের দেবদাস সহজেই তার আভিজাত্যের ভারে নুয়ে পড়তে পারত। কিন্তু তার অভিনয় তা হতে দেয়নি। সমালোচকরা একে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স বলে বর্ণনা করেছেন। চলচ্চিত্রের সবচেয়ে নীরব, আবেগঘন দৃশ্যগুলোয় শাহরুখ খানের চোখ, মুখের রেখা, অস্ফুট বাচনভঙ্গি, এ ক্ষুদ্র সংকেতগুলো ফুটিয়ে তুলেছে চরিত্রের ক্ষত। মানুষ দেবদাসের চরিত্রকে বাস্তবিক ভাবতে বাধ্য হয়েছে। দেবদাসের সঙ্গে হেসেছে, দেবদাসের মৃত্যুতে কেঁদেছে। বানসালির বিশাল ক্যানভাসে এ মাইক্রো-এক্সপ্রেশনগুলো দর্শককে অন্তরঙ্গ অনুভূতিতে ছুঁয়ে গেছে।

অভিনয়ে দেবদাস চরিত্রের পতন ও আত্মবিনাশের ধীরে ধীরে রূপান্তর ফুটিয়ে তুলেছেন শাহরুখ। তার দেহভঙ্গি, টলমল পদক্ষেপ, কণ্ঠের ভাঙন, সব মিলিয়ে উপন্যাসের এক দুর্বল চরিত্রকে তিনি রূপ দিয়েছেন আধুনিক ট্র্যাজিক নায়কে। তিনি সহজেই স্নিগ্ধ রোমান্টিক সংলাপ থেকে বিস্ফোরণময় আবেগে যেতে পেরেছেন, তবু চরিত্রের সংগতি বজায় রেখেছেন। পারু চরিত্রে ঐশ্বরিয়া ও চন্দ্রমুখী চরিত্রে মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে একাধিক দৃশ্যে এর প্রমাণ মেলে। দর্শক দেবদাসের ভুল বোঝে, তবুও তার জন্য ব্যথা অনুভব করে। এটাই শাহরুখের অভিনয়ের জাদু।

বানসালির দেবদাস ছিল অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ। কিন্তু শাহরুখ খানের অভিনয়ই সেটিকে মানবিক ভিত্তি দিয়েছে। দেবদাস চরিত্রে দিলীপ কুমার ছিলেন ঘরোয়া, সংযত ও বাস্তববাদী। কিন্তু শাহরুখ খান ছিলেন রূপকথার মতো মহাকাব্যিক। একজন রোমান্টিক আইকন ও আবেগপ্রবণ শিল্পী হিসেবে শাহরুখ খানের ব্যক্তিত্ব তাকে এ ভূমিকায় গ্রহণযোগ্য করেছে। ফলে দর্শক তাকে একদিকে অসহায় প্রেমিক হিসেবে দেখে, আবার অন্যদিকে এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজিক প্রতীকে পরিণত দেখতে পায়।

অনেক চলচ্চিত্রপ্রেমী এখনো বিমল রায়ের দেবদাসকে শ্রদ্ধা করে সংযত মানবিকতার জন্য; আবার কেউ অনুরাগ কাশ্যপের ‘দেব-ডি’র আধুনিক বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গিকে মূল্যায়ন করে। বানসালির চলচ্চিত্রকে অতিরিক্ত অলংকারময় বলা হয়, কিন্তু শাহরুখ খানের সেই আবেদন, অনুভূতির দোলাচালে দর্শক বানসালির দেবদাসকে ভুলতে পারে না। শাহরুখ খান আভিজাত্যের মধ্যে আনেন মাইক্রো এক্সপ্রেশন, দেহভাষার পতন, কণ্ঠের কম্পন এবং তারকা খ্যাতিকে ভঙ্গুর মানবিকতায় রূপান্তর করার এক দুর্লভ ক্ষমতা।

এ কারণেই শাহরুখ খানের দেবদাস শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং একুশ শতকের অপেরাটিক ক্ল্যাসিক, যেখানে বানসালির দৃষ্টিকোণ ও শাহরুখ খানের অনন্য অভিনয় মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক অনবদ্য জাদু। বহু চলচ্চিত্র সমালোচক, ইতিহাসবিদ ও দর্শকের মতে, এটাই আধুনিক যুগের চূড়ান্ত দেবদাস এবং শাহরুখ খানই তার হৃদয়।