বাংলা সিনেমার (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ) আলাপ আসলে উত্তম কুমারের কথা আসে। বাংলাদেশের সিনেমার সঙ্গে তার সরাসরি যোগ নেই কিন্তু উত্তম কুমার বাংলাদেশের দর্শকের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন এবং এখনো আছেন। মূলত তার যে প্রতিভা ও প্রভাব তা বাংলাদেশ তো বটেই, বলিউডও এড়াতে পারেনি। উত্তমকে বলিউড গ্রহণ করেনি সাদরে তবে ফেলেও দিতে পারেনি। আর বাংলাদেশের সেকালের দর্শক তো বটেই, একালের দর্শকও উত্তম-অভিনয়ে মুগ্ধ হন। পশ্চিমবঙ্গে উত্তম বন্দনা হয়। তার অভিনীত সিনেমা রিমেক করে কেউ সময়ের সেরা পরিচালক হয়ে যান। নানা অনুষ্ঠানে উত্তম কুমারকে মহানায়ক বলে বলে মুখে ফেনা তোলা হয় কিন্তু আদতে অভিনেতা উত্তমের সঠিক মূল্যায়ন কি আদৌ হয়েছে?

উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক বা প্লাস পয়েন্ট কি? এ প্রশ্ন করলে অনেকে বলবেন, তার গ্ল্যামার। কেউ বলবেন, তার অভিনয়। কেউ বলবেন, তার হাসি। সম্প্রতি, এই কিছুদিন আগে, রোববার (পশ্চিমবঙ্গের সংবাদ প্রতিদিন পত্রিকার ম্যাগাজিন) একটা সংখ্যায় আস্ত একটা আর্টিকেল লিখেছিল উত্তম কুমারের হাসি নিয়ে। তার হাসি কেমন করে প্রভাবিত করেছিল দর্শককে, সেই সময়ের মানুষকে। সাধারণত উত্তম কুমার সম্পর্কে এই ধরনের কথাই বেশি প্রচলিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে তা সত্যও। কিন্তু এর আড়ালে পড়ে যায় উত্তম কুমারের অভিনয় প্রতিভা, অভিনয়ে তার বহুমুখী চরিত্র করার স্বাভাবিক সক্ষমতা ও সময়ের তুলনায় এগিয়ে থাকা।

MV5BY2JiY2FlZTctMzk4MC00M2JlLTkwNmUtYjg0NTA5NzViOGM3XkEyXkFqcGc@._V1_FMjpg_UX1000_

বসু পরিবারের পোস্টার। ছবি: আইএমডিবি

উত্তম কুমার নিয়ে আলোচনায় তার প্রাথমিক জীবন বা সিনেমায় আসার প্রসঙ্গ টানা হচ্ছে না। কেননা সেসব আজকাল গুগলে পাওয়া যায়। এর বাইরে উত্তম কুমারকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বা তার সম্পর্কে বলতে গেলে তার পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেতা, পরিচালকরা ভক্তিগদগদ ও তার সমসাময়িকরা আবেগী কিছু কথা ও স্মৃতি উচ্চারণ করেন। এর বাইরে উত্তম কুমারের জীবদ্দশায়ই তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল বহু কিংবদন্তী। সেসবও নতুন করে চলে আসে বা তা খণ্ডন করায় সময় চলে যায়। কিন্তু উত্তম কুমারকে মূলত আবিস্কার করতে হয় তার সিনেমার মাধ্যমে।

তরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় সিনেমায় এসে হলেন উত্তম কুমার। প্রথমে অভিনয় করেন হিন্দি সিনেমা ‘মায়াডোর’-এ। সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। সে হিসেবে উত্তমের অভিষেক হয় ১৯৪৮ সালের ‘দৃষ্টিদান’ দিয়ে। ১৯৫২ পর্যন্ত সাতটি সিনেমা করলেও কেনোটিই সাফল্যের মুখ দেখেনি। ১৯৫২ সালে নির্মল দে পরিচালিত ‘বসু পরিবার’ দিয়ে সাফল্য পান উত্তম কুমার। পরের বছর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। মূলত নির্মল দে-র এই সিনেমাতেই উত্তম-সুচিত্র জুটির সূচনা এবং তারপর ইতিহাস।

আইএমডিবি বলছে উত্তম কুমার অভিনীত সিনেমার সংখ্যা ১৯৮। ক্যারিয়ারে ব্যবসাসফল, সমালোচক প্রশংসিত সিনেমার পাশাপাশি বহু ফ্লপ সিনেমা আছে উত্তম কুমারের। সাফল্যের শিখরে থাকা অবস্থাতেও নানা ধরনের সিনেমায় অভিনয় করেছেন যার কোনোটি হয়ত সুপারস্টারের যোগ্য সিনেমা নয় কিন্তু উত্তম কুমার সেসব সিনেমায় অভিনয় করেছেন—কখনো প্রতিশ্রুতি, কখনো বন্ধুত্বের খাতিরে। উত্তম কুমার জাত অভিনেতা ছিলেন এবং অভিনয় ছিল তার ধ্যান। সে কারণেই এসব সিনেমায় অভিনয় করা।

MV5BZmI1ZDMxZTQtMmQ2Ni00MmQ3LWFlNGItNDEwN2I1NjFiNmFhXkEyXkFqcGc@._V1_FMjpg_UX1000_

বন পলাশীর পদাবলী সিনেমার পোস্টার। ছবি: আইএমডিবি

চল্লিশের দশকে পশ্চিমবঙ্গ এমনকি বলিউডের সিনেমাও ছিল স্টুডিওভিত্তিক। স্টুডিওর ভেতরে সেট নির্মাণ করে সিনেমা হতো। সংলাপ থাকত বইয়ের ভাষায়। আজকের দিনে সিনেমায় অভিনয় দেখলে বোঝা যায় না যে এটা সাজানো একটা দুনিয়া। কিন্তু সেকালের সিনেমা আজকে দেখলে বোঝা যায় যে পাত্রপাত্রীরা অভিনয় করছেন। কিন্তু সময়ের হিসেবে উত্তম কুমারের মধ্যে এই বিষয়টি ছিল কম। ন্যাচারাল অভিনয় বলতে যা বোঝায় তা পঞ্চাশের দশকেই উত্তম কুমারের মধ্যে দেখা গেছে। এর অন্যতম কারণ ছিল উত্তম কুমারের অভিনয়ের সহজাত দক্ষতা। অন্য অভিনেতারা যখন প্রচলিত ধারার মধ্যেই অভিনয় করে যাচ্ছেন, উত্তম কুমার তখন চিত্রনাট্য ও চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিজেকে নতুন করে তৈরি করতেন স্বল্প সময়ে।

সিনেমায় জুটির বিষয়টি সব সময়ই গুরুত্ব পেয়েছে। সে কারণে এক সময় বলিউডে যেমন তৈরি হয়েছিল রাজ কাপুর-নার্গিস জুটি, ঋষি কাপুর-নীতু সিং জুটি, অমিতাভ-রেখা, শাহরুখ-কাজল, তেমনি পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হয়েছিল উত্তম-সুচিত্র জুটি। কিন্তু যে জুটিগুলোর নাম নেয়া হলো তার মধ্যে উত্তম-সুচিত্রাকে তুলনা করা যায় রাজ-নার্গিসের সঙ্গে। বস্তুত রাজ-নার্গিসের তুলনায়ও জনপ্রিয় ছিলেন উত্তম-সুচিত্রা। কিন্তু এই জুটির মধ্যে আটকে থাকেননি উত্তম। সুচিত্রার আড়ালে চলে যাওয়া প্রসঙ্গে অনেকে উত্তম কুমারকে দোষারোপ করেন কিন্তু অভিনেতা উত্তম কুমার মূলত তার সীমানা পার করে গেছেন সব সময়। তিনি যেমন সুচিত্রার সঙ্গে সফল সিনেমা দিয়েছেন, তেমনি সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও সফল সিনেমা দিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রিকে। আর এখান থেকেই আসে ইন্ডাস্ট্রি প্রসঙ্গ।

Uttam-Suchitra

উত্তম সুচিত্রা জুটি

উত্তম কুমার এক সময় পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে শাসন করেছেন। তবে কথাটি নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক অর্থে নিতে হবে। তিনি নতুন ধারার সিনেমা করেছেন। ব্যবসাসফল সিনেমা যেমন দিয়েছেন তেমনি ‘বন পলাশীর পদাবলী’র মতো সাহিত্য ভিত্তিক সিনেমাও করেছেন। রমাপদ বসুর ১৯৬০ সালের একই নামের উপন্যাসকে ভিত্তি করে নির্মিত সিনেমাটির পরিচালনা, সংলাপ ও প্রযোজনাও উত্তম কুমারের। বন পলাশীর পদাবলীর উল্লেখের কারণ, এ সিনেমার ব্যবসায়িক সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল কম। ১৯৭৩ সালে যখন সিনেমাটি মুক্তি পায় তখন সেটি ফর্মুলা সিনেমার যুগ। কিন্তু উত্তম কুমার সেই সময়েই চাইলের গ্রাম বাংলার একটা চিত্র তুলে ধরতে। বন পলাশীর পদাবলী বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আজও প্রশংসিত।

ইন্ডাস্ট্রি প্রসঙ্গ তোলার একটি কারণ হলো অনেক সময়ই একটা ইন্ডাস্ট্রি একজন বা গুটি কয়েক অভিনেতার ওপর নির্ভর করে। কিংবা নির্ভর না করলেও একজন শিল্পী ইন্ডাস্ট্রিকে দেন অনেক কিছু। যেমন বলিউডে এক সময় দিয়েছেন রাজ কাপুর। এক সময় দিয়েছেন শাহরুখ খান। ২০২৩ সালে তিনি একাই তিনটি ব্লকবাস্টার দিয়ে রুগ্ন বলিউডকে আশা দিয়েছেন। তেমনি উত্তম কুমারের ওপরও নির্ভর করত পশ্চিমবঙ্গের ইন্ডাস্ট্রি। কেননা একটা সময় এমন অবস্থা হয়েছিল যে নির্মাতারা নিশ্চিত থাকতেন উত্তম কুমার থাকলে সে সিনেমা দর্শক পাবে। এসব কারণে কিছু বাণিজ্যিক কিছু বস্তাপচা গল্পের সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার কিন্তু তার বা পশ্চিমবঙ্গের সিনেমার ইতিহাস ঘাঁটলে মানতে হবে এগুলো ছিল সময়ের প্রয়োজনে। সেই প্রয়োজনকে মেনে নিয়েছিলেন উত্তম কুমার।

1690850261_uttam-kumar

উত্তম কুমার। ছবি: আনন্দবাজার পত্রিকা

বলা হচ্ছিল উত্তম কুমারকে বলিউড গ্রহণ করেনি। বলিউডের প্রসঙ্গ আনার কারণ, এটা ভারতের বৃহত্তম ইন্ডাস্ট্রি। বাস্তবিক, অন্য ইন্ডাস্ট্রির তারাকারা বলিউডে এখনো ভালো করতে পারেন না। এটা ইন্ডাস্ট্রির চরিত্র। কিন্তু উত্তমের সিনেমার একটা অন্য ব্যপার ছিল। তার প্রথম সফল সিনেমা বসু পরিবার মুক্তির আট বছর পর বলিউডে রিমেক হয়েছিল ‘হাম হিন্দুস্তানি’ নামে। অভিনয় করেছিলেন সুনীল দত্ত, আশা পারেখ, সঞ্জীব কাপুরের মতো তারাকারা। উত্তম কুমার অভিনীত ১৯৭৬ সালের সিনেমা ‘অমানুষ’। সিনেমাটি বাংলার পাশাপাশি হিন্দিতেও নির্মাণ করেছিলেন পরিচালক শক্তি সামন্ত। পরের পর তেলেগুতে রিমেক হয়। অভিণয় করেন এনটি রামা রাও। এর পরের বছর মালয়ালম ও তামিলেও রিমেক হয়। তামিল ‘ত্যাগম’-এ অভিনয় করেন শিবাজী গণেশ। এ দুটি কেবল উদাহরণ। এমন আরো কিছু সিনেমা আছে উত্তম কুমারের। কিন্তু এই সিনেমার নামগুলো আলোচনায় আসে না।

ভত্তিগদগদ হওয়ার বাইরে উত্তম কুমারকে বিক্রি করার একটা প্রবণতা দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের নানা অনুষ্ঠানে দেখা যায় উত্তম কুমারকে নিয়ে নানা আলাপ। আর তার সিনেমাকে ভাঙচুর করার উদাহরণের তো অভাব নেই। এর মধ্যে নায়ককে ভেঙে সৃজিত মুখার্জি নির্মাণ করেছেন ‘অটোগ্রাফ’। সুপারহিট সিনেমা। তিনিই আবার ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ভেঙে করলেন ‘জাতিস্মর’। ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ভেঙে তৈরি হলো ‘এক যে ছিল রাজা’। এমনকি সর্বশেষ উত্তম কুমারের সিনেমার ফুটেজ কেটে বানালেন ‘অতি উত্তম’। ট্রিবিউটের নামে সেখানে কী হলো তা দর্শক দেখলেই বুঝতে পারবেন।

1_O5ljVnxUL8LGouIVfdPMyw

উত্তম কুমার। ছবি: বলিউড ডিরেক্ট

এই সব কিছুর মধ্যে বাস্তবিক চাপা পড়ে যায় অভিনেতা উত্তম কুমার, তার অভিনয়, ইন্ডাস্ট্রিতে তার অবদান, দূরদৃষ্টিসহ অন্যান্য বিষয়। তিনি এমন একজন অভিনেতা যার ঝুলিতে আছে লাভার বয় (সুচিত্রার সঙ্গে প্রায় সব সিনেমা), গোয়েন্দা (ব্যোমকেশ বক্সী চরিত্রে ‘চিড়িয়াখানা’), উকিল (যদি জানতেম), হোটেল রিসেপশনিস্ট (চৌরঙ্গী) থেকে শুরু করে বেকার যুবক, সুবিধাবাজ (হোটেল স্নো ফক্স) ইত্যাদি বহু চরিত্র। তিনি যখন মৌচাকে হালকা ধরনের নীতিশ চরিত্রটি করছেন, তার আগের বছর বন পলাশীর পদাবলী করে এসেছেন। শেষ অঙ্ক করেছেন আবার উত্তরায়ণও করেছেন। ১৯৭০ সালে তার অভিনয়ে আসা ‘নিশিপদ্ম’ দুই বছর পর শক্তি সামন্ত রিমেক করেন ‘অমর প্রেম’ নামে। এ সিনেমা রাজেশ খান্নার ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা হয়ে আছে।

ব্যক্তি উত্তম কুমার, সুপারস্টার উত্তম কুমারের আড়ালে পড়ে গেছে সিনেমায় তার এই যাত্রা। অর্থাৎ, তার অভিনয় ও যাত্রার প্রকৃত ইতিহাসটা উঠে আসে না। উত্তম কুমারের স্থান মূলত একজন রাজ কাপুর, একজন মার্লোন ব্র্যান্ডোর পাশে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উত্তম কুমারকে নিয়ে আলাপটা সীমাবদ্ধই হয়ে থাকে সব সময়। সাধারণ দর্শকের কাছে তিনি উত্তম-সুচিত্র জুটির উত্তম, পশ্চিমবঙ্গের ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি মহানায়ক তকমার আড়ালে পড়ে থাকা সুপারস্টার।