১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের গল্প কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দুকের গর্জনেই লেখা হয়নি; এ গল্প রঙিন হয়ে আছে রেডিও তরঙ্গের ফিসফিসে, গোপন সম্প্রচারের আওয়াজে এবং এক টেলিভিশন পর্দার সাহসী ঝলকে, যা নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়েছিল। সে ভয়ের ও আশার মুহূর্তগুলোয় রেডিও ও টেলিভিশন শুধু সংবাদমাধ্যম নয়; হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর এবং জাতির আলোকপ্রদীপ।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর
১৯৭১ সালের প্রথম দিকে যখন স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র রূপ নিল, তখন পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অনুভব করেছিলেন যে সময়ের ধারা বদলাচ্ছে। ৪ মার্চ ১৯৭১, যেদিন আন্দোলন চূড়ান্তে পৌঁছে গিয়েছিল, সে সময়ের রাষ্ট্র পরিচালিত রেডিও, ‘রেডিও পাকিস্তান’-এর ঢাকা স্টেশনকে ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’ হিসেবে পুনর্নামকরণ করা হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালিত টেলিভিশনকে একযোগে ‘ঢাকা টেলিভিশন’ নাম দেয়া হয়। রেডিও ও টেলিভিশনের শিল্পীরা ঘোষণা করেন, তারা আর পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য কোনো অনুষ্ঠান তৈরি করবেন না। এ সাহসী পদক্ষেপ ছিল স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতার প্রতীক। ওইদিন রেডিও স্টেশনটি প্রচলিত পাকিস্তানি অনুষ্ঠানগুলো বাদ দিয়ে বাঙালি দেশাত্মবোধক গান সম্প্রচার করল, যা স্পষ্ট একটি রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছিল।
কিন্তু প্রতিবাদের এ শক্তিকে দ্রুত দুমড়ে ফেলার পরিকল্পনা তৈরি হলো। ২৫-২৬ মার্চ রাতে ভয়াবহ অপারেশন সার্চলাইটের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকার গণমাধ্যম কেন্দ্রগুলো দখল করে নিল। পশ্চিম পাকিস্তান চেয়েছিল বাঙালি কণ্ঠকে চুপ করাতে। কিন্তু সে মুহূর্তে কিছু সাহসী রেডিও প্রকৌশলী, শিল্পী ও কর্মী সিদ্ধান্ত নেন তারা অস্ত্র নয়; শব্দ, গান এবং অদম্য মানসিক শক্তির মাধ্যমে প্রতিরোধ করবেন।
এভাবেই ২৬ মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রামের কালুরঘাটে একটি দোতলা ভবনে গোপন রেডিও কেন্দ্র, ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ (এসবিবিকে) প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি ছোট ১০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার এবং অটল সাহস নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা দলের মধ্যে ছিলেন ড. সৈয়দ আনোয়ার আলী, প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম ও প্রকৌশলী দিলীপ চন্দ্র দাস। তারা সেদিন যে সম্প্রচার করলেন, তা চিরদিনের জন্য ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে গেল। আর তা হলো ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে আমি মেজর জিয়া বলছি।’
স্বাধীনতার এ ঘোষণা বাঙালির মধ্যে আশার মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এ বার্তা বঙ্গোপসাগরে জাপানি একটি জাহাজে পৌঁছায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। সেখান থেকেই এসবিবিকে হয়ে ওঠে ‘স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর।’
পরবর্তী মাসগুলোয় যখন কালুরঘাটের প্রাথমিক ট্রান্সমিটার ৩০ মার্চ বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়, রেডিও সম্প্রচারকারীরা চুপ থাকলেন না। ৩ এপ্রিল ১৯৭১ তারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন রামগড়ে (বান্দরবান অঞ্চল)। এরপর তারা ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় চলে যান এবং সেখান থেকে এপ্রিল-মে ১৯৭১-এর মধ্যে সম্প্রচার অব্যাহত রাখেন। ২৫ মে ১৯৭১ তারা পুনরায় স্থানান্তর হন ভারতের কলকাতায়, বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি বাড়িতে এবং সেখান থেকে যুদ্ধের শেষদিন পর্যন্ত সম্প্রচার চালিয়ে যান।
এসবিবিকে যুদ্ধের খবর সম্প্রচার থেকে শুরু করে ভারপ্রাপ্ত সরকারের বার্তা পৌঁছে দিত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশনা পাঠাত। তার চেয়েও বেশি এটি সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিরোধের কাজ করত। দেশাত্মবোধক গান, শ্রুতিনাট্য, ব্যঙ্গধর্মী মন্তব্য ও উদ্বুদ্ধকারী অনুষ্ঠান পরিচালনা করত। গ্রাম, শহর, শরণার্থী শিবির, যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত এলাকায় থাকা অসংখ্য বাঙালির জন্য এ সম্প্রচার হয়ে উঠল তাদের আশা ও একতার প্রতীক।
‘চরমপত্র’ নামক একটি অনুষ্ঠান লেখক-সাংবাদিক এমআর আখতার মুকুলের কণ্ঠে ১৯৭১ সালের মে-ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১৭টি পর্বে সম্প্রচার হয়। এ অনুষ্ঠান ব্যঙ্গ, বাস্তবতা ও সত্যের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসককে অবমাননা করত, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করত এবং মানসিক শক্তির জোগান দিত।
অনেক মুক্তিযোদ্ধার জন্য ভোর বা সন্ধ্যায় রেডিও শোনা মানে ছিল জীবনের আশ্রয়। স্বদেশীদের কণ্ঠ, গান, সংবাদ তাদের সাহস এবং একতা বজায় রাখত।
এভাবে নয় মাসের যুদ্ধকালে এসবিবিকে হয়ে উঠল ‘দ্বিতীয় যুদ্ধক্ষেত্র।’ যখন গুলি বোমার মতো ছুটছিল, রেডিও তরঙ্গ সোনালি বাংলার ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে একত্রিত করছিল। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয়ের সঙ্গে স্টেশনটির আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ বেতার’ হিসেবে নামকরণ করা হয়। আজ আধুনিকতার ঝলকানিতে ‘বাংলাদেশ বেতার’ কিছুটা ফিকে হয়েছে বটে, তবে মুক্তিযুদ্ধে এর অবদান ভোলার নয়।
পরাধীন ‘ঢাকা টেলিভিশন’ থেকে স্বাধীন ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’
পূর্ব পাকিস্তানে টেলিভিশন চালু হওয়ার ইতিহাসটা গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪ সালে ঢাকায় টেলিভিশনের প্রথম পরীক্ষামূলক সম্প্রচার করা হয়। প্রথম সম্প্রচারে গায়িকা ছিলেন ফেরদৌসী রহমান। ধীরে ধীরে এটি পাকিস্তানি জাতীয় নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচারের এক প্রাথমিক উদাহরণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু ১৯৭১ সালের সংকটের দিনে টেলিভিশন কর্মীরা এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। ৪ মার্চ ১৯৭১ স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঢাকার টেলিভিশন কেন্দ্রকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ঢাকা টেলিভিশন’ নামকরণ করা হয় এবং শিল্পীরা পশ্চিম পাকিস্তানের সব অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ করে দেন।
তারপর ২৩ মার্চ ১৯৭১, স্বাধীনতার ঘোষণার ঠিক আগে আগে স্টেশনটি পাকিস্তানি পতাকা ও জাতীয় সংগীতের পরিবর্তে সম্প্রচার করল বাংলাদেশের পতাকা এবং বাংলা গান। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের হুমকি থাকা সত্ত্বেও তারা সম্প্রচার চালিয়ে গেল, সাহসের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
টেলিভিশনের সম্প্রচার সামগ্রিকভাবে সীমিত থাকায় গ্রামাঞ্চলের চেয়ে এটি শহুরে দর্শকের কাছে শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা পৌঁছে দিতে শুরু করল। কিন্তু যুদ্ধের প্রারম্ভ, মিডিয়া কেন্দ্রের দখল ও সংঘর্ষের ভয়াবহ বাস্তবতা ঢাকা টেলিভিশনকে দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রচারে স্থায়ী হতে দেয়নি। ২৬ মার্চ ১৯৭১-এর মধ্যে ঢাকার ‘ডিআইটি’ ভবন পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর দখলে চলে যায়। ফলে যুদ্ধের সময় টেলিভিশনের ভূমিকা রেডিওর গতিশীলতার কাছে ম্লান হয়ে যায়। তবু সে প্রতীকী সাহসিকতার স্মৃতি, উত্থাপিত পতাকা ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থেকে যায়, যা আজও আমাদের জাতীয় আত্মচেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
বিজয়ের পরে ঢাকা টেলিভিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’ (বিটিভি) নামে পরিচিত হয়। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ প্রথমবারের মতো পর্দায় বিটিভি নামটি দেখা যায়।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয় কেবল ময়দানের যুদ্ধই নয়, এক ভিন্ন যুদ্ধও সমাপ্ত হয়েছিল, শব্দ, তরঙ্গ, সাংস্কৃতিক শক্তির যুদ্ধ। যারা রেডিওকে বাঁচানোর জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, যারা পশ্চিম পাকিস্তানের অনুষ্ঠান বাজাতে অস্বীকার করেছিলেন, যারা বিশ্বাস করেছিলেন যে গান ও শব্দ স্বাধীনতা বহন করতে পারে, তাদের অবদান বাংলাদেশীরা ভুলবে না।










