আপনি হয়তো বসে আছেন অফিসের ডেস্কে। বসের ঝাড়ি খেয়ে মন ভালো নেই। বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান, বান্ধবী বা বন্ধুর সঙ্গে সমস্যা। যাকে বলে আপনি একজন ব্যর্থ মানুষ। কিন্তু হতে পারে সেটা কেবল এ পৃথিবীতে। অন্য এক পৃথিবীতে আপনি এর ঠিক বিপরীত। সেখানে আপনিই বস। বিত্তের মালিক। এক সুখী দাম্পত্যের ভাগীদার। এ দুই ইউনিভার্সের দুই ব্যক্তির একজন আরেকজনকে চেনে না, জানে না। ইউনিভার্স কেবল দুটোই হবে, এমনও নয়। হতে পারে ইউনিভার্স আছে অগণিত। এসব ইউনিভার্সে অগণিত আপনি আছেন এবং প্রতিটা ভার্সে আপনার আছে একটা স্বতন্ত্র গল্প। সহজ করে বললে এটাই মাল্টিভার্সের থিয়োরি। বিষয়টি নিয়েই তৈরি হয়েছে ‘‌এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স’।

সিনেমা শুরু হয় এভলিনকে দিয়ে। সে একটি লন্ড্রি শপের মালিক। সে নয়, বলা চলে তার পরিবার। এ শপের সঙ্গেই তাদের বাসা। সেখানে এভলিনের মেয়ে একদিন তার বান্ধবীকে নিয়ে আসে আর আমরা টের পাই জয়কে (এভলিনের মেয়ে) নিয়ে এ পরিবারে একটি সমস্যা আছে। পরে জানা যায়, সমস্যা কেবল আধুনিক সময়ের সঙ্গে জয়কে নিয়েই নয়, পরিবারটি করজনিত সমস্যায়ও কিছুটা ভুগছে। সেটি নিয়ে কনসালেট্যান্টের সঙ্গে আলাপ পর্ব থেকে এ সিনেমা মূল গল্পে ঢুকতে শুরু করে। আর সেখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে এভলিনের স্বামী ওয়েমন্ড। তার মাধ্যমেই এভলিন মাল্টিভার্সে প্রবেশ করে। এলিভেটর থেকে একটি ওয়্যারলেস ডিভাইসের মাধ্যমে এ যাত্রা হয়।

এ সিনেমার তিনটি অংশ—এভরিথিং, এভরিহোয়্যার ও অল অ্যাট ওয়ান্স। সিনেমায় আমরা দেখি, কোনো একটি অপশক্তি একটি ব্ল্যাক হোলের মতো কোনো ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তার কারণ হিসেবে সিনেমা আমাদের ফিরিয়ে নেয় জয়ের কাছে। তার ডিপ্রেশন থেকেই এর শুরু। মূলত যে দুনিয়া থেকে গল্প শুরু হয়, তাতে নয় বরং অন্য এক ভার্সের জয় এ কাজগুলো করে। এভলিন যখন বিষয়টি বুঝতে পারে, তখন জয়কে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে লাভ হয় না। ব্যাপারটা অনেকটা ‘‌যা শুরু হয়েছে তা থামানোর সাধ্য কারো নেই’ ধরনের একটা ব্যাপার। ওয়েমন্ডের সঙ্গে মিলে এভলিন চেষ্টা করে সমস্যাটার সমাধান করতে। কিন্তু তা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

মাল্টিভার্স নিয়ে মার্ভেল অনেক সিনেমা বানিয়েছে। এর মধ্যে ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস সবচেয়ে এগিয়ে আছে বলা যায়। এ সিনেমায় ভিন্ন ইউনিভার্সে ভিন্ন স্ট্রেঞ্জ ও অন্য ব্যক্তিদের ভিন্ন গল্প দেখা যায়। এছাড়া আরো সিনেমা হয়েছে মাল্টিভার্স নিয়ে। কথা হচ্ছে এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স কোথায় ভিন্ন। সত্যি বলতে মূল জায়গায় ভিন্নতা তেমন নেই। তবে ভিন্নতা আছে উপস্থাপনে। মার্ভেলে দেখা যায়, ইউনিভার্সের ওপর কোনো হুমকি আসছে এবং সেটি মোকাবেলা করছে সুপারহিরোরা। মোকাবেলার ধাপগুলো খুব সিরিয়াসভাবে পার করা হয়। কিন্তু এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্সের যাত্রা কমিক। দ্বন্দ্ব, মোকাবেলা, খল চরিত্রের ব্যবহারে সব জায়াগায়ই আছে কমেডি।

সিনেমাটিতে এভলিন চরিত্রে মিশেল ইয়ো, ওয়েমন্ড চরিত্রে কে হুয়ে কুন, জয় চরিত্রে স্টেফানি সু ও দিদ্রে বিউবুদ্রে চরিত্রে জেমি লি কার্টিস অভিনয় করেছেন। সিনেমাটির পরিচালনায় ছিলেন ড্যানিয়েল ব্রাদার্স (ড্যানিয়েল কোয়ান ও ড্যানিয়েল শেইনার্ট)। এ সিনেমায় বিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশনের ব্যবহার ততটা হয়নি। সে তুলনায় এসেছে কমেডি। আর আছে অ্যাকশন, যা ব্রুস লি, জ্যাকি চ্যানের সিনেমার ঘরানার। মানে এখনকার সিনেমায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সুপারহিরো ঘরানার অ্যাকশন ব্যবহৃত হয়। এ সিনেমায় তা হয়নি। এর কারণ মূলত এভলিনের জাতি পরিচয়। সে মার্শাল আর্টেই অভ্যস্ত। যদিও প্রাথমিক ইউনিভার্সের এভলিন কেবলই একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু অন্যান্য ইউনিভার্সের অনেক এভলিন নানা কাজে সমর্থ।

এ সিনেমায় দর্শকের অন্যতম পছন্দের জায়গা হতে পারে অ্যাকশন সিকোয়েন্সগুলো। বেশ সুন্দর কোরিওগ্রাফিতে করা হয়েছে এগুলো। এর বাইরে অ্যাকশনের মধ্যে কমেডি মনে করিয়ে দেবে কিছু ক্ল্যাসিক সিনেমার কথা। নানা ইউনিভার্সের ভিন্ন ভিন্ন এভলিনের উপস্থাপনা দর্শকের ভালো লাগতে পারে। তবে সিনেমাটিতে সত্যিকার অর্থে নতুন কিছু নেই। অভিনয়ের দিক থেকে মিশেল ইয়ো ও কে হুয়ে কুন নিজেদের সবটা দিয়েছেন। দুর্দান্ত ছিলেন জেমি লি কার্টিসও। সেসব মিলিয়ে সিনেমাটি উপভোগ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু যে থিমের ওপর সিনেমাটি নির্মাণ হয়েছে, তার তুলনায় এগিয়ে থাকা বহু সিনেমা এর মধ্যেই তৈরি হয়েছে। মিশেল ইয়ো সেরা অভিনেত্রী হতেই পারেন, তবে উপভোগ্য হলেও অস্কারে সেরা সিনেমা হিসেবে একে মানা একটু মুশকিল।