পাথর ছুড়ে জাফরান বিবিকে হত্যা করার শাস্তি যখন আরোপ করা হলো, দেশে ও দেশের বাইরে মানুষের মেরুদণ্ডে হিম বয়ে গেল। জাফরান বিবিকে এ শাস্তি দেয়ার পেছনে যে আইন, তা এখনো বিপন্ন নারীদের সাজা দিয়ে চলেছে। পাথর ছুড়ে হত্যা করা একটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার, তবে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন ও বিক্ষোভ অনেক মূল্যবান জীবন রক্ষা করেছে। এখনো জিনার অভিযোগে বহু নারী পাকিস্তানের জেলে দিন কাটাচ্ছেন।

হুদুদ (বহুবচন হাদ) আইনে জিনার শাস্তি বিবাহিত মানুষের ক্ষেত্রে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যু, অন্যদের বেলায় প্রকাশ্যে ১০০ ঘা দোররার আঘাত।

১৯৮২ সালে আল্লাহ বক্সকে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয় এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ফাহমিদাকে জনসমক্ষে ১০০ দোররা মারা হয়। তারা দুজন একত্রে পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের নিকাহর যে তারিখ তারা দাবি করেছে, সে তারিখ নিয়ে বিতর্ক ছিল। নারী সংগঠনগুলো তখন প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

জেহান মিনার দুর্ভাগ্যজনক মামলাটি শুরুতে চোখে পড়েনি, তা ল ডাইজেস্টেও আসেনি। ফেডারেল শরিয়াহ আদালতের ডায়েরিতে কেসটির তথ্য পাওয়া যায়, সেখানে তার শাস্তি লাঘব করা হয়।

জেহান মিনার চাচা পুলিশের কাছে নালিশ জানায়, তার পিতৃহীন ভ্রাতষ্পুত্রী চাচার শালা ও ভ্রাতুষ্পুত্রের ধর্ষণের শিকার হয়— জেহান মিনা তার অসুস্থ চাচির সেবাকার্যে নিয়োজিত ছিল। জেহান মিনা ধর্ষিত হয়ে গর্ভবতী হওয়ার কারণে তাকে বিচার-আদালত প্রকাশ্যে ১০০ দোররা শাস্তি ঘোষণা করে। বিষয়টি ফেডারেল শরিয়াহ আদালতে এলে বিচারক সদয় হয়ে তাকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রকাশ্যে ১০ ঘা দোররা দেন। আদালত আরো বলেন, গর্ভসঞ্চারের কারণ ব্যাখ্যা করতে না পারাই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে যায়। তার গর্ভসঞ্চারের কারণ কী, তা প্রমাণের দায়িত্ব নারীর— জেহান মিনার কথা অনেকেরই অজানা। মেয়েটি একটি মৃত সন্তান প্রসব করে, জেল খাটে, দোররার ঘা খেয়ে শেষ পর্যন্ত বোবা হয়ে যায়।

১৯৮৭-র নভেম্বরে করাচির একটি বিচার-আদালত ২৫ বছর বয়সী শাহিদা পারভিন এবং তার স্বামী মুহাম্মদ সারওয়ারকে পাথর ছুড়ে হত্যা করার আদেশ দেন। এর আগে শাহিদার জনৈক খুশির সঙ্গে বিয়ে হয়, সে দাবি করেছে শাহিদাকে সে তালাক দেয়নি। শাহিদা তীব্রভাবে এর প্রতিবাদ করে এবং জানায় খুশির দেয়া তালাক ঘোষণার পরই সে সারওয়ারকে বিয়ে করে। আইন অনুযায়ী তালাক নিবন্ধন করার দায়িত্ব স্বামীর। পরিহাসের ব্যাপার স্বামী যদি এই কাজটি না করে, তাহলে শান্তি ভোগ করতে হবে স্ত্রীকে— জিনা অর্ডিন্যান্সে এ কথাই বলা হয়েছে।

১৯৮৬ সালে দাম্পত্য সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন স্বামীর অভিযোগে গর্ভবতী গুল নিসাকে পাথর ছুড়ে হত্যার সাজা দেয়া হয়। অভিযোগকারী বলেছে যেহেতু তারা বিচ্ছিন্ন, তার গর্ভবতী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্যাতনে বিপর্যস্ত হয়ে একপর্যায়ে গুল নিসা তার সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠার স্বীকারোক্তি দেয়। পরে আপিল আদালতে স্বীকারোক্তি থেকে সরে আসে এবং আপিলের রায়ে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

কারাবাসী নারীদের ৪৮ ভাগের বিরুদ্ধে জিনার অভিযোগ। জিনার অভিযোগে প্রতিদিন শত শত নারী গ্রেফতার হচ্ছে। ১৯৪৮ সালে ১ হাজার ৮৪৩টি জিনা মামলায় অভিযুক্ত নারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

খ্যাতিমান কিন্তু গোড়া পুরুষ বিচারকরা জিনা আইনকে সমর্থন করে যাচ্ছেন, তারা বলেন, ৮৫ ভাগ মামলায় যেহেতু অভিযুক্ত নারী আপিলে খালাস পেয়ে যাচ্ছেন, কাজেই তাদের বিরুদ্ধে অবিচার হচ্ছে না। অথচ এ খালাসপ্রাপ্তির হিসাব থেকেই আইনপ্রণেতাদের বোঝা উচিত জিনা অর্ডিন্যান্সের কতটা অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এই আইন যেকোনো নারীর গর্দানের ওপর নির্মম তরবারির মতো ঝুলে আছে।

নিপীড়িত শ্রেণীর আচরণ দিয়ে সমাজের নৈতিকতার বিচার করা হয় না, তা করা হয় রাষ্ট্রপ্রণীত আইনকানুন দিয়ে, যা সমাজের নিপীড়িত শ্রেণীকে শোষণের জন্য ব্যবহূত। কিছু সংখ্যক লম্পট ব্যক্তির জন্য ফাঁদ পাততে গিয়ে জিনা আইন সব নারীর জন্য ‘মাইনফিল্ড’-এ পরিণত হয়েছে। হুদুদ আইনে নারীর ওপর অবিচারের বহু কাহিনী রয়েছে, শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে আপিলে খালাস পেলে দীর্ঘ কারাবাস এবং ভোগান্তি সইতে হচ্ছে। যারা হুদুদ আইনকে পবিত্র মনে করছেন অসংখ্য অবিচারের কয়েকটি তাদের জানা প্রয়োজন, যাতে তারা বুঝতে পারেন অন্যায়টা কোথায়।

শাহিওয়ালের শরিয়াহ আদালত সাফিয়া বিবি নামে এক অন্ধ নারীকে সাজা দেন। ওই নারী তার গর্ভধারণের স্বীকারোক্তি দেয়। অথচ তার ধর্ষণকারী হিসেবে যাকে চিহ্নিত করা হয়, তাকে দেয়া হয় ‘বেনিফিট অব ডাউট’ এবং ধর্ষক ছাড়া পেয়ে যায়। এ নিয়ে যখন আন্দোলন শুরু হয়, বিব্রত কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য ফেডারেল শরিয়াহ কোর্টকে নির্দেশ দেয়। আদালত তাকে খালাস দেন, কিন্তু গর্ভধারণে দায় তার না হলেও আইনটি অটুট রয়ে যায়।

১৯৮৫ সালে ফেডারেল শরিয়াহ কোর্ট তসলিম বিবিকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও প্রকাশ্যে ৩০ ঘা দোররা দেয়ার আদেশ দেন। রাফকাত বিবি ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভবতী হন। থানা ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ না করলে তিনি সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। গ্রামের প্রভাবশালী ধর্ষকদের বদলে পুলিশ তাকেই গ্রেফতার করে। যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া গর্ভবতী হওয়ার অভিযোগে ১৯৮৪ সালে শরিয়াহ আদালত তাকে শাস্তি দেন।

ধর্ষণের অভিযোগে বিচারের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আদালতের উদ্যোগ সামান্যই। আদালত ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ ও ‘ধর্ষণের প্রস্তুতি’— দুটি পৃথক তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে প্রচেষ্টার জন্য বড় শাস্তি আর প্রস্তুতির জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের সাজা নির্ধারণ করেছেন। ফেডারেল শরিয়াহ আদালতের ব্যাখ্যায় নারীকে বিবস্ত্র করে তার মুখে কামড় বসিয়ে দিলেও তা কেবল ধর্ষণ প্রস্তুতি হিসেবে গণ্য হবে, ধর্ষণ প্রচেষ্টা নয়।

নারীর ভোগান্তি সৃষ্টিকারী জিনা অর্ডিন্যান্স বাতিল করতে হবে। সংবিধানে যত গ্যারান্টিই থাকুক, নারীর জন্য পাকিস্তানের কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করা যায় না।

অনুবাদ: এম এ মোমেন