১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির ছোট শহর গিউলায় জন্ম নেন লাজলো ক্রাজনাহোরকাই। তার উপন্যাসগুলো যেন এক দীর্ঘশ্বাসের মতো। বিরতি নেই, আশ্রয় নেই, কেবল বয়ে চলা চেতনার ভার। তিনি লেখেন ধ্বংসপ্রায় জনপদের কথা, কাদায় ডুবে থাকা গ্রাম, হতাশায় মত্ত মানুষ আর অনন্ত প্রতীক্ষার। এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন হাঙ্গেরিয়ান এ লেখক। তার সাহিত্য কেবল বইয়ের পাতায়ই সীমাবদ্ধ থাকেনি, কল্পনার সেসব চরিত্র বাস্তবে উঠে এসেছে সিনেমার মধ্য দিয়ে। তার লেখার অনন্য ভঙ্গিতে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক সিনেমার ভাষা, যে সিনেমা গতি নয়, সময়কে দেখায়।
শ্যাতানতাঙ্গো (উপন্যাস ১৯৮৫, চলচ্চিত্র ১৯৯৪)
১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘শ্যাতানতাঙ্গো’ ক্রাজনাহোরকাইকে রাতারাতি সাহিত্য জগতের এক তারকা করে তোলে। গল্পটি হাঙ্গেরির এক নির্জন গ্রাম নিয়ে। সেখানে জরাজীর্ণ কিছু মানুষ অপেক্ষা করে এক মানুষের জন্য—ইরিমিয়াস, যাকে তারা মৃত ভেবেছিল। সে ফিরেও আসে, কিন্তু মুক্তিদাতা হিসেবে নয়; আসে এক ধূর্ত ছলনাবাজ রূপে।

উপন্যাসটি লেখা হয়েছে বারো অধ্যায়ে, যেখানে দেখানো হয়েছে মানব জীবনের উত্থান-পতন। হাঙ্গেরিয়ান চলচ্চিত্রকার বেলা তার এ বইয়ে খুঁজে পান এক নান্দনিক সত্যের উৎস, কীভাবে সময়কে দৃশ্যমান করা যায়। কাজেই তিনি ও ক্রাজনাহোরকাই একসঙ্গে মিলে তৈরি করলেন এ অদ্ভুত সিনেমা, ৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের দীর্ঘ এক কালো-সাদা মহাকাব্য। সিনেমার মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিহাই ভিগ, পুটায়ে হোরভাথ, লাজলো ফেউগসিসহ আরো অনেক হাঙ্গেরিয়ান অভিনেতারা।
এ চলচ্চিত্র আসলে কোনো ‘রূপান্তর’ নয়, বরং এক রূপান্তরিত ভাষা। ক্রাজনাহোরকাইয়ের দীর্ঘ বাক্য শব্দ হয়ে ওঠে তারের দীর্ঘ ‘শট’-এর ভেতর। যে শব্দের ছন্দ বইয়ে ছিল, তা রূপ পেল ক্যামেরার গতি ও স্থিরতায়।
দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স (উপন্যাস ১৯৮৯, চলচ্চিত্র ২০০০)
শ্যাতানতাঙ্গো ছিল ধ্বংসের কাহিনী। কিন্তু ‘মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স’ হলো বিশৃঙ্খলার বিস্ফোরণ। ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের পতনের ঠিক আগে ক্রাজনাহোরকাই লেখেন এক ভয়ানক রূপক। এক শহরে আসে এক ভ্রাম্যমাণ সার্কাস, সঙ্গে এক বিশাল মৃত তিমি, সেই সঙ্গে এক রহস্যময় মানুষ—দ্য প্রিন্স।

তাদের আগমনেই শহরে শুরু হয় ভয়, গুজব ও উন্মাদনা। কেউ ক্ষমতা চায়, কেউ মুক্তি আর সাধারণ মানুষ নেমে পড়ে ধ্বংসের উন্মাদনায়। এ যেন সভ্যতার ভেতরকার জনতার অন্ধ উল্লাসের গল্প। ২০০০ সালে বেলা তার উপন্যাসটিকে সিনেমা করে নাম দিলেন ‘রেকমিস্টার হারমোনিস’, এক ধরনের দৃশ্যমান সংগীত। এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন লারস রুডলফ, পিটার ফিটজ, হানা শিগুলাসহ আরো অনেক জার্মান অভিনেতা। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বেশির ভাগই জার্মানি হওয়ায় তাদের সংলাপকে হাঙ্গেরি ভাষায় পরবর্তী সময়ে ডাবিং করা হয়েছিল।
সিনেমার প্রথম দৃশ্যে নিরীহ ডাকপিয়ন ভালুস্কা মাতাল কিছু লোক নিয়ে বারের মধ্যে মহাজাগতিক নাচে মত্ত থাকে। কবিতার মতো দৃশ্যের মধ্য দিয়েই শুরু হয় এক নীরব প্রলয়, যেখানে শহর ধীরে ধীরে উন্মাদনার গহ্বরে ডুবে যায়। এখানে ক্রাজনাহোরকাইয়ের দার্শনিক বিষণ্নতা পরিণত হয়েছে তারের দৃশ্যভাষায়, প্রতিটি ফ্রেম যেন তার অন্তহীন বাক্যেরই প্রতিধ্বনি। বেলা তার একবার বলেছিলেন, ‘ক্রাজনাহোরকাইয়ের উপন্যাসে সিনেমা আগেই লুকিয়ে থাকে, শুধু সেটা খুঁজে বের করতে হয়।’

ক্রাজনাহোরকাই লেখেন, যেন একটানা ক্যামেরা চালানোর মতো—কাট নেই, থামা নেই। তার সিনেমায়ও রাখেন একই দর্শন। এক শটে, এক নিশ্বাসে, সময়ের ভেতর হারিয়ে যাওয়া। দুজনই বিশ্বাস করেন, সত্যকে দেখা যায় না মুহূর্তে, দেখা যায় কেবল স্থায়িত্বের ভেতর।
তাদের যৌথ কাজ শুধু ‘অ্যাডাপটেশন’ নয়, এটি হয়ে উঠেছিল এক নতুন শিল্প আন্দোলন যা ‘স্লো সিনেমা’ নামে আখ্যায়িত হয়েছে। যেখানে দর্শককে তাড়াহুড়ো নয়, অপেক্ষা করতে হয়; অনুভব করতে হয় সময়ের। আজকের পৃথিবী যেখানে গতি, শব্দ ও পর্দার ঝলকেই সব মাপা হয়, সেখানে শ্যাতানতাঙ্গো ও রেকমিস্টার হারমোনিস আমাদের শেখায় বিপরীত জিনিস—ধৈর্য, মনোযোগ, স্থিরতা। আরো শেখায়, সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে হতাশার মধ্যেও, অর্থ লুকিয়ে আছে নীরবতার ভেতর। ক্রাজনাহোরকাইয়ের কাছে শিল্প মানে প্রতিরোধ—সবকিছু ভেঙে পড়লেও যা কিছু স্থায়ী থাকে, তা হলো মানব অভিজ্ঞতার সত্য। বেলা তার সে সত্যকে পর্দায় রূপ দিয়েছেন সময়ের দীর্ঘতম, নীরবতম দৃষ্টিতে।










