রমজান মাসে মুসলমানদের ইফতারির তালিকায় খেজুর বাধ্যতামূলক। সারা দিন রোজা রাখার পর নির্দিষ্ট সময়ে এটি দিয়েই ইফতার শুরু করেন ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা। সারা বিশ্বে একই চিত্র। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বন্ধুদের জমায়েতে কিংবা পরিবারে সবার প্রধান আকর্ষণ থাকে খেজুরের প্রতি। ইফতারির নানা বাহারি আয়োজন থাকা সত্ত্বেও খেজুরের অনুপস্থিতিতে যেন অপূর্ণতা রয়ে যায়। সাহরিতেও খেজুর খাওয়ার রীতি চালু আছে মুসলমানদের মধ্যে। খেজুর সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। খেজুরের জনপ্রিয়তার এটি অন্যতম কারণ। তবে মুসলমানদের কাছে এ ফল প্রধানত ধর্মীয় কারণে প্রিয়। কেবল রমজানেই নয়, সারা বছর খেজুর খাওয়ার রেওয়াজ চালু আছে। খেজুর একটি আদর্শ খাবার। তাই সারা বিশ্বের সব স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে খেজুরের গ্রহণযোগ্যতা আছে। ফলটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বৈশ্বিক বাজার।
খাদ্য ও কৃষিসংক্রান্ত ডাটাবেজ ট্রিজের তথ্য অনুসারে, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর মোট ৯০ লাখ টন খেজুর উত্পন্ন হয়। খেজুর উৎপাদনে শীর্ষ ১০ দেশ হলো যথাক্রমে মিসর, সৌদি আরব, ইরান, আলজেরিয়া, ইরাক, পাকিস্তান, সুদান, ওমান, তিউনিসিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। মিসরে প্রতি বছর ১ কোটি ৭০ লাখ টন খেজুর উত্পন্ন হয়। সৌদি আরবের বার্ষিক উৎপাদন ১ কোটি ৫০ লাখ টন। ইরান ও আলজেরিয়া যথাক্রমে ১ কোটি ৩০ লাখ ও ১ কোটি ২০ লাখ টন খেজুর উৎপাদন করে। ইরাকের বার্ষিক খেজুর উৎপাদনের পরিমাণ ৭ লাখ ৩৫ হাজার টন। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে এ তালিকার ষষ্ঠ অবস্থানে আছে পাকিস্তান। দেশটিতে প্রতি বছর ৫ লাখ ৪৩ হাজার টন খেজুর উত্পন্ন হয়। সুদানে ৪ লাখ ৬৫ হাজার, ওমানে ৩ লাখ ৬৮ হাজার, তিউনিসিয়ায় ৩ লাখ ৩২ হাজার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩ লাখ ২৮ হাজার টন খেজুর উত্পন্ন হয়। মিসর বিশ্বের সবচেয়ে বড় খেজুর সরবরাহকারী দেশ। সারা বিশ্বের মোট খেজুরের ১৮ শতাংশ মিসরে উত্পন্ন হয়। অর্থাৎ, প্রতি পাঁচটি খেজুরের একটি মিসরে উত্পন্ন হয়। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরব ১৭ শতাংশ খেজুর উৎপাদন করে। ইরানের ক্ষেত্রে সে হার ১৪ শতাংশ।
এবার খেজুর রফতানি ও আমদানির বৈশ্বিক চিত্রে চোখ বুলানো যাক। দি অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটি (ওইসি) প্রদত্ত ২০২০ ও ২০২১ সালের খতিয়ান অনুসারে, বিশ্বের শীর্ষ খেজুর রফতানিকারী দেশ সৌদি আরব। ২০২০ সালে দেশটি ২৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারের খেজুর রফতানি করে। ২০২১ সালে খেজুর রফতানি থেকে সৌদি আরবের মোট আয় হয় ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। পরিমাণটি সে বছর মোট খেজুর রফতানির ১৫ শতাংশ। সে হিসেবে এক বছরে তাদের রফতানি বেড়েছে ২৯ দশমিক ২ শতাংশ। এর পরেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান। ২০২০ সালে দেশটি ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের খেজুর রফতানি করে। ২০২১ সালে রফতানির পরিমাণ বেড়ে হয় ২৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। সে বছর মোট রফতানির তা ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এক বছরে তাদের রফতানি প্রবৃদ্ধি হয় ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তারপর আসে তিউনিসিয়ার নাম। ২০২১ সালে এ দেশ থেকে ২৮ কোটি ডলারের খেজুর রফতানি হয়। সে বছরের মোট খেজুর রফতানির তা ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে ২০২১ সালে তৃতীয় শীর্ষ খেজুর রফতানিকারী দেশ হলেও ২০২০ সালের তুলনায় তাদের খেজুর রফতানির পরিমাণ কমেছে। ২০২০ সালে দেশটি ২৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের খেজুর রফতানি করেছিল। এক বছরে তাদের রফতানি কমেছে ৩ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। বর্তমানে এ তিনটি দেশ যথাক্রমে বিশ্বের তিন শীর্ষ খেজুর রফতানিকারী দেশ। তবে খেজুর রফতানিতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ইসরায়েলের। ২০২১ সালে মোট ২৬ কোটি ২০ লাখ ডলারের খেজুর রফতানি করে শীর্ষ খেজুর রফতানিকারী দেশের তালিকায় চার নম্বরে উঠে এসেছে ইসরায়েল। অথচ ২০২০ সালে তাদের রফতানির পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এক বছরে তাদের রফতানি বেড়েছে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ।
খেজুর আমদানিতে সারা বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে আছে ভারত। ২০২১ সালে তারা ২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের খেজুর আমদানি করে। সে বছরের মোট খেজুর আমদানির তা ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২ সালে তাদের আমদানির পরিমাণ ছিল ২২ কোটি ডলার। এক বছরে আমদানি বেড়েছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। আমদানির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মরক্কো। ২০২১ সালে তারা ১৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারের খেজুর আমদানি করে। ২০২০ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ডলার। এক বছরে তাদের আমদানি বেড়েছে ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ। খেজুর আমদানিকারী দেশের তালিকায় তিন নম্বরে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০২১ সালে দেশটির খেজুর আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০২০ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল ১১ কোটি ২০ লাখ ডলার। এক বছরে দেশটির খেজুর আমদানির পরিমাণ বেড়েছে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ২০২১ সালে ৬ কোটি ১৬ লাখ ডলারের খেজুর আমদানি করেছিল। ২০২০ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ১০ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে দেশটির খেজুর আমদানির পরিমাণ বেড়েছে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। এ রমজানে বাংলাদেশ মোট ২০টি দেশ থেকে খেজুর আমদানি করেছে। সবচেয়ে বেশি আমদানি করেছে যথাক্রমে ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, আলজেরিয়া ও পাকিস্তান থেকে।
মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক





