১৯৪০-এর দশকের শেষ থেকে ১৯৭০-এর দশকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ঘটকের চলচ্চিত্র বাংলার এক অস্থির সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে গভীর সংবেদনশীলতায় ধারণ করেছে। দেশভাগ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তার দৃষ্টিকে রূপ দেয় বাংলার ভাঙা আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের চালচ্চিত্রিক যাত্রায়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি পূর্ববঙ্গের মানুষ। স্বাধীনতার নামে আমার জাতির ওপর যে অজস্র দুর্দশা নেমে এসেছে, আমি তা নিজের চোখে দেখেছি, আর সে সত্যই আমার চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলেছি।’

ঋত্বিকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ও ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২)—চলচ্চিত্র তিনটি কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই ত্রয়ীতে পরিণত হয়, যেখানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও সাংস্কৃতিক সংহতির অনুসন্ধান ঘটে নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে। সিনেমায় ভারতীয়, বাঙালি, ইউরোপীয় ও রুশ শিল্পধারার সংমিশ্রণে গঠিত তার অনন্য মেলোড্রামাটিক শৈলী নির্মাণ করেছে এক নতুন ‘বাংলার স্বপ্নভূমি’—যার কেন্দ্রে রয়েছে নারী।

মেঘে ঢাকা তারা

দেশভাগ-পরবর্তী কলকাতার প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা ‘মেঘে ঢাকা তারা’ এক উদ্বাস্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের টিকে থাকার সংগ্রামের কাহিনী। নীতা ও সীতা, দুই নারীই এখানে আত্মত্যাগের প্রতীক। নীতাকে দেখানো হয়েছে শক্তির প্রতীক দুর্গার আবহে, যার বাড়ির আঙিনা যেন যজ্ঞমণ্ডপ, যেখানে ফুটন্ত ভাতের শব্দ, আগুনের ঝলকানি সবই তার আত্মবলিদানের প্রতিধ্বনি। ঘটক ঘর ও মাতৃভূমিকে নারীত্বের রূপে দেখিয়েছেন, যেখানে নির্বাসন বন্দি করে নারী ও জাতিকে একই শিকলে। নীতা স্নেহময়ী রক্ষক, গীতা কামনার প্রতীক, আর মা নিষ্ঠুরতার রূপ— এ ত্রয়ীতে সমাজের ভাঙন ফুটে ওঠে। শেষ দৃশ্যে পাহাড়ের স্যানাটোরিয়ামে মৃত্যুপথযাত্রী নীতা আকুল হয়ে বলে ওঠে—‘দাদা, আমি বাঁচতে চাই!’ পাহাড়ের প্রতিধ্বনি মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অনন্ত আর্তনাদ, যেখানে নীতা হয়ে ওঠে নিঃশ্বাসরুদ্ধ বাংলা, যে বাঁচতে চায়, কিন্তু পারে না।

14

কোমল গান্ধার

‘কোমল গান্ধার’-এ ঘটক পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে প্রবেশ করেন সমাজের বৃহত্তর পরিসরে। একটি নাট্যদলে, যেখানে শেকড়হীন উদ্বাস্তুরা মঞ্চে গড়ে তোলে তাদের নতুন জীবন। এ দলের প্রাণকেন্দ্রে অনুসূয়া, প্রধান অভিনেত্রী ও সিনেমার আবেগের কেন্দ্র, যিনি শিল্পের আদর্শবাদ ও আবেগের ক্লান্তির মাঝে দোদুল্যমান। নিজেও শরণার্থী হিসেবে অনুসূয়া শিল্প ও সমাজচেতনায় আশ্রয় খোঁজেন। নীতা বা সীতার মতো তিনি মৃত্যুবরণ করেন না; বরং টিকে থাকেন, কিন্তু সে টিকে থাকা বিজয়ের নয়, বিষণ্ন সহিষ্ণুতার। অনুসূয়ার সঙ্গে ভৃগুর সম্পর্ক দুটি বাংলার প্রতীকী মিলন, পুরুষ ও নারী, পশ্চিম ও পূর্ব, আদর্শ ও আপস। তাদের অসম্পূর্ণ ভালোবাসা দেশভাগের অমোচনীয় ক্ষতের প্রতিচ্ছবি। ঘটক তাকে দেখান মহড়ার ঘর, রেলস্টেশন ও অসম্পূর্ণ মঞ্চে, যেন এক অসমাপ্ত দেশ ও অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক। তার মুখে দৃঢ়তা, তবু ক্লান্তি, এ দ্বন্দ্বেই তিনি হয়ে ওঠেন আধুনিক বাঙালি নারী, দেবী বা ভুক্তভোগী নন, বরং এক চিন্তক ও শিল্পী, যিনি ইতিহাসের ভার বহন করেন।

অনুসূয়া হলেন ঘটকের পুনঃসংজ্ঞায়িত নারীত্ব, এক অবক্ষয়িত সমাজে শেষ নৈতিক ও নান্দনিক আশ্রয়, যে কণ্ঠ গান গায় যখন পৃথিবী তার সুর হারিয়েছে।

16

সুবর্ণরেখা

‘সুবর্ণরেখা’ শুরু হয় কলকাতার উপকণ্ঠে উদ্বাস্তু কলোনিতে, যেখানে অনাথ সীতা বড় হয় ভাই ঈশ্বরের তত্ত্বাবধানে। সংগীতের মাধ্যমে ঘটক সীতাকে একসঙ্গে মা ও প্রেমিকা, দেবী সীতা ও রাধার রূপে চিত্রিত করেন। ঈশ্বর হয়ে ওঠেন পিতৃতান্ত্রিক এক পৌরাণিক চরিত্র। চলচ্চিত্রটি পিতৃতন্ত্র ও সমাজের আত্মবিনাশের রূপক হয়ে ওঠে। সুবর্ণরেখার তীরে সীতার কৃষ্ণকীর্তন, তার গানের সুর, আর ঘটকের বিস্তৃত শট নারীত্ব, প্রকৃতি ও মাতৃভূমিকে একসূত্রে বেঁধে ফেলে।

শেষে অভিরামের মৃত্যু ও নির্বাসনের পর, সীতা কলকাতার বস্তিতে ফিরে আসে, যেখানে তার শেষ মুহূর্ত কেবল সংগীত ও নীরবতায় প্রকাশিত। মাতাল ঈশ্বরের অন্ধ আগমন, সীতার আতঙ্ক, আর ফেলিনির La Dolce Vita-র সুর মিলেমিশে তৈরি করে বাংলার সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ রূপক। সীতার মৃত্যু ব্যক্তিগত নয়, বরং এক বিভক্ত বাংলার আত্মহত্যা—নিজ অন্ধত্বে নিমজ্জিত জাতির প্রতীক।

তিতাস একটি নদীর নাম

ঋত্বিক ঘটকের শেষ দিকের শ্রেষ্ঠ রচনা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ তার ক্যামেরা শহর থেকে সরে আসে নদীমাতৃক বাংলার গভীরে, জেলে সম্প্রদায়, মিথ ও স্মৃতির জগতে। এখানে আবির্ভূত হয় বাসন্তী, ঘটকের অন্যতম গভীরতম নারী চরিত্র। তার জীবন তিতাস নদীর জোয়ার ভাটার মতোই অনন্ত ও বেদনাময়। নদীপাড়ের মেয়ে বাসন্তী বিয়ের রাতেই অপহৃত হয়, বহু বছর পর সন্তানসহ ফিরে এসে দেখে তার জগৎ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার যাত্রা পৌরাণিক হলেও রাজনৈতিকও, এক সম্প্রদায়ের বিলুপ্তির কাহিনী। বাসন্তী ‘নদীর কন্যা’, অথচ নদীই শুকিয়ে গেছে, যেন বাংলার ম্লান হয়ে যাওয়া প্রাণশক্তির প্রতীক। তার নীরবতা, মাতৃত্ব, বিলুপ্তি—সবই নদীর মরে যাওয়া স্রোতের মতো। ঘটকের ক্যামেরায় এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য ফুটে ওঠে, বাসন্তী হাঁটছে শুকনো নদীর তলদেশে, তার পা কাদায় ডুবে, শাড়ি মিশে যাচ্ছে মাটির রঙে, নদী যেন তার প্রতিবিম্ব, এক সময়ের উর্বরতা আজ পরিণত হয়েছে শূন্যতায়। ভাটিয়ালি আর বিষণ্ন বাঁশির সুর দুর্গাকে নদীর সঙ্গে একাত্ম করে, তার ট্র্যাজেডিকে রূপ দেয় এক সভ্যতার পতনে।

যদি নীতা হয় শহরের আর্তনাদ, আর সীতা হয় জাতির ক্রন্দন, তবে বাসন্তী সেই নদীর নীরবতা, বাংলার চিরন্তন জননী, যাকে সবাই পরিত্যাগ করেছে, তবু কেউ ভুলতে পারেনি, সে জননীকেই আমরা বারবার দেখি ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায়।