অবশেষে বলিউড বাদশা শাহরুখ খানের পুত্র আরিয়ান খান পরিচালকের চেয়ারে বসলেন। তবে সিনেমা নয়, নির্মাণ করেছেন সিরিজ। ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে নেটফ্লিক্সে স্ট্রিম হচ্ছে তার প্রথম সিরিজ ‘ব্যা**ডস অব বলিউড’। পরিচালনার পাশাপাশি গল্পও তার। আগেও বিতর্কিত বিষয়ে জড়ালেও এবার তার জবাব আরিয়ান দিয়েছেন সৃজনশীলতার মাধ্যমে। সিরিজটি এরই মধ্যে নেটফ্লিক্সের ‘বৈশ্বিক সেরা ১০’ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, ওমান, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপ ও মরিশাসে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে ব্যা**ডস অব বলিউড। এতে বলিউড ইন্ডাস্ট্রির ভেতরকার নানা বিষয় রম্যের ম্যাধ্যমে প্রকাশ করেছেন নির্মাতা আরিয়ান খান।
সাত পর্বের এ সিরিজে বলিউডের ‘আউটসাইডার বনাম ইনসাইডার’ দ্বন্দ্বকে এক অভিনব ব্যঙ্গ ও বিনোদনধর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হলো। ‘ওম শান্তি ওম’ সিনেমার ‘দিওয়ানগি’ গান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ঝলমলে ক্যামিও, অসংখ্য সিনেমাটিক রেফারেন্স ও পুরনো হিট গানগুলো শুরুতেই নস্টালজিয়া তৈরির পাশা গল্পের প্রকাশভঙ্গি এক স্যাটায়ারধর্মী অনুভূতি দেয়। তবে আবেগঘন সম্পর্কের রসায়ন দর্শককে আবেগমথিত করার পাশাপাশি গল্পের মোড় দর্শককে বিস্মিত করেছে।
সিরিজের কেন্দ্রবিন্দু আসমান সিং। দিল্লির ছেলে, বলিউডে নবাগত। সে আচমকাই একটি অ্যাকশন ব্লকবাস্টার দিয়ে বলিউডে প্রবেশ করে। রাতারাতি সাফল্যের সঙ্গে সে মুখোমুখি হয় বলিউডের জটিল রাজনীতি, সিনেমার চুক্তি-ফাঁদ, অহংকারী প্রযোজক, সুপারস্টারদের ছোটখাটো আবদার, পাপারাজ্জিদের চাপ ও অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার। সবকিছু মিলিয়ে সিরিজটিতে তৈরি হয়েছে বলিউডের পর্দার পেছনের বাস্তব চিত্র। বাস্তবের বলিউডেও প্রতিদিনই অভিনেতা, পরিচালক ও ক্রুদের পর্যন্ত এসব বিষয় মোকাবেলা করতে হয়। সে কারণে দর্শকের কাছে বিশেষ হয়ে ওঠে সিরিজটি।
সিরিজে কাজ করা কলাকুশলীদের তালিকাও জুড়ে দিয়েছে নতুন মাত্রা। প্রথম সিরিজেই ‘তিন খান’কে (শাহরুখ, আমির ও সালমান)—একসঙ্গে আনা হয়েছে পর্দায়। তবে বলতেই হয় ‘ব্যক্তি আনা আরিয়ান খান’ নয়, এ কাজ সম্ভব হয়েছে ‘শাহরুখ পুত্র আরিয়ান’-এর পক্ষে। অন্য কেউ এটা পারতেন না। তবে এ কথাও বলতে হয়, তিন খান সিরিজে আছেন ঠিকই কিন্তু তাদের এক ফ্রেমে আনা সম্ভব হয়নি বা আরিয়ানই আনেননি। তিন খান ছাড়াও রণবীর কাপুর, রণবীর সিং, ইমরান হাসমি, মনিষ চৌধুরীর ক্যামিও ছিল। এছাড়া পুরো সময়টা মাতিয়ে রেখেছেন ববি দেওল, রজত বেদী, মনোজ পাহওয়া। তারা শুধুই অভিনয় নয়, হাস্যরসের মাধ্যমে বলিউডের অজানা কথাগুলোকে পর্দায় তুলে এনেছেন। বিশেষ করে করণ জোহরকে ‘বলিউড মাফিয়া’ হিসেবে উপস্থাপন করা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক পদক্ষেপ।
নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীরাও সিরিজকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। আসমান সিং চরিত্রে লক্ষ্য লালওয়ানি, পারভেজ চরিত্রে রাঘব জুয়াল, করিশমা তলওয়ার চরিত্রে সেহের বামবা দারুণ কাজ করেছেন। তাদের অভিনয় ও কেমিস্ট্রি সিরিজকে শক্তিশালী করেছে।
প্রযোজনা ও প্রযুক্তিগত দিকও ছিল সমৃদ্ধ। জয় পিনাক ওঝা তার সিনেমাটোগ্রাফিতে বলিউডের ঝলমল দুনিয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব জীবনকেও ফুটিয়ে তুলেছেন। সেট, পোশাক, প্রডাকশন ডিজাইন সবকিছুতে বাস্তবতার ছোঁয়া আছে। শাশ্বত সচদেবের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ও গান গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সম্পাদনার ‘কুইক কাটস কৌশল’ দর্শককে গতি ও উত্তেজনার সঙ্গে ধরে রেখেছে।
ব্যা**ডস অব বলিউড নিয়ে ইতিবাচক কথা বলছেন বলিউডের অনেকে। শাহরুখ খান সিরিজটিকে ‘বিনোদনমূলক, হাস্যরসাত্মক ও আবেগঘন’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে বিতর্কও হয়েছে কিছু। ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর মাদককাণ্ডে গ্রেফতার হন আরিয়ান। তাকে ক্রুজ পার্টি থেকে গ্রেফতার করেন এনসিবি কর্মকর্তা সামির ওয়াংখেড়ে। সিরিজে সামিরকে কটাক্ষ করে একজন ‘প্লেইন-ক্লথড কপ’ চরিত্র রাখা হয়েছে। সে বাস্তব ঘটনাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করেছেন আরিয়ান। সিরিজ মুক্তির পর সামির ওয়াংখেড়ে মানহানির মামলা করেছেন শাহরুখ ও তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তবে সে মামলার খুব একটা প্রভাব পড়েনি শাহরুখ পুত্রের এ নির্মাণে। অনেকেই মনে করছেন, সে বিতর্কিত ঘটনার প্রত্যুত্তর হিসেবে আরিয়ান চরিত্রটিকে এভাবে উপস্থাপন করেছে।
আরিয়ান খানের জীবন বলিউডকেন্দ্রিক। তাই তিনি বলিউডকে কাছ থেকে চেনেন। প্রথম নির্মাণে সাহসিকতা রেখে বিনোদন ও সমালোচনার সূক্ষ্ম ভারসাম্য দেখিয়েছেন। বলিউডপ্রেমীদের জন্য এ সিরিজ এক রকম ‘চকোলেটের বক্স’—ইস্টার এগ, তারকাদের ক্যামিও, অভ্যন্তরীণ তথ্য—সবকিছু মিলিয়ে দর্শককে দিচ্ছে বলিউডের পর্দার পেছনের ঝলক।










