দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এ বছরের ১৯ ডিসেম্বর মুক্তি পেয়েছে জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’। বিশ্বজুড়ে এ মুক্তি যেমন আলোড়ন তুলেছে, তেমনি সম্প্রতি বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোয়ও আবার ফিরে এসেছে প্যান্ডোরার নীল আলো, ভিনগ্রহের আকাশ আর সেই চেনা আবেশ।

২০০৯ সালে যখন অ্যাভাটার প্রথম মুক্তি পায়, তখন সেটিকে সাধারণ কোনো সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র বলে মনে হয়নি। মনে হয়েছিল যেন নতুন কোনো গ্রহ। অনেকে জানতেন না, এ অভিজ্ঞতা হঠাৎ কোনো প্রযুক্তিগত কাকতালীয় ঘটনা নয়। অ্যাভাটার ছিল কয়েক দশক ধরে জমে ওঠা এক স্বপ্নের ফল। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই জেমস ক্যামেরনের মনে এ গল্প বাস করছিল। কিন্তু তিনি জানতেন সে গল্প বলার মতো প্রযুক্তি তখনো তৈরি হয়নি। ক্যামেরন পরে বলেছিলেন, ‘আমি ‘‘অ্যাভাটার’’কে যেভাবে কল্পনা করেছিলাম, সেভাবে তখন বানানো সম্ভব ছিল না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রযুক্তিকে আমার কল্পনার সমান হতে হবে।’

শুরু থেকেই ক্যামেরনের একটি শর্ত ছিল, প্যান্ডোরাকে বাস্তব মনে হতে হবে। কেবল দৃশ্যত নয়, জীববৈজ্ঞানিক, আবেগগত ও পরিবেশগতভাবেও। এ দর্শনই অ্যাভাটার নির্মাণের প্রতিটি স্তর নিয়ন্ত্রণ করেছে—পাতার আকৃতি থেকে শুরু করে উড়ন্ত প্রাণীর চলন পর্যন্ত।

31

প্যান্ডোরাকে নির্মাণের ক্ষেত্রে ক্যামেরনের দল একে শিল্পকর্ম হিসেবে নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো করে দেখেছিল। শিল্পী, ডিজাইনার ও গবেষকরা পৃথিবীর বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেন, বিশেষ করে ঘন অরণ্য ও গভীর সমুদ্র। প্যান্ডোরার বহু প্রাণীই সামুদ্রিক জীবের অনুপ্রেরণায় তৈরি। এর পেছনে রয়েছে ক্যামেরনের ব্যক্তিগত জীবনও। তিনি শুধু চলচ্চিত্রকার নন, তিনি একজন গভীর সমুদ্র অভিযাত্রী। তিনিই প্রথম মানুষ, যিনি একা নেমেছেন মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সর্বনিম্ন গভীরতায়। পৃথিবীর সেই অন্ধকার, অচেনা জগৎ তার সামনে তুলে ধরেছিল, পৃথিবী নিজেই কতটা ভিনগ্রহের মতো হতে পারে। অ্যাভাটার টিমের সহপ্রডাকশন ডিজাইনার ডিলান কোল বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টার স্কেচে আমরা প্রকৃতির চেয়ে ভালো কিছু বানাতে পারি, এমন ভাবাটা ভীষণ অহংকার। আমরা বরং প্রকৃতি থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়েছি।’

এ পদ্ধতি আরো গভীর হয় ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার (২০২২)’-এ। সেখানে প্যান্ডোরা ছড়িয়ে পড়ে গভীর সমুদ্র, প্রবাল সদৃশ রিফ এবং সম্পূর্ণ নতুন জলভিত্তিক সংস্কৃতির ভেতর। দীর্ঘ সময় ফ্রি-ডাইভিং প্রশিক্ষণ নিতে অভিনেতাদের বাধ্য করেন ক্যামেরন, যেন পানির নিচের অভিনয় কৃত্রিম না লাগে। কেউ কেউ ৪ মিনিটেরও বেশি সময় নিশ্বাস আটকে রাখতে সক্ষম হন, যা মূলধারার সিনেমায় একেবারেই নজিরবিহীন। ফলে পানি সেখানে পটভূমি নয়, একটি চরিত্রে পরিণত হয়।

‘অ্যাভাটার’ এর সবচেয়ে বড় বিপ্লব আসে পারফরম্যান্স ক্যাপচারে। এর আগে অনেক সিনেমায় এ ধরনের কল্পচরিত্রগুলো দেখতে সুন্দর হলেও আবেগে ছিল ফাঁপা। ক্যামেরন চেয়েছিলেন তার চরিত্রদের দেখে যেন বাস্তবতার অনুভূতি পায় দর্শক। এ লক্ষ্যেই তিনি উদ্ভাবন করেন ‘হেড-মাউন্টেড ক্যামেরাভিত্তিক ফেসিয়াল ক্যাপচার’ প্রযুক্তি, যা অভিনেতাদের মুখের প্রতিটি সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি ধরে রাখতে পেরেছে। এক সাক্ষাৎকারে ক্যামেরন বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম আমার চরিত্ররা চোখ দিয়ে অভিনয় করুক। সেটা হারালে সবকিছুই হারিয়ে যাবে।’

তিনি আরো তৈরি করেন একটি ভার্চুয়াল ক্যামেরা সিস্টেম, যার মাধ্যমে তিনি বাস্তব সময়ে প্যান্ডোরার ভেতর হাঁটতে পারতেন, শট ফ্রেম করতে পারতেন, ঠিক যেন বাস্তব সেটে কাজ করছেন। ক্যামেরনের কাছে এটি অ্যানিমেশন পরিচালনা নয়, বরং একটি বাস্তব জায়গা আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা ছিল। এ যাত্রা অব্যাহত রয়েছে ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’-এ। এখানে দেখা গেছে আগুন, বাতাস ও উত্তাপে গড়ে ওঠা নতুন গোত্র ও সংস্কৃতি এবং মেদুসয়েডের মতো বিশাল বায়োলুমিনেসেন্ট প্রাণী, যেগুলো জেলিফিশ ও তরলগতিবিজ্ঞানের সূত্র অনুসরণ করে তৈরি।

অ্যাভাটার নির্মাণ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। অ্যাভাটারের পুরো দল বাজেট, গল্প, এমনকি নীল রঙের এলিয়েনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও সন্দিহান ছিল। ক্যামেরন নিজের পারিশ্রমিকের বড় অংশ ঝুঁকিতে রেখে এগিয়ে যান। ঝুঁকি সফল হয়। অ্যাভাটার ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয় করা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পায় দুবার। তবু ক্যামেরনের কাছে এটি কেবল সাফল্যের গল্প নয়। এটি ছিল এক বার্তা উপনিবেশবাদ, প্রকৃতি ধ্বংস এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক সতর্ক উচ্চারণ। এজন্যই ডিলান কোল বলেছিলেন, ‘প্যান্ডোরাকে ভালোবাসতে শিখলে মানুষ আসলে পৃথিবীকেই ভালোবাসতে শিখবে।’