এক সপ্তাহ হলো মারা গেছেন জুবিন গর্গ। কিন্তু শোক এখনো থামছে না। জুবিনকে স্মরণ করছেন তার ভক্তরা। জুবিনকে স্মরণ করছেন তার এলাকার মানুষ। বিষয়টি একটু হলেও চমক লাগার মতো। কেননা জুবিন দীর্ঘ সময় মূলধারার সংগীতে ছিলেন না। কিন্তু আসলে কোনো ব্যক্তি এই সমাজে, গণমাধ্যমে বা কোনো ইন্ডাস্ট্রিতে চর্চায় না থাকলেও অনেক সময় অন্যের ভালোবাসায় থাকেন। জুবিনের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল।

জুবিনকে নিয়ে এখন যেসব লেখা হচ্ছে তাতে উঠে আসছে অসমে তার সামাজিক কর্মকাণ্ড। আসামের মানুষের তার প্রতি ভালোবাসার কথা। তার শেষযাত্রার সময় গুয়াহাটির লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলই বিমানবন্দর থেকে কাহিলিপাড়া পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পথজুড়ে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলে শিল্পীকে শেষবার দেখতে। ফুলে ঢাকা অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ছিলেন ভক্তরা। ধর্ম, বর্ণ, বয়সের কোনো নির্দিষ্টতা ছিল না। সবার হাতে ছিল ফুল, চোখে অশ্রু আর ঠোঁটে প্রার্থনা।

শিল্পী জুবিন গর্গের উত্থানটা এই শতকের প্রথম দশকে। ২০০৬ সালে মুক্তি পায় অনুরাগ বসু পরিচালিত সিনেমা ‘গ্যাংস্টার’। মুখ্য চরিত্রে ছিলেন ইমরান হাশমী। সঙ্গে ছিলেন শাইনি আহুজা ও কঙ্গনা রানাওয়াত। একটা সিনেমাকে গান কীভাবে টেনে নিতে পারে তার আদর্শ উদাহরণ গ্যাংস্টার। নবাগত তিন অভিনেতার অভিনয় ততটা সাড়া ফেলেনি। শরীরী আবেদনের কিছু বিষয় ছিল কিন্তু গানগুলো দর্শক-শ্রোতার মন ছুঁয়েছিল। আমাদের জেমস গেয়েছিলেন ‘ভিগি ভিগি’, কেকে গেয়েছিলেন ‘তু হি মেরি শাব’, অভিজিৎ গেয়েছিলেন ‘লামহা লামহা’ আর জুবিন গেয়েছিলেন ‘ইয়া আলী’। সিডির যুগ তখন শেষ হতে হতেও হয়নি। ছিল এমপিথ্রি-এমপিফোর প্লেয়ার আর কেবল সার্ভিস প্রভাইডারদের ‘ভিডিও চ্যানেল’। সব মাধ্যমেই চলছিল গ্যাংস্টারের অ্যালবাম। এক দুই তিনদিন নয়, মেরেকেটে অন্তত এক দশক চলেছিল এই অ্যালবাম। আর জুবিনের ‘ইয়া আলী’ বাজত অলিগলিতে।

৫২ বছর বয়সে চলে যাওয়া জুবিনের ক্যারিয়ার ৩৩ বছরের। ১৯৯২ সালে ইয়ুথ ফেস্টিভ্যালে গোল্ড মেডেল পেয়ে যাত্রা করেন সংগীতে। ওই বছরেরই নভেম্বরে অসমিয়া অ্যালবাম অনামিকা দিয়ে পেশাদারি সংগীতে যাত্রা করেন তিনি। মেঘালয়ের তুয়ায় জন্ম নেয়া এ শিল্পী এরপর নিয়মিত অ্যালবাম বের করেছেন। ১৯৯৫ সালে মুম্বাই পাড়ি দেন তিনি।

বলিউডের সিনেমায় প্লেব্যাক করতেন জুবিন কিন্তু খুব বেশি নজরে আসেননি। গ্যাংস্টারের গানটিই তাকে সামনে আনে। এরপর আবারো আড়ালে পড়ে যান। কিন্তু এরই মধ্যে হিন্দির পাশাপাশি বাংলা গানে নাম করেন। তার গাওয়া বোঝে না সে বোঝে না, পিয়া রে, মন মানে না, তোমার আমার প্রেম, লাগে না লাগে না ইত্যাদি আজও জনপ্রিয়।

জুবিন ক্যারিয়ারিস্ট শিল্পী ছিলেন না। বেশ খামখেয়ালি ছিলেন। লাইভ পারফরম্যান্সে ঘুমিয়ে যাওয়া, মাতাল হয়ে গালাগালি করার রেকর্ড আছে। কিন্তু তাকে পশ্চিমবঙ্গ, আসামের মানুষ ভালোবাসে। আর এ ভালোবাসার কারণ তিনি আসামের বহু মানুষের জন্য কাজ করেছেন। বলিউডের গ্ল্যামার আর আলোচিত শিল্পীদের তালিকায় না থাকলেও সংগীত তিনি ছাড়েননি। মানুষও তাকে ভালোবাসতে ছাড়েনি। ফলে সংগীত আর ভালোবাসায় জুবিন জীবন্ত হয়েই থাকবেন।