একজন কিশোর টিউশনের টাকা জমিয়ে কিনেছে শখের ডিভিডি। কৈশোর থেকে তারুণ্যের যাত্রায় পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছেন অসংখ্য ডিভিডি। সেসব ডিভিডিতে রয়েছে দেশ-বিদেশের নির্মাতাদের নির্মিত চলচ্চিত্র। সেখান থেকেই দৃঢ় হয়েছে তার গল্পকার ও নির্মাতা হওয়ার সংকল্প। তাই পরম যত্নে ডিভিডিগুলোকে আগলে রেখেছেন প্রায় ২৫ বছর। 

তারপর? তারপর স্থান সংকুলান আর ডিভিডি প্লেয়ারের অভাবে একদিন সেই সমস্ত ডিভিডি তুলে দিতে হয়েছে ভাঙারির হাতে! হয়তো ছলছল চোখেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘দাড়িপাল্লা কি জানে কারা উঠেছে আজ নিলামে? সাধ্য আছে মাপার?’ 

বলছিলাম তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা আশফাক নিপুনের কথা। সম্প্রতি বাসা পরিবর্তনের সময় নিজস্ব সংগ্রহের প্রায় হাজার খানেক ডিভিডি তিনি তুলে দিয়েছেন ভাঙারির হাতে। তার সঙ্গে সে-সংক্রান্ত কথোপকথনে উঠে এসেছে নির্মাতা আশফাক নিপুনের জীবনের কতটা অংশজুড়ে মিশে ছিল ডিভিডি, সে কথা। 

চট্টগ্রামের বেড়ে ওঠা আশফাক নিপুন ডিভিডি নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ‌যখন তিনি ডিভিডি কেনা শুরু করেন, তখন চট্টগ্রামে ২৫ টাকায় ডিভিডি কিনতে পাওয়া যেত। মূলত তখন থেকেই তার মাথায় চেপে বসে সিনেমার পোকা। টিউশনের টাকা জমিয়ে একের পর এক কিনে গেছেন পৃথিবীর সেরা সব নির্মাতার চলচ্চিত্র। ঢাকা থেকে অর্ডার করে চট্টগ্রামে ডিভিডি আনাতেন তিনি। এর পরও দেশে, দেশের বাইরে যখন যেখানে গেছেন, খুঁজে বেড়িয়েছেন একটা ডিভিডি স্টোর। 

ডিভিডি নিয়ে পাগলামোর অসংখ্য গল্প আছে আশফাক নিপুনের ঝুলিতে। তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপ ট্রিপে গিয়ে সুইডেনের স্টকহোমে গিয়েছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো অডিও ভিজুয়াল স্টোরে। সেখান থেকেও প্রচুর ডিভিডি কিনেছিলাম।’ এমনকি একটা সময় পর্যন্ত কেউ দেশের বাইরে গেলেও তাকে অনুরোধ করেছেন পছন্দের কোনো চলচ্চিত্রের ডিভিডি নিয়ে আসতে। তার এ অনুরোধের অত্যাচার থেকে রেহাই পাননি সহধর্মিণী এলিটা করিমও। যদিও তখন তারা ছিলেন শুধুই বন্ধু। 

ডিভিডিতে প্রথম দেখা সিনেমার নাম জানতে চেয়েছিলাম। উত্তরে নির্মাতার নামসহ স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন, ম্যাক্সিকান চলচ্চিত্রকার ইনারিত্তুর প্রথম চলচ্চিত্র ‘‌আমেরোস পেরস’। আশফাক নিপুন বলেন, ‘আমার মনে আছে সিনেমাটা ডিভিডিতে আমি দেখেছিলাম ২০০১ সালে। মুক্তির এক বছর পর।’ তখনো তার নাম খুব একটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি। তবে পরবর্তী সময়ে দুবার অস্কার পেয়েছিলেন এ চলচ্চিত্র নির্মাতা। 

নব্বই দশকের শেষের দিকে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া ডিভিডি প্রযুক্তি খুব অল্প কয়েকটা বছরই টিকে ছিল। যেভাবে স্রোতের মতো এসেছিল, সেভাবে হুট করেই যেন হারিয়ে গেল। এ অভিজ্ঞতাকে আশফাক নিপুন দেখেন জাদুর মতো। তার দৃঢ় বিশ্বাস, নির্মাতা হওয়ার ব্যাপারটা ভাগ্যে ছিল বলেই যখন চলচ্চিত্রের নেশা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, ঠিক তখনই ডিভিডির জোয়ার এসেছিল দেশে। ডিভিডির স্তূপ করে রাখা ঘরে মায়ের বকাবাদ্য শুনতে শুনতে আর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র দেখতে দেখতে ধীর পায়ে নির্মাতা হওয়ার লক্ষ্যেই এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। 

একটু আক্ষেপের সুরেই প্রশ্ন করেছিলাম, এত সাধের ডিভিডিগুলো কেন হাতছাড়া করলেন? উত্তরে দ্বিগুণ আক্ষেপে ভেসে এসেছিল দীর্ঘশ্বাস! আশফাক নিপুন বলেন, ‘এখন তো ডিভিডি প্লেয়ারই নেই। সে জায়গা দখল করে নিয়েছে নানা অনলাইন লিংক।’ তাই কষ্ট হলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে কেনা একেকটি ডিভিডির মায়া ত্যাগ করেছেন তিনি। 

বিশ্বের বড় বড় নির্মাতাদের চলচ্চিত্র ডিভিডিতেই দেখেছেন আশফাক নিপুন। তাদের চলচ্চিত্র দেখে শিখেছেন কীভাবে সময়ের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে হয়েছে চলচ্চিত্রের ভাষা। আগ্রহী হয়েছেন নির্মাণে। 

টাকা জমিয়ে, মায়ের শাসন এড়িয়ে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘেঁটে সংগ্রহ করা একেকটি ডিভিডির স্মৃতি তাই কখনই মুছে ফেলা সম্ভব নয় আশফাক নিপুনের জীবন থেকে। তাই দাড়িপাল্লা জানে, ডিভিডির একেকটি প্লেট হয়তো দাড়িপাল্লায় উঠেছে সেদিন, কিন্তু ডিভিডিগুলো নির্মাতা আশফাক নিপুনের জীবনে যে অবদান রেখেছে তা দাড়িপাল্লায় ওজন করার বাটখারা পৃথিবীতে নেই।