‘ভাইলেন্স ভাইলেন্স ভাইলেন্স, আই ডোন্ট লাইক ইট। আই অ্যাভয়েড। বাট, ভাইলেন্স লাইকস মি। আই কান্ট অ্যাভয়েড।’
প্রশান্ত নীল পরিচালিত ‘কেজিএফ চ্যাপ্টার টু’র সংলাপ। রকিরূপী যশ যখন এ সংলাপ বলেন তখন থিয়েটারে শিস বেজেছিল। দর্শক তালি দিয়েছিল। ইউটিউবে থাকা এ ক্লিপটুকুতেও লাখের ওপর ভিউ। মূলত দর্শক এমন সংলাপ পছন্দ করেন। তারা পছন্দ করেন সিনেমায় ভায়োলেন্স। কিন্তু তার তো একটা সীমা থাকার কথা। অথচ ভারতের গত দুই তিন বছরের সিনেমার দিকে তাকালে মনে হবে সিনেমা মানেই যেন ভায়োলেন্স। সেটা গল্পের প্রয়োজনে আসে না, ঠুঁসে দেয়া হয়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ভায়োলেন্সের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে গোটা একটা সিনেমা।
গত বছরের বলিউডে সবচেয়ে আলোচনা পাওয়া চার সিনেমা ‘পাঠান’, ‘গদর টু’, ‘জওয়ান’ ও ‘অ্যানিমেল’। এর মধ্যে পাঠান অ্যাকশন-প্যাকড। গদর টু জাতীয়তাবাদী। জওয়ান মূলত অ্যাকশন, রোমান্স, ড্রামা, সোশ্যাল মেসেজের প্যাকেজ। কিন্তু অ্যানিমেল পুরোপুরি ভায়োলেন্সনির্ভর। সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গার এ সিনেমার ৩০ মিনিটের মাথায় দেখা যায় রণবিজয় মেশিনগান নিয়ে ঢুকছে ক্লাসরুমে। ৪৫ মিনিটে সে লোকভরতি কামরায় একজনকে শারীরিক আঘাত করার পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং এরপর গুলিও করে। গল্পের দেখা পাওয়ার আগেই দর্শক পান নৃশংসতা আর রক্তের স্বাদ।
সিনেমার নামই অ্যানিমেল। পশুমাত্রই নৃশংস। আর মানুষের জীবনে নৃশংসতা নেই এমনও না। কিন্তু সিনেমায় তা আসার কথা গল্পের প্রয়োজনে, সামঞ্জস্য রেখে। অ্যানিমেলে তা অনুপস্থিত। এছাড়া নানাভাবে সিনেমাটিতে প্রমোট করা হয়েছে নৃশংসতা ও ঘৃণা। সিনেমায় ১ ঘণ্টা নাগাদ রণবিজয়কে দেখা যায় একটি স্বস্তিকা চিহ্নের সামনে। স্বস্তিকা হিন্দু ধর্মের একটা চিহ্ন, কিন্তু গভীর দৃষ্টিতে তাকালে মনে হবে ভাঙ্গা এখানে স্বস্তিকা এনেছেন নাৎসিবাদ প্রচার করতে। কেননা কিছু কিছু ক্ষেত্রে রণবিজয়ের আচরণ গেস্টাপোর মতোই।
সে যাই হোক, অ্যানিমেলের কথা বাদ দিয়ে উপর্যুক্ত তিন সিনেমার দিকে তাকালেও দেখা যায় অ্যাকশনের মধ্যে সেখানেও আছে ভায়োলেন্স। পাঠানে তুমুল মারামারি, গদরে পাকিস্তানি হামলা থেকে জওয়ানে কালী যেভাবে মানুষকে জোর করে ওষুধ খাইয়ে মারে সেখানেও ভায়োলেন্স উপস্থিত। তবে তা কোনো না কোনোভাবে গল্পের প্রয়োজনে এসেছে।
বলিউড একসময় বিখ্যাত ছিল রোমান্টিক সিনেমার জন্য। এর মধ্যে অ্যাকশনও তারা দিয়েছে তবে তা বলিউডের নিজস্ব ধারায়। এর মধ্যে ভারতের সিনেমায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখা সিনেমার নাম ‘শোলে’। রমেশ সিপ্পি পরিচালিত সিনেমাটি একালের অ্যাটলি কুমারের জওয়ানের মতোই ‘মাসি মাসালা ফিল্ম’। কিন্তু সেটির ক্লাইম্যাক্সে ঠাকুর যখন গব্বরকে হত্যা করে, সে দৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন। তাদের কাছে বিষয়টি ছিল ‘টু ভায়োলেন্ট’। একালে এসে বোর্ড বোধহয় মানুষের মতোই অনুভূতিতে আরেকটু ভোঁতা হয়ে উঠেছে।
সিনেমায় ভায়োলেন্স নতুন কিছু নয়। গদারে ভায়োলেন্স ছিল, হিচককে ছিল। এমনকি ছিল বলিউড রোমান্সের ঈশ্বর যশ চোপড়ার সিনেমায়ও। ‘ত্রিশূল’, ‘দিওয়ার’-এ তিনি দেখিয়েছেন ভায়োলেন্স। তবে তা খুবই মৃদু। ওটাকে ভায়োলেন্স হিসেবে চিহ্নিত করবেন না অনেক দর্শক। এবার একটু অন্যদিকে গিয়ে নাম করা যাক সিনেমার আরেক মাস্টারের—মার্টিন স্করসেসি। ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কিলার্স অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’ একটি সংবেদী সিনেমা। ওসেজ আদিবাসীদের হত্যা নিয়ে নির্মিত সিনেমায় ভায়োলেন্স আছে। আদিবাসীদের পড়ে থাকা লাশ, মলি বার্কহার্টের স্লো পয়জনিংয়ের মধ্যে যে ভায়োলেন্স আছে তা দর্শককে বিদ্ধ করে। কিন্তু ভারতের চলমান ভায়োলেন্স দর্শককে করছে রক্তপিপাসু। আর সেক্ষেত্রে বলিউডের তুলনায় এগিয়ে আছে দক্ষিণ ভারত ও তাদের তথাকথিত ‘প্যান ইন্ডিয়ান সিনেমা’।
গত বছরের শেষে শাহরুখ খানের ‘ডাঙ্কি’র পাশে মুক্তি পেয়েছিল প্রভাস অভিনীত ‘সালার’। সিনেমাটি ডাঙ্কির চেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে। অভিব্যক্তি ও সংলাপহীন প্রভাস এ সিনেমায় কয়েকটি অ্যাকশন সিকোয়েন্স করেছেন, যার মধ্যে একটিতে তাকে রক্তমাখা অবস্থায় দেখা যায়। কোনো প্রয়োজন হয়তো ছিল না, কিন্তু রক্ত ও ভায়োলেন্স নিয়েই তৈরি হয়েছে সিনেমাটি। সেখানে প্রভাসকে কোনো কোনো সময় রক্তপিপাসু ভ্যাম্পায়ার মনে হয়।
দক্ষিণ ভারত একসময় রোমান্টিক সিনেমা নির্মাণ করত। এরপর তারা দেবদেবী নিয়েও সিনেমা করেছে। এ শতকের প্রথম দশক থেকেই নজর দিয়েছে অ্যাকশনে। তবে দিনে দিনে তা ঝুঁকেছে ভায়োলেন্সের দিকে। গত বছর মুক্তি পাওয়া ‘জেলার’, ‘লিও’, ‘সালার’; তার আগে মুক্তি পাওয়া ‘পুষ্পা: দ্য রুল’, ‘পেট্টা’, ‘আরআরআর’, ‘বিক্রম’ সবই এক ধারার। এর মধ্যে বিক্রমের শেষে রোলেক্সের এন্ট্রির দৃশ্য রীতিমতো রক্তারক্তির। আর সিনেমার খোঁজ রাখা প্রতিটি মানুষই জানে দর্শকের সেটিই সবচেয়ে পছন্দ।
শিল্পকে মানুষের জন্য বার্তা বহন করতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু শিল্পী বা নির্মাতার একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকেই। ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ মেনে নিয়েই বলতে হয় সিনেমাকে এগিয়ে নিতে হলেও তো ভায়োলেন্সকে ঠিক জায়গায় বসাতে হবে। দর্শক চাইতেই পারেন একটা ধারা, কিন্তু নির্মাতারও মনে রাখা প্রয়োজন সিনেমা একটা শিল্প আর সে শিল্প চায় নান্দনিকতা। না হলেও অন্তত সামঞ্জস্য। কিন্তু সেদিকে নজর না দিয়ে পরিচালকরা সিনেমা বানিয়ে যাচ্ছেন। নৃশংসতা, ঘৃণা, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর পাশাপাশি পুরুষপ্রধান এ সিনেমাগুলোয় গৌণ হয়ে পড়ছে নারী চরিত্ররা। সব মিলিয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সিনেমার। ভায়োলেন্সই হচ্ছে, সিনেমা নয়।










