সুফিবাদের পীঠস্থান ইয়েমেন আর বাংলায় ইসলাম প্রসারের প্রাথমিক পর্যায়ে ভূমিকা রেখেছেন সুফিরা। স্বাভাবিকভাবেই ইয়েমেন থেকে আগত সুফি নেহাত কম নয়। বাংলায় আসা এ সুফিদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন পীর ইয়েমেনি। শাহজালাল (র.)-এর সঙ্গে তিনি বাংলায় আগমন করেন। পীর ইয়েমেনি নামে পরিচিত হলেও তার প্রকৃত নাম শেখ মালেক। তিনি চৌদ্দ শতকে ইয়েমেন থেকে দিল্লি হয়ে বাংলায় আসেন। দিল্লিতে হজরত নিজামউদ্দীন আউলিয়ার (র.) দরবারে হজরত শাহজালাল (র.)-এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। হজরত শাহজালালের সঙ্গে তিনি সিলেট বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন। সিলেট বিজয়ের পর শাহজালাল তাকে ইসলাম প্রচারের জন্য ঢাকায় পাঠান। তিনি তার শিষ্য শাহ বলখীকে নিয়ে বর্তমান সচিবালয়ের সন্নিকটস্থ স্থানে একটি খানকাহ স্থাপন করেন। ইসলাম প্রচারে তারা সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। পীর ইয়েমেনির মৃত্যুর সঠিক তারিখ জানা যায়নি। তার কবরের ওপর একটি সমাধিসৌধ এবং নিকটেই একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। দুটি ইমারতই উসমানি উদ্যানের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত।

ইয়েমেন থেকে বাংলায় আসা সবচেয়ে পরিচিত নাম শাহজালাল (র.)। বাংলা ও বিশেষ করে সিলেটের ইতিহাসের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে তার নাম। মাতৃভূমি ইয়েমেন থেকে তিনি ধর্মপ্রচারের জন্য সিলেটে এসে থিতু হন। কিংবদন্তি অনুসারে, গৌর গোবিন্দ নামে এক হিন্দু রাজা সিলেট অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। তারই এক প্রজা বুরহানুদ্দীন পুত্রের আকিকা উপলক্ষে একটি গরু জবাই করেছিল। একে ঘোরতর অপরাধ বিবেচনা করে রাজার আদেশে শিশুটিকে হত্যা করা হয় ও বুরহানুদ্দীনের হাত কেটে ফেলা হয়। শোকসন্তপ্ত বুরহানুদ্দীন গৌড়ে গিয়ে সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহের কাছে বিচার প্রার্থনা করেন। সবকিছু শুনে সুলতান সিপাহসালার নাসিরুদ্দীনকে যুদ্ধে যেতে নির্দেশ দেন। সঙ্গে ৩৬০ জন সাথী নিয়ে শাহজালাল (র.) বাংলায় আসেন। সিলেট অভিযানে মুসলিমরা জয়ী হয় এবং সিলেট মুসলমানদের শাসনাধীন আসে। পরে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলায় এসে ১৩৪৫-৪৬ খ্রিস্টাব্দে শাহজালাল (র.)-এর সঙ্গে খানকায় সাক্ষাৎ করেন। শায়খকে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন অতিবৃদ্ধ মহান সুফি রূপে বর্ণনা করেছেন তিনি। ইবনে বতুতা জানিয়েছেন, শাহজালাল ১৫০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছিলেন।

শাহজালালের সঙ্গে যে সুফিরা বাংলায় আসেন, তাদের বড় একটা অংশই ছিল ইয়েমেনের। তাদের মধ্যে ছিলেন তারই বোনের ছেলে নাম শাহ পরান (র.)। সিলেট বিজয়ের পর শাহজালাল ইয়েমেনির আদেশে তিনি ইসলাম প্রচারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। প্রথম দিকে নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রচার করলেও পরবর্তীকালে তিনি সিলেট শহর থেকে ছয় মাইল দূরবর্তী খাদেমনগর এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। এখানেই জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ইসলাম প্রচার করে বর্তমান মাজার টিলায় চিরনিদ্রায় শায়িত হন। শাহ পরান (র.)-এর মাজার সিলেট শহরের গুরুত্বপূর্ণ এক আধ্যাত্মিক স্থাপনা।

চট্টগ্রামের সুপরিচিত শাহ মোহছেন আউলিয়া (র.)-এর আদি নিবাসও ইয়েমেনে। ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তিনি ইসলাম প্রচারে নেমে যান। তিনি ইয়েমেন থেকে প্রথমে ভারতে গৌড় রাজ্যে আগমন করেন। গৌড়রাজ্য তখন শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। গৌড়রাজ্যে কিছুদিন অবস্থান করার পর হজরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (র.) পানিপথে চট্টগ্রামে আগমন করেন। তিনি চট্টগ্রামে এসে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত দেয়াংয়ের পাহাড়ে আস্তানা গাড়েন। শাহ মোহছেন আউলিয়া (র.)-এর আধ্যাত্মিক পরিচয় পাওয়ার পর দলে দলে মানুষ এসে তার কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। অল্প সময়ের মাঝে তার অসংখ্য ভক্ত এবং মুরিদ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে দেশ-বিদেশে তার অগণিত ভক্ত রয়েছে। দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামে অবস্থান করে ইসলাম ধর্ম প্রচার করে পরিণত বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। সেখানে এখন তার পবিত্র মাজার শরিফ গড়ে উঠেছে।

মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক