একবিংশ শতাব্দীর উন্নত শহুরে জীবনে কিছু মানুষ যখন বৈষম্যহীন সমাজ, লিঙ্গসমতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়ে কথা বলে, তখন সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর খবর কি পৌঁছায় সে আধুনিক জীবনে? এ প্রশ্নেরই উত্তর যেন গালে চড় মেরে দিয়ে যায় কিছু সিনেমা। ‘হোমবাউন্ড’ ঠিক তেমনই।

রাতের অন্ধকারে ট্রাকে করে দুই বন্ধু যাচ্ছে পরীক্ষা দিতে। স্বপ্ন পুলিশ কনস্টেবলের চাকরি। তা এনে দিতে পারে একটু সচ্ছলতা আর সম্মান। এখান থেকেই গল্প শুরু। মূল গল্প ভারতের প্রত্যন্ত এক গ্রামের দুই বন্ধুর স্বপ্নপূরণের যাত্রার, যার সঙ্গে মিশে আছে সমকালীন ভারতবর্ষের প্রেম, ভালোবাসা, পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, মানসিক দ্বন্দ্ব থেকে মানুষের জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সব বিষয়।

হোমবাউন্ড হতে পারত গতানুগতিক বন্ধুত্বের গল্প। তবে পরিচালক নিরাজ ঘেওয়ানের জীবনদর্শন আর মুনশিয়ানায় হয়ে উঠেছে এক অনন্য সিনেমা। যেখানে সিনেমাটি কেবল তিনজন তরুণ শোয়েব, চন্দন আর সুধার লড়াইয়ের গল্প নয়। গল্প সেসব প্রান্তিক, শ্রেণী, ধর্ম, জাত বৈষম্যের শিকার সব মানুষের, যারা প্রতিদিন স্বপ্ন দেখে কাল সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা কী রেখেছে তাদের ভাগ্যে তা দেখা যায় সিনেমার শেষে।

চন্দন আর শোয়েব বড় হয় এমন এক সমাজে, যেখানে মানুষের যোগ্যতা মাপা হয় জাতপাত আর ধর্মের দাঁড়িপাল্লায়। কে উচ্চবর্ণের হিন্দু, কে দলিত, কে মুসলিম আর মুসলিম হলেই যেন সন্দেহভাজন, দেশবিরোধী। বহু প্রশ্নের ভার কাঁধে নিয়েই দর্শক যখনই ভাবে এবার বুঝি দুই চরিত্রের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে, তখনই সামনে আসে আরেক পরীক্ষা। কনস্টেবলের পরীক্ষায় চন্দন উত্তীর্ণ হলেও শোয়েব পারেনি। সে চাকরি নেয় এক পানির ফিল্টার বিক্রির কোম্পানির পিয়ন হিসেবে। শুধু মুসলিম বলেই তার হাত থেকে জল না খাওয়া, চোর অপবাদ দেয়া, এমনকি ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানী বলে ঠাট্টার ছলে অপমান সইতে না পেরে সোয়েব চাকরি ছেড়ে দেয়।

অন্যদিকে দলিত হয়ে জন্মানো চন্দন নিজের অপমান ঘোচাতেই কোটার বদলে বারবার সাধারণ বিভাগে ফর্ম ফিলাপ করে যায়। তবু তাচ্ছিল্যের হাত থেকে মেলে না মুক্তি।

যখনই দর্শক হৃদয়ে শোয়েব ও চন্দনের দুঃখ গভীর ক্ষত তৈরি করছে, ঠিক তখনই কয়েক সেকেন্ডের একটি দৃশ্য নাড়িয়ে দেয় দর্শককে। বৈষম্যের মধ্যেও যে লুকিয়ে থাকে বৈষম্য তা ফুটে ওঠে চন্দনের বোনের একটি সংলাপে। চন্দনের বোনেরও কলেজে পড়ার ইচ্ছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পুরুষ বলে দরিদ্রতার কশাঘাতের মধ্যেও চন্দন সুযোগ পায় নিজের স্বপ্ন বেছে নেয়ার।

চন্দনের মায়ের ফাটা গোড়ালি যেন তাদের পারিবারিক উত্তরাধিকার। শোয়েবের বাবার পঙ্গু পা আর তার চিকিৎসার স্বপ্ন তাদের তাড়িত করে আরো বেশি অর্থ উপার্জনের দিকে। একদিন মাথার ওপর নিজের ছাদ হবে, একদিন পুলিশের পোশাক গায়ে গোঁফে তা দিয়ে সমাজস্বীকৃত পুরুষ হয়ে উঠবে, এ স্বপ্নের আগুনেই তারা এগিয়ে চলে। এত সংগ্রামের মাঝেও চন্দনের জীবনে নিঃশব্দে জন্ম নেয় এক নিষ্পাপ প্রেম।

করোনা মহামারীর আবহে পরিযায়ী মানুষের হাহাকার, মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতার-ভালোবাসার চিত্র ফুটে ওঠে জলের পাত্রে। ছবির শেষ দৃশ্য চোখ ভিজিয়ে দেয়। যাদের জীবনে পাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না, যাদের ঘরে ফেরা অনন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে রইল তাদেরই গল্প এ সিনেমা।

হোমবাউন্ড আশার গল্প শোনালেও শেষে এসে কোনো সস্তা সান্ত্বনা দেয় না। সময়, অসময় আর দুঃসময়ের নির্মম বাস্তবতায় সে দাঁড়ায়। কিন্তু সম্পূর্ণ অন্ধকারেও পরিচালক এক ফোঁটা আলো রেখে দেন শোয়েবের ভেতর। যে স্বপ্ন চন্দন শেষ করতে পারেনি, সে অসম্পূর্ণ স্বপ্নটাকেই সে আঁকড়ে ধরে।

হোমবাউন্ডের ক্যামেরা সাজানো জগৎ দেখায় না। লোকাল ট্রেন, ভিড়ে ঠাসা প্লাটফর্ম, ঘামের গন্ধে ভেজা শ্রমিক, সুরাটের শাড়ি কারখানার নোংরা লেবার কোয়ার্টার—এসবই সিনেমার স্বাভাবিক পরিসর। কোথাও কল্পনার অলংকার নেই, নেই আরামদায়ক সৌন্দর্য। আছে কেবল কঠিন, রুক্ষ, নির্ভেজাল বাস্তব। তার মধ্যেই গড়ে ওঠে দুই বন্ধুর নিবিড় সম্পর্ক—কাঁধ, ভরসা, একে অন্যের একমাত্র অবলম্বন।

চন্দনের চরিত্রে বিশাল জেঠওয়া অসামান্য। শোয়েব চরিত্রে ঈশান খাত্তারের অভিনয় অসাধারণ। গল্পের প্রতিটি চরিত্রই অভিনয়, সাজসজ্জায় ছিল নিখুঁত। সব ভালোর মধ্যেও যেন একটু খাপছাড়া লাগে সুধা ভারতি’র চরিত্রে জাহ্নবী কাপুরকে। গ্ল্যামারহীন সাজও যে তার গ্ল্যামার ঢাকতে পারেনি। দলিত সম্প্রদায়ের চরিত্রে তার চলন বলন, বিশেষত সার্জারি করা চোখা নাক চোখে লাগছিল।

অস্কার মনোনয়ন পাওয়া বড় অর্জন, কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হলো মানুষের গল্প বলা—বৈষম্যের শিকার, অনুচ্চারিত জীবনের ইতিহাসকে রুপালি পর্দায় তুলে ধরা। যে সিনেমা শুধু সিনেমা নয় বরং সমাজের নির্মম সত্যের প্রতিচ্ছবি। হোমবাউন্ড ভারতের হলেও আমাদের দেশ কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে অন্য কোনো বিষয়ে এ বৈষম্যের চিত্র যেন একই।

শেষ পর্যন্ত সবাই স্বপ্ন দেখে একদিন নিজের ঘরে ফেরার। হোমবাউন্ডের শেষ দৃশ্যই বলে দেয় এর নামের সার্থকতা। কিছু সিনেমা আসে হইচই করে, ঢাকঢোল পিটিয়ে দর্শকের দৃষ্টি কাড়ে। কিছু সিনেমা আসে নিঃশব্দে আলোছায়ার মতো আর হৃদয়ের গভীরে দাগ কেটে যায়। এ সিনেমা দেখার পর দর্শকের মনে প্রতিধ্বনিত হবে কবি দাউদ হায়দারের সেই বিখ্যাত লাইন—‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’।