বিহারীলাল চক্রবর্তী
কোন
সম্ভ্রান্ত সীমন্তিনী
আমার ‘সারদামঙ্গল’
পাঠে সন্তুষ্ট
হইয়া চারি
মাস যাবৎ
স্বহস্তে বুনিয়া
একখানি উত্কৃষ্ট
আসন আমাকে
উপহার দেন।
এই আসনের
নাম—‘সাধের
আসন’।
‘সাধের
আসনে’ অতি
সুন্দর সুন্দর
অক্ষর বুনিয়া
‘সারদামঙ্গল’
হইতে এই
শ্লোকার্থ উদ্ধৃত
করা হইয়াছে,—
“হে
যোগেন্দ্র! যোগাসনে
ঢুলুঢুল
দু-নয়নে
বিভোর
বিহ্বল মনে
কাঁহারে ধেয়াও?”
প্রদানকালে
আসনদাত্রী উদ্ধৃত
শ্লোকার্থের উত্তর
চাহেন। আমি
উত্তর লিখিব
বলিয়া প্রতিশ্রুত
হইয়া আসি
এবং বাটীতে
আসিয়া তিনটি
শ্লোক লিখি।
কিছুদিন গত
হইলে উত্তর
লিখিবার কথা
একপ্রকার ভুলিয়া
গিয়াছিলাম। এই
আসনদাত্রী দেবী
এখন জীবিত
নাই। তাঁহার
মৃত্যুর পরে
উত্তর সাঙ্গ
হইয়াছে। এই
ক্ষুদ্র খণ্ডকাব্যের
উপহূত আসনের
নামে নাম
রহিল—‘সাধের
আসন’।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘...মেজদাদা
(সত্যেন্দ্রনাথ) বিলাত
হইতে ফিরিয়া
আমাদের পরিবারে
যখন আমূল
পরিবর্তনের বন্যা
বহাইয়া দিলেন,
তখন আমারও
মতের পরিবর্তন
ঘটিয়াছিল। তখন
হইতে আর
আমি অবরোধপ্রথার
বিরোধী নহি,
বরং ক্রমে
ক্রমে একজন
সেরা নব্যপন্থী
হইয়া উঠিলাম।
ইহারই কিছুদিন
পূর্বে স্ত্রীস্বাধীনতার
উপর কটাক্ষপাত
করিয়া আমি
“কিঞ্চিৎ
জলযোগ” লিখিয়াছিলাম
বলিয়া, অত্যন্ত
দুঃখিত ও
অনুতপ্ত হইয়াছিলাম।
সেইজন্য “কিঞ্চিৎ
জলযোগের” দ্বিতীয়
সংস্করণ আমি
আর ছাপাই
নাই।
স্ত্রীস্বাধীনতার
শেষে আমি
এত বড়
পক্ষপাতী হইয়া
পড়িলাম যে
গঙ্গার ধারের
কোনো বাগানবাড়ীতে
সস্ত্রীক অবস্থানকালে
আমার স্ত্রীকে
আমি নিজেই
অশ্বারোহণ পর্যন্ত
শিখাইতাম। তাহার
পর জোড়াসাঁকো
বাড়ীতে আসিয়া,
দুইটি আরব
ঘোড়ায় দুইজনে
পাশাপাশি চড়িয়া
বাড়ী হইতে
গড়ের মাঠ
পর্যন্ত প্রত্যহ
বেড়াইতে যাইতাম।
ময়দানে পৌঁছিয়া
দুইজনে সবেগে
ঘোড়া ছুটাইতাম।
প্রতিবাসীরা স্তম্ভিত
হইয়া গালে
হাত দিত।
রাস্তার লোকেরা
কৌতূহলে ও
বিস্ময়ে মুখব্যাদান
করিয়া চাহিয়া,
হতভম্ব হইয়া
থাকিত। দারোয়ানেরা
আমাদের পানে
অবাক্ হইয়া
চাহিয়া থাকিত।
সে সব
দিকে আমার
ভ্রুক্ষেপও ছিল
না। আমি
তখন উদ্দাম
নব্যভাবের নেশায়
উন্মত্ত! এইরূপে
অন্তঃপুরের পর্দা
ত উঠাইলামই,
সঙ্গে সঙ্গে
আমার চোখের
পর্দাটিও একেবারে
উঠিয়া গেল!’
শরত্কুমারী চৌধুরানী
‘...ফুলের
তোড়ার ফুলগুলিই
সবাই দেখিতে
পায়, যে
বাঁধনে তাহা
বাঁধা থাকে
তাহার অস্তিত্বও
কেহ জানিতে
পারে না।
মহর্ষি পরিবারের
গৃহলক্ষ্মী শ্রীযুক্ত
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের
পত্নী ছিলেন
এই বাঁধন।
বাঁধন যখন
ছিঁড়িল ভারতীর
সেবকরা আর
ফুল তোলেন
না, মালা
গাঁথেন না,
ভারতী ধূলায়
মলিন!...’
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘...সন্ধ্যেয়
বসত জ্যোতিকাকামশাইয়ের
বৈঠক। এ
বৈঠকের চেহারা
ছিল আর
এক রকম;
সেখানে আসতেন
তারক পালিত,
ছোট অক্ষয়বাবু,
কবি বিহারীলাল।
রবিকা বয়সে
ছোট হ’লেও
এই বৈঠকেই
যোগ দিতেন।
এখানে মেয়েদেরও
প্রবেশাধিকার ছিল।
নতুন কাকিমা
অর্থাৎ জ্যোতিকার
স্ত্রী ছিলেন
এই বৈঠকের
কর্ত্রী। এখানে
চলত গান,
বাজনা, কবিতার
পর কবিতা
পাঠ।’
ইন্দিরা দেবী
চৌধুরানী
স্বর্ণপিসিমার
গীতিনাট্য ‘বসন্ত-উৎসবে’র
(প্রথম প্রকাশ
১৮৭৯) সঙ্গেও
আমাদের ছেলেবেলার
স্মৃতি জড়িত।
তার গোড়ার
দিকের গান
‘ধর্
লো ধর্
লো ডালা,
এই নে
কামিনীফুল’ এখনো
কানে বাজে।
অন্য
গানগুলিও কতক
কতক মনে
আছে—
লীলা।
চন্দ্রশূন্য তারাশূন্য
মেঘান্ধ নিশীথ
চেয়ে
দূরভেদ্য
অন্ধকারে হূদয়
রয়েছে ছেয়ে।...
ঢালা
বাগেশ্রী রাগিণীতে
এই শোকসংগীত
নতুন কাকিমা
বসে গাইছেন,
তার বড়ো
বড়ো চোখ
আর দীর্ঘ
ঘন কেশ
ছিল বলে
তাঁকে বেশ
মানিয়েছিল। জ্যোতিকাকা
আর রবিকাকা
দুজনে মিলে
টিনের তলোয়ার
নিয়ে এই
গানটি গেয়ে
যুদ্ধ করেছিলেন—
কিরণ।
লও এই
লও, লও
প্রতিফল।
কুমার।
দেখিব বীরত্ব
তোর থাকে
কি অটল।
কিরণ।
মূঢ় হ
রে সাবধান!
কুমার।
এ অমোঘ
সন্ধান।
কিরণ।
এ আঘাতে
অবশ্যই বধিব
পরান।
[সুব্রত রুদ্রের ‘কাদম্বরী দেবী’ জীবনী গ্রন্থ থেকে সংকলিত]





