পাঞ্জাব পাকিস্তান ফ্রন্টের আহ্বায়ক মালিক গুলাম জিলানি ‘শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের’ দাবি জানিয়ে জেল খেটেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন।

৩ মার্চ ১৯৭১-এর বৈঠকটি হয় মালিক গুলাম জিলানির লাহোরের বাসভবনে। তিনি পাঞ্জাব পাকিস্তান ফ্রন্টের আহ্বায়ক। ফ্রন্টের সাংগঠনিক কমিটি অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছে, গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। পাকিস্তানের সব গণতান্ত্রিক শক্তি যেন শেখ মুজিবকে সমর্থন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্তকারী ভুট্টোর নেতৃত্ব অস্বীকার করে, মালিক গুলাম জিলানি সে আহ্বান জানিয়েছেন।

তার বাসভবনে অনুষ্ঠিত সভায় একাত্তরের মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ স্থগিত করাকে একটি দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ‘কমিটি মনে করে, এ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযাচিত, অপ্রয়োজনীয় ও অন্যায়। কমিটি আরো মনে করে, যিনি নিজেকে পশ্চিম পাকিস্তানের মুখপাত্র দাবি করেন, পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের কেবল একটিতে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তার অপরিণামদর্শী ও সমর্থনের অযোগ্য একক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে তিনি দেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। পাঞ্জাবের জনগণ পিপলস পার্টিকে যতটা বিশ্বাস করেছে, ভুট্টো তার সম্পূর্ণ অমর্যাদা করেছেন। পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে যেখানে পিপলস পার্টির প্রার্থী জিতেছেন, এ কথা সেখানকার বেলায়ও সত্য।’

মালিক গুলাম জিলানি বলেন, পিপলস পার্টির বর্তমান গণতন্ত্রবিরোধী ভূমিকা প্রমাণ করে, তারা এর মধ্যেই জনগণের স্বার্থের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, দলটি তা-ই জনগণের আস্থা অর্জনের যোগ্য নয়।

‘ভুট্টো যেভাবে জাতীয় পরিষদকে হেয়প্রতিপন্ন করেছেন এবং একটি সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সম্ভাব্য শেষ সুযোগটিকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন, তাতে পুরো বিষয়টিকে ইতিহাসের কেবল একটি ঘটনার সঙ্গেই তুলনা করা চলে— ভাইমার রিপাবলিকের সংসদ রাইখস্ট্যাগে আগুন জ্বলছে এবং হিটলার অভ্যুত্থান ঘটাচ্ছেন।’

১৯৭১-এ মালিক গুলাম জিলানির ভূমিকা পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে দেশদ্রোহীর। ২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস এবং সামরিক আইনের আওতায় তিনি গ্রেফতার হন।

ভুট্টোর ক্ষমতার রাজনীতি: জাতি বিপর্যয়ের মুখে

৫ মার্চ ১৯৭১ করাচির দ্য ডন-এ প্রকাশিত মালিক গুলাম জিলানির প্রেস বিবৃতি:

৪ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তান পাঞ্জাব ফ্রন্টের আহ্বায়ক মালিক গুলাম জিলানি অবিলম্বে পাকিস্তানের জনগণ এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির অনেক জাতীয় পরিষদ সদস্যকে ভুট্টো সাহেবের বেহায়া ক্ষমতা লালসার উন্মত্ত খেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অবিলম্বে একটি প্লাটফর্ম গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন ভুট্টো দেশকে আসন্ন বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

প্রেস বিবৃতিতে তিনি বলেন, নতুন করে গোলটেবিলের প্রস্তাব খলনায়কের উদ্যোগ ছাড়া কিছু নয়। তিনি উল্লেখ করেন, সময় পেরিয়ে গেছে, ঢাকার রাস্তায় যে রক্ত ঝরেছে, তা তুলে আনার আর কোনো উপায় নেই।

তিনি বলেন, সেখানে যারা নিহত হয়েছে, তাদের স্বজনদের হূদয়ে যেমন রক্তক্ষরণ হয়েছে, আমার হূদয়েও সেই রক্তক্ষরণ। আমার বেলায় এ ক্ষরণ আরো বেশি। কারণ তাদের বেলায় শহীদের গৌরবের সান্ত্বনা রয়েছে, যেখানে আমার বেলায় ভয়ঙ্কর লজ্জা ছাড়া আর কিছু নেই। যারা নির্মমভাবে রক্ত ঝরিয়েছে, তাদের পক্ষে লজ্জা প্রকাশ ছাড়া আমি আর কী করতে পারি।

মালিক গুলাম জিলানি বলেন, দেশে যে নগ্ন ট্র্যাজেডির সূত্রপাত ঘটানো হয়েছে, তার প্রতিকারের জন্য তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার কোনো গোলটেবিল বৈঠক কিংবা জাতীয় সংসদের অধিবেশনের প্রয়োজন নেই। সময় এসেছে এখন সব শক্তি ও উদ্যোগ কেবল অবিলম্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সাহেব শীর্ষ ১২ দলকে ১০ মার্চ ঢাকায় গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের তাত্ক্ষণিক প্রত্যাখ্যানের পরও জাতীয় প্রেস প্রস্তাবিত বৈঠকের বাড়াবাড়ি রকম প্রচারণা চালিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ক্ষমতাসীনদের সিল ও সই মারা যেকোনো কিছু স্বাগত জানানোর পুরনো রীতি অনুসরণ করা বহু লোক থেকে যাবেন। এ নিয়ে খানে আজম খান, আবদুল কাইয়ুম খান কিংবা মহেঞ্জেদারোর নাচনেওয়ালা কী বললেন, তা যেমন বিস্ময়কর কিছু না, তেমনি তাতে কিছুই এসে যায় না।

মালিক গুলাম জিলানি বলেন, পাকিস্তানের সব দেশপ্রেমিক নাগরিককে প্রথমত. মনোযোগ দিতে হবে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ওপর; দ্বিতীয়ত. কয়েক দিন ধরে পূর্ব পাকিস্তানি ভাইদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ যে এর সঙ্গে জড়িত নয়, সে ঘোষণা দিতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানিদের কাছে এবং বিশ্বের কাছে এটা তাদের খোলাসা করতে হবে যে, তাদের যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের অংশী করা হয়েছিল, তারা আর এর সঙ্গে নেই।

তিনি বলেন, পাঞ্জাব-পাকিস্তান ফ্রন্ট সমমনা পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিক দলগুলোর কনভেনশন ডেকে ভুট্টোর প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করবেন এবং অবিলম্বে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে কাজ করবেন।

মালিক গুলাম জিলানিকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দেয়া হয়েছে। পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনের অধীনে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।

মালিক গুলাম জিলানিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করেছে।

দুই.

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নেত্রী, পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম নারী সভাপতি, বাংলাদেশের বন্ধু সম্প্রতি প্রয়াত আসমা জাহাঙ্গির মালিক গুলাম জিলানির জ্যেষ্ঠ কন্যা। জন্ম লাহোরে, ২৭ জানুয়ারি ১৯৫২। বেড়ে ওঠা লাহোরে, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ১৯৮২ থেকে সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য।

১৯৭১-এ বাংলাদেশে পরিকল্পিত পাকিস্তানি গণহত্যার সার্বিক চিত্র উদ্ঘাটনের জন্য আসমা জাহাঙ্গির জাতিসংঘকে অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেন, একাত্তরের গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য পাকিস্তানের সরকারের ক্ষমা চাওয়া উচিত। কিন্তু তারা সামরিক বাহিনীর ভয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছে না। পাকিস্তান সরকার তার দেশের সেনাবাহিনী সম্পর্কে ভীতসন্ত্রস্ত। তারা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিকেও জিম্মি করে রেখেছে।

আসমা বাবার রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করেছেন। ১৯৬৯ সালে লাহোরে স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা সামরিক আইনের বিরুদ্ধে গভর্নর হাউজের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ ছাত্রীদের একজন গভর্নর হাউজের দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে এ রাষ্ট্রীয় ভবনে কালো পতাকা উঠিয়ে দেয়। কনভেন্ট অব জেসাস অ্যান্ড মেরি স্কুল মেয়েটিকে স্কুল থেকে বিদায় করে দেয়। ১৭ বছর বয়সী সেই মেয়েটিই আসমা জিলানি।

মোহাম্মদ তকি লিখেছেন, ‘মালিক গুলাম জিলানি শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মালিক বহুবার গ্রেফতার হয়েছেন। ১৯৬৯-এর ফেব্রুয়ারি- মার্চের দিকে তিনি কারামুক্ত হন। মুজিবুর রহমানও রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেয়ার জন্য ছাড়া পান।’

‘মুজিব প্রথমে লাহোরে আসেন এবং রাওয়ালপিন্ডিতে বৈঠকে যাওয়ার আগে মালিক গুলাম জিলানির সঙ্গে অবস্থান করেন। তিন বছর আগে তিনি তার বিখ্যাত ছয় দফা লাহোরের এ বাড়িতেই ঘোষণা করেন।’

১৯৭১-এর ডিসেম্বরে মালিক গুলাম জিলানি গ্রেফতার হলে ১৯ বছর বয়সী আসমা বাবার মুক্তির জন্য লড়েন। আইনজীবী মোহাম্মদ আনোয়ারের পরামর্শে সরকারের বিরুদ্ধে মামলায় তিনিই দরখাস্তে সই করেন। এটিই পাকিস্তানের ইতিহাসে একটি বিখ্যাত মামলা: ‘মিস আসমা জিলানি বনাম গভর্নমেন্ট অব পাঞ্জাব’। মালিক গুলাম জিলানির মতো আলতাফ গহরও কারারুদ্ধ হন। তার স্ত্রী জরিনা আলতাফ গহর স্বামীর মুক্তির জন্য মামলা করেন। দুটো মামলাই খারিজ করে দেয়া হলে তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমান একত্রে দুটো মামলার শুনানি নিয়ে ঐতিহাসিক রায় দেন: ‘সামরিক আইন অবৈধ, দুজনের গ্রেফতার অবৈধ’।

আসমা জিলানি কুড়িতে পৌঁছার আগেই পাকিস্তানে আলোচিত বিদ্রোহী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। আসমা পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইসলামীকরণ, হুদুদ আইন, জিনা অর্ডিন্যান্স— নিপীড়নকারী সব আইনের বিরোধিতা করেন। পাকিস্তানে তিনি হয়ে ওঠেন নির্যাতিত মানুষের শেষ আশ্রয়। ধর্মদ্রোহিতা, সম্মানের জন্য নারী হত্যা— এ ধরনের বহু মামলা তিনি নিজ খরচে চালিয়ে গেছেন। তার বোন হিনা জিলানিও খ্যাতিমান নারীনেত্রী। দুজনই বাংলাদেশে এসেছেন, একাত্তরের ভূমিকার জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কোনো সামরিক সরকার ও কথিত স্বৈরাচারী গণতান্ত্রিক সরকার তাকে পছন্দ করেনি। তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত বিচার বিভাগের বিরুদ্ধেও লড়ে গেছেন। তার দুটি গ্রন্থ: ‘ডিভাইন স্যাংশন? দ্য হুদুদ অর্ডিন্যান্স’ এবং ‘চিলড্রেন অব অ্যা লেসার গড।’

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮: আসমা জাহাঙ্গির তখন কোর্টেই ছিলেন, প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি আদালত অবমাননার মামলায় তিনি আইনজীবী হতে সম্মতি দিয়েছেন। সামনের সপ্তাহে তারিখ পড়েছে। আসমা সিনিয়র আইনজীবী আজম নাজির তারারের সঙ্গে এ মামলা নিয়ে আলাপ করছিলেন। একসময় তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটা পড়ে গেলে তিনিও হুমড়ি খেয়ে পড়ে যান। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মানবাধিকারের আইকন আসমা জাহাঙ্গিরের সমকক্ষ কোনো ব্যক্তিত্ব পাকিস্তানে আর নেই।

আসমা জাহাঙ্গিরের নিউজউইক সাক্ষাৎকার থেকে

একদিকে পাকিস্তানের উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় ইসলামী জঙ্গি উত্থান সামাল দিতে ব্যর্থতা, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের বিদ্রোহ, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মুহাম্মদ চৌধুরীকে চাকরিচ্যুত করা, আট বিচারপতি ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ— ২০০৭-এর টালমাটাল সময়ে পাকিস্তান হিউম্যান রাইটস কমিশনের চেয়ারউইমেন আসমা জাহাঙ্গিরের যে সাক্ষাৎকারটি ৪ জানুয়ারি ২০০৭ ‘নিউজউইক’-এ প্রকাশিত হয়, তার নির্বাচিত অংশ অনূদিত হলো। সাক্ষাৎকার নেন রন মরিয়ো।

প্রশ্ন: (প্রধান বিচারপতি) চৌধুরীকে মুশাররফ বরখাস্ত করতে গেলেন কেন?

আসমা জাহাঙ্গির: নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান একনায়করা সবসময় সর্বত্র প্রেতাত্মা দেখতে পান। এবারই যে প্রথম ঘটেছে, এমন নয়। ১৯৯৯-তে (রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে) যখন ক্ষমতায় এলেন, তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের তার প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়ান। তিনি চেয়েছেন তার সম্পূর্ণ অনুগত একটি বিচার বিভাগ। কিন্তু ২০০৭ সালে এমন স্বাধীন গণমাধ্যম এবং স্বাধীন আইনজীবী পরিষদ থাকার পর এমন অনুগত বিচার বিভাগ লালন করা কঠিন কাজ।

প্রশ্ন: মুশাররফ বলেছেন, তিনি কেবল প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ, তারই আলোকে চৌধুরীকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

আসমা: প্রেসিডেন্ট আবার মিথ্যাচার করেছেন এবং সবাইকে ভুল পথে পরিচালনা করেছেন। তার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, প্রেসিডেন্ট যেভাবে বলেছেন, ব্যাপারটা তা নয়; পুরোটাই সাজানো ঘটনা। তিনি এখন বলছেন প্রধান বিচারপতিকে গৃহবন্দি করা একটি পদ্ধতিগত ভ্রান্তি।

প্রশ্ন: শত শত তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি যারা নিখোঁজ রয়েছে কিংবা আটক রয়েছে, তাদের হাজির করার আদেশ দেয়ার কারণেই কি মুশাররফের এ সিদ্ধান্ত?

আসমা: মুশাররফ অত্যন্ত দক্ষ মিথ্যেবাদী। কিন্তু এখন তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, নিখোঁজ, নিরুদ্দিষ্ট মানুষ নিয়ে আমিও খুব উদ্বিগ্ন। কিন্তু আমরা কি-ইবা করতে পারি, তারা তো জিহাদি। মুশাররফ পৃথিবীকে জানান দিতে চাইছে নিরুদ্দিষ্ট এ মানুষ ইসলামী জঙ্গি, কিন্তু তা সত্যি নয়। নিরুদ্দিষ্ট মানুষের যে তালিকা সুপ্রিম কোর্টকে দেয়া হয়েছে, তার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ সিন্ধি ও বালুচ এবং তারা ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ— তাদের কেউ কেউ দেশে অত্যন্ত সুপরিচিত— তারা কবি ও লেখক, তাদের সৃষ্টিকর্ম ধর্মনিরপেক্ষতার সাক্ষ্য দেয়। কোনো জিহাদ, আল কায়েদা বা তালেবানের সঙ্গে তাদের কোনো সংস্রব নেই— আমি মনে করি পারভেজ মুশাররফ মিথ্যাচার করছেন।

প্রশ্ন: কিন্তু চৌধুরী তো রুল জারি করেছেন, নিরুদিষ্ট মানুষকে হাজির করাতে হবে, তাই নয় কি?

আসমা: নিরুদ্দিষ্ট মানুষ নিয়ে চৌধুরী একটি রায়ও দেননি। তিনি হিউম্যান রাইটস কমিশনের আবেদন দেড় মাস ধরে ঝুলিয়ে রেখেছেন। কিন্তু যেহেতু আমরা সুপরিচিত আইনজীবী। আমাদের উপেক্ষা করার সুযোগ তার নেই, তাকে শুনানি গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু তিনি ভীষণ ধীরগতিতে পদক্ষেপ নিয়েছেন— তিনি সরকারকে কেবল একটি নোটিসপত্র দিয়েছেন, কোনো রায় দেননি। তিনি একবারও বলেননি, যারা এ মানুষগুলোকে গায়েব করে ফেলেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি কেবল সরকারকে বলেছেন, চলো, আমরা তাদের খুঁজে বের করি। যেখানে শত শত মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে, আদালত কেমন করে চোখ বন্ধ রাখে?

প্রশ্ন: মুশাররফ কি আশঙ্কিত ছিলেন যে, বছরের শেষদিকে তার একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও চিফ অব স্টাফ— এ দ্বৈত ভূমিকার বিরুদ্ধে চৌধুরী রুল জারি করবেন?

আসমা: প্রেসিডেন্ট সেনাবাহিনীর উর্দি পরে থাকবেন কি থাকবেন না, এটা বিষয় ছিল না— আমরা মনে করি, চৌধুরীসহ কোনো বিচারকেরই এ নিয়ে কথা বলার সাহস নেই। সেই সাহস ও মনোবল নেই।

প্রশ্ন: গত সপ্তাহে শুনানির জন্য গেলে পুলিশ তার সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেছে?

আসমা: টেলিভিশনে আপনারা তো দেখেছেন, চুলের মুঠি ধরে প্রধান বিচারপতিকে কীভাবে টেনে আনা হচ্ছে। সব সংবাদপত্রে তা ছাপা হয়েছে, টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। মানুষকে যা সম্পূর্ণভাবে আতঙ্কিত করে তুলেছে তা হচ্ছে, দেশের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে যদি এই নির্লজ্জ আচরণ ও তাকে এভাবে অপদস্থ করা যায়, তাহলে কেউই নিরাপদ নয়। আমরা সবাই মনে করছি, এরপর বোধহয় আমাদের পালা।

প্রশ্ন: সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল যদি তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করে (তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতির), তাহলে কি তিনি আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে আসতে পারবেন?

আসমা: চৌধুরী যদি বেঞ্চে ফিরে আসেন তিনি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কিনা জানি না। আইনজীবীরা তার হয়ে লড়ছেন। তিনি যদি আইনজীবীদের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আসেন, তাহলে তিনি স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারবেন না, তিনি এটা ভুলতে পারবেন না যে এই আইনজীবীরা তাকে পূর্বপদে বহাল করেছে।

প্রশ্ন: তাহলে এর শেষ কোথায়?

আসমা: সরকার মনে করে এ প্রক্রিয়াটিকে যত দীর্ঘায়িত করা যাবে, আন্দোলন তত চুপসে যাবে। আইনজীবীরা যেহেতু তার জন্য মাসের পর মাস আন্দোলন চালিয়ে যাবেন না, পরিস্থিতি শীতল হয়ে আসবে— তবে সরকার আরো ভুল করবে, এ সরকার মেরামতের অযোগ্য।