ভারতবর্ষের সংস্কৃতিতে অনাদিকাল থেকে তারা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে আছেন। তারা নারী নৃত্যশিল্পী। এ ভূভাগের সামাজিক কাঠামোতে পারফর্মিং আর্টিস্টদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ঐতিহাসিক কাল থেকেই। প্রাচীন ভারতীয় কবিরা সমাজে বিনোদন দানকারী নারী নৃত্যশিল্পীদের বন্দনা করে গেছেন। মহাকাব্যগুলোয় রাজকীয় আভিজাত্যের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে খুঁজে পাওয়া যায়। পুরাণগুলোয় তাদের উপস্থিতিকে সৌভাগ্যের বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বৌদ্ধ সাহিত্যেও সমাজে এ নারীদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের কথা জানা যায়। বিভিন্ন যুগে তাদের বিভিন্ন রূপে আবির্ভাব ঘটেছে— স্বর্গীয় অপ্সরা থেকে গণিকা, দেবদাসী, নর্তকী, কাঞ্চনী, তাওয়ায়েফ ও শেষকালে ব্রিটিশ সাহেবদের নাচ গার্ল। ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে নাচ ও গান স্বর্গীয় সৃষ্টি। কথিত আছে, ব্রহ্মা মুনি ভরতকে নাট্যশাস্ত্র সংকলনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ নাট্যশাস্ত্র হচ্ছে নাচ ও গানবিষয়ক স্বর্গীয় নিয়মাবলি। এ গ্রন্থ একটি বিস্ময়কর সৃষ্টি, খ্রিস্টের জন্মের আগে রচিত এ গ্রন্থে সংগীত, নাচ, নাটক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এমনকি নাটকের চিত্রনাট্য, নাটকের হল ও মঞ্চ ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা আছে। গ্রন্থের বেশির ভাগ অংশই নাচ নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায়। নাচে হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের নানা ধরনের ভঙ্গির বিবরণ আছে, যা একজন নৃত্যশিল্পীর জন্য অপরিহার্য।

নৃত্যশিল্পের নানা কলা যখন ভরত লিখছিলেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন, এ লীলায়িত লাস্য নৃত্য কেবল নারীর পক্ষেই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। বিষয়টি ভরত ব্রহ্মাকে জানান। ব্রহ্মা তখন সৃষ্টি করেন অপ্সরা। কবিরা অপ্সরাদের সৌন্দর্য নিয়ে গান লিখলেন। গানে গানে জানা যায়, কীভাবে অপ্সরারা তাদের সৌন্দর্য আর নৃত্যকলায় দেবতাদের খুশি করতেন আর তাদের নাচের সময় গান গাইতেন গন্দর্ভরা।

উর্বশী ছিলেন অপ্সরাদের মধ্যে প্রধান। তিনি দুনিয়ায় জন্ম নিয়েছিলেন মানুষের মাঝে নাচ ও গানের স্বর্গীয় জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিতে। মন্দিরে থাকা দেবদাসীরা এ কলা প্রথম শিক্ষা পেয়েছিলেন। তারপর শতাব্দী পার হতে হতে এ ভক্তিনৃত্য মন্দিরগুলোর নিত্য আচারের অংশে পরিণত হয়। দেবদাসী ব্যবস্থা যে তখন ভারতজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মৌর্য যুগের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক দলিলে, বিশেষত কৌটিল্যের রচনায়।

প্রাচীন ভারতে পাওয়া যায় গণিকাদের, এরা ৬৪ প্রকার কলায় পারদর্শী ছিলেন, যার মধ্যে ছিল নাচ ও গান। মুসলমানদের আগমনের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর ভারতে দেবদাসী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে তা তখনো বিকশিত হতে থাকে। মোগল শাসকদের জন্য নাচ ছিল দরবারি বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ। তারা পারস্যের নৃত্যশিল্পীদের ভারতে এনেছিলেন, যারা ডোমনি, লোলোনি, হোরকানি নামে পরিচিত ছিলেন। পারস্য ও ভারতের ঐতিহ্যবাহী হিন্দু নৃত্যরীতির সমন্বয়ে তৈরি হয় একটি নতুন নৃত্যধারা, যা কত্থক নামে জনপ্রিয়তা পায়। মোগল দরবারের প্রাচুর্যে শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কত্থকনৃত্য বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আকবর দক্ষ নৃত্যশিল্পীদের কাঞ্চনী উপাধিতে ভূষিত করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোগল দরবারে গায়ক ও নর্তকীদের জৌলুস বাড়তে থাকে। জাহান্দার শাহ বিয়ে করেছিলেন এক বিখ্যাত নর্তকী লাল কুনওয়ারকে এবং তিনি লালকে রানীর সম্মান দিয়ে ইমতিয়াজ মহল উপাধিতে ভূষিত করেন। লাল ‘নর্তকী সম্রাজ্ঞী’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। লাল কুনওয়ারের সৌন্দর্য নিয়ে কবি লিখেছিলেন—

 

‘বা খুবি লাল কুনওয়ার নাম-ই-উ বুদ

শক্কর-গুফতার, সিম-আন্দাম-ই-উ বুদ’

(লাল কুনওয়ার, নামেই তার পরিচয়

চিনির মতো মিষ্টি কণ্ঠ, আর রুপার মতো শরীর)

 

মোহাম্মদ শাহ রঙ্গিলা বিয়ে করেছিলেন আরেকজন নর্তকীকে, যার নাম ছিল উত্তমবাঈ। তিনি কুদসিয়া বেগম নামে পরিচিত ছিলেন।

মোগল জমানার শেষভাগে নর্তকীরা এভাবে সমাজে বেশ প্রভাবশালী ও আলোচিত হয়ে ওঠেন। নিজের রাজত্ব ও জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেও অনেক রাজপুরুষ নর্তকীদের প্রেমে পড়েন। উত্তর ভারতে অনেক নর্তকী লোককথাতেও স্থান করে নেন। আকবরের শাসনামলে ‘রূপমতী’ নামে এক নর্তকী পুরো উত্তর ভারতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার রূপের প্রশংসায় তখন সবাই পাগলপ্রায়, তিনি ছিলেন ‘চাঁদের চেয়ে সুন্দর’। রূপমতীর রূপের প্রশংসা শুনে তরুণ আকবর তাকে যেকোনো মূল্যে নিজের হেরেমে দেখতে চান। কিন্তু রূপমতী তখন মালওয়ার শাসক বাজ বাহাদুরের ঘরে। বাজ ও রূপমতী পরস্পরের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। আকবর রূপমতীকে পেতে মালওয়া আক্রমণ করতে সেনাবাহিনী পাঠান। বাজ ও রূপমতী মোগল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কিন্তু মোগলরা মালওয়া দখল করে নেয়। বাজ বাহাদুর পালিয়ে যান আর রূপমতী মোগলদের হাতে ধরা না দিয়ে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। এ খবর শুনে আকবর শোকাহত হন। অনুতপ্ত আকবর রূপমতীর জন্য একটি সমাধি তৈরি করান। বাজ বাহাদুরের মৃত্যুর পর তাকেও রূপমতীর পাশে সমাহিত করা হয়। জাহাঙ্গীর বা সালিমের সঙ্গে আনারকলির প্রেম নিয়ে তো কাব্য-সিনেমা সবই হয়েছে। শাহজাহানের দরবারে ছিলেন এক রূপসী নর্তকী রানা দিল। শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহজাদা দারা শুকো এ রানা দিলের প্রেমে পড়েছিলেন। দারা রানা দিলকে বিয়ে করতে চান। মানুচ্চির বিবরণীতে পাওয়া যায়, শাহজাহান এ বিয়েতে অনুমতি না দেয়ায় দারা মুষড়ে পড়েন। শোকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। এ পরিস্থিতি দেখে শাহজাহান বিয়ের অনুমতি দেন। নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রানা দারার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। দারা সিংহাসন নিয়ে যুদ্ধে তার ভাই আওরঙ্গজেবের হাতে নিহত হন। দারার মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেব রানা দিলকে তার স্ত্রী হিসেবে পেতে চান। রানা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন আওরঙ্গজেব তার চুলের প্রশংসা করেন। কথিত আছে, রানা তখন তার চুল কেটে আওরঙ্গজেবের কাছে পাঠান এবং জানিয়ে দেন তিনি একাকী থাকতে চান। অন্যদিকে আওরঙ্গজেব তাকে বলেন, তিনি অতি সুন্দর এবং তাকে রানীর মর্যাদা দেয়া হবে। রানা তখন ছুরি দিয়ে নিজের মুখ চিরে রক্তাক্ত করেন। সেই রক্তে একটি কাপড় ভিজিয়ে তা আওরঙ্গজেবের কাছে পাঠিয়ে জানিয়ে দেন যে তার মুখের রূপ আর নেই এবং আওরঙ্গজেব যদি তার রক্ত চান, তাও তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন। রানা দিলের এ দৃঢ়তায় আওরঙ্গজেব প্রভাবিত হন এবং বাকি জীবন তাকে নির্জনে একাকী বাস করতে দেন।

মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর দিল্লি তার জৌলুস হারায়। নতুন আরেকটি জাঁকজমকপূর্ণ কেন্দ্র দেখা যায় লক্ষেৗতে। অওধের নবাবদের দরবারে এবার নর্তকীরা তাদের নতুন আশ্রয় খুঁজে পেলেন। অওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলী শাহর শাসনামল ছিল নৃত্য ও সংগীতের স্বর্ণযুগ। তার আমলে পরীখানা নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছিল, যেখানে মেয়েদের নাচ-গান শিক্ষা দেয়া হতো। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতে পুরনো সাম্রাজ্যগুলো ভেঙে যাওয়ায় ও বড় মন্দিরগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় মন্দিরকেন্দ্রিক দেবদাসীরা বিপদে পড়েন। কর্মসংস্থানের জন্য তাদের দেশের অন্যান্য প্রান্তে যাত্রা করতে হয়, অনেকে নতুন ব্রিটিশ শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রার্থনা করেন।

এবার ব্রিটিশ সাহেবদের অধীন উত্তর ভারতের কত্থক ও দক্ষিণ ভারতের দাস্যি-আত্তামকে সাধারণভাবে নাচ বলে অভিহিত করা হয়। ভারতের সেই পারফর্মিং আর্টিস্টরা এবার নতুন পরিচয়ে সামনে এলেন— নাচ গার্ল বা নর্তকী। নিজেদের নাচ-গানের জাদু দিয়ে তারা সাহেবদের মোহিত করলেন। এখানে আবারো উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই নাচ গার্ল বা তাদের উত্তরসূরি গণিকা, দেবদাসী ও নর্তকীরা ছিলেন পেশাদার শিল্পী। তারা নাচ-গানে দক্ষ ছিলেন এবং সাহিত্য-কাব্য সম্পর্কেও তাদের ভালো ধারণা ছিল। অভিজাত পরিবারের সন্তানদের এ নর্তকীদের কাছে পাঠানো হতো আচার-আচরণ শেখার জন্য।

ইউরোপীয়দের ভাষায় ‘নাচ গার্ল’, সহজ বাংলায় নর্তকী বা বাইজি। ঔপনিবেশিক আমলে দুই শতক ধরে এ নর্তকীরা বাংলা কিংবা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করা ইউরোপীয়দের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন। ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকদের অগণিত জার্নাল, ভ্রমণবৃত্তান্ত, স্মতিকথা, ডায়েরিতে পেশাদার নর্তকী ও তাদের নাচ সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। বাংলায় ইংরেজ বণিকদের বাংলোয় বিনোদন কিংবা উৎসবের অবিচ্ছেদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছিল পেশাদার নর্তকীদের নাচ। উনিশ শতকের প্রথমভাগে কলকাতায় বাস করা, বিশিষ্ট শিল্পী এসসি বার্নোজ কলকাতার দুর্গা পূজায় নাচের আসরের জীবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন, ‘জাঁকজমকপূর্ণ হলে প্রবেশ করেই আলো, দেয়ালের রঙ, পিতলের মোমবাতিদানির দীপ্তিতে আমার চোখ ঝলসে গেল। দারুণ কাচের খিলান, চিত্রকর্ম, সোফা, চেয়ার, তুর্কি কার্পেট প্রভৃতি এ জমকালো হলটিকে সজ্জিত করেছিল। এর সঙ্গে বাজছিল বিভিন্ন ধরনের সংগীত— ইউরোপীয় ও ভারতীয় উভয়ই।... নর্তকীদের ঝলমলে পোশাক, তাদের ধীর কিন্তু মাধুর্যপূর্ণ নাচ...।’ তিনিসহ ইউরোপীয় চিত্রশিল্পীরা যত্ন করে এঁকেছেন নর্তকীদের চিত্র। চার্লস ডয়েলি ১৮১০ সালে কলকাতার দুর্গা পূজায় নর্তকীর নাচের ছবি এঁকেছেন। একটা বিষয় খোলাসা হওয়া প্রয়োজন, নর্তকীরা সে আমলে বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেই জনপ্রিয় ছিলেন। ব্রিটিশ শিল্পী ও লেখক জেমস ফোর্বস (১৭৪৯-১৮১৯) তার ওরিয়েন্টাল মেমোয়ারসে নর্তকীদের সম্পর্কে লিখেছেন, “তারা অত্যন্ত কমনীয়... তাদের চালচলন অত্যন্ত শালীন, যা অন্য দেশের একই ধরনের পেশার নারীদের চেয়ে একেবারে ভিন্ন।”

মধ্যযুগে বাংলার মুসলিম সমাজেও অভিনেত্রী ও নর্তকীদের দিয়ে অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের বাসায় ভোজের আয়োজন করলে মেহমানদের বিনোদনের জন্য অভিনেত্রী ও নর্তকীদের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতেন। চৈনিক সূত্র থেকে জানা যায়, অভিনেত্রীরা পুষ্পখচিত নকশা করা রেশমি কাপড় পরতেন। এক চীনা দূত বাংলার সংগীত ও নৃত্যকলার দারুণ প্রশংসা করেছেন। তার কথায়, ‘সুরা পান ও ভোজানুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তুলতে বাঙালিরা ছিল সুগায়ক ও নৃত্যপটীয়সী।’

চীনা সূত্র থেকে সুলতানি আমলে বাংলায় পেশাদার সংগীতশিল্পীদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তারা সম্ভ্রান্ত ও ধনী ব্যক্তিদের ভোরে ও মধ্যাহ্নে গান ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে শোনায়। মহুয়ান বলেন, ‘সেখানে (বাংলায়) আরেক শ্রেণীর সংগীতশিল্পী রয়েছেন, এরা প্রতিদিন ভোর ৪টায় উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও ধনী ব্যক্তিদের গৃহে গমন করেন; কেউ তুরী যন্ত্র বাজান, কেউ ক্ষুদ্র ঢোল বাজান এবং কেউ বা একটু বড় ধরনের ঢোল বাজান। আরম্ভ করার সময় তাদের কণ্ঠ থাকে মন্থর। ধীরে ধীরে তাদের কণ্ঠ বাড়তে থাকে। তারপর একসময় সহসা সংগীত থেমে যায়। এভাবে তারা প্রতি গৃহে গৃহে গমন করে। খানাপিনার সময় আবার তারা সেসব গৃহে উপস্থিত হন। এ সময় তারা খাদ্যসামগ্রী বা টাকাপয়সা উপহার পেয়ে থাকেন।’

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে মুসলিম সমাজে এ সংগীতশিল্পীরা সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষ ছিলেন। ধর্মীয় তত্ত্বে জাতপাতের বিধান না থাকলেও মুসলিম সমাজে শ্রেণী-পেশার ভিত্তিতে সামাজিক অবস্থানের যথেষ্ট বিভাজন ছিল। জেমস ওয়াইজ তার নোটস অন দ্য রেসেস, কাস্টস অ্যান্ড ট্রেডস অব ইস্টার্ন বেঙ্গল গ্রন্থে লিখেছেন, পূর্ববঙ্গের মুসলমান সংগীতকারদের স্থান সমাজের নিচুতলায়। পূর্ববঙ্গের মুসলমান সংগীতকার হলেই সে হবে দাইয়ের স্বামী কিংবা সে হবে নাপিত (হাজাম)। তায়ফদার নামে পরিচিত বাদক দলে বাইজিরা থাকতেন এবং এরা অতি অবশ্যই মুসলিম সম্প্রদায়ের ছিলেন।

মধ্যযুগে বাংলায় নৃত্যকলাচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনীতে। বেহুলা মোটেই নর্তকী ছিলেন না। কিন্তু স্বামীকে বাঁচাতে তিনি দেবলোকে তার নাচ দিয়ে দেবতাদের মোহিত করেছিলেন এবং স্বামীর জীবন ফিরে পান। অর্থাৎ নৃত্যকলা তখন পরিবারগুলোয় শিক্ষা দেয়া হতো।

মোগল আমলে ঢাকায় নৃত্যকলায় যথেষ্ট সমৃদ্ধি ছিল, তার ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। শার্লিম্যান তার বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে জানিয়েছেন, ঢাকায় ইসলাম খানের (সুবেদার) দরবারে ১ হাজার ২০০ কাঞ্চনী ছিলেন। এরা পেশাদার নৃত্যশিল্পী ছিলেন। কাঞ্চনীদের এ সংখ্যা থেকে বলা যায়, ঢাকায় আগে থেকেই নাচ-গানের একটি সমৃদ্ধ ও ধারাবাহিক চর্চা ছিল। ঢাকার নর্তকীদের সুনাম দিল্লিতে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কানেও পৌঁছেছিল। তিনি নাকি ঢাকা থেকে গায়ক ও নর্তকী চেয়ে পাঠিয়েছিলেন।

ঢাকার নওয়াব আবদুল গনি ও নওয়াব আহসানউল্লাহর দরবারে বেশ কয়েকজন বাইজি ছিলেন। হাকিম হাবিবুর রহমান তার ঢাকার স্মৃতিতে লিখেছেন, নওয়াব আবদুল গনির সবচেয়ে বিখ্যাত বাইজি ছিলেন আচ্ছি বাঈ। ১৯১৪-১৫ সালে তিনি মারা যান। বিশ শতকে ঢাকার আরেকজন বিখ্যাত বাইজি ছিলেন জিন্দাবাহার লেনের দেবী বাইজি বা দেবী বালা। ১৯১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে খাজা হাবিবুল্লাহর বিয়ের অনুষ্ঠানে দেবী বাইজি নাচ পরিবেশন করেছিলেন। এই দেবী বাইজি ঢাকায় নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র (নির্বাক) দ্য লাস্ট কিস-এ অভিনয় করেছিলেন।

অর্থাৎ ঔপনিবেশিক আমলেও সমাজে নৃত্যশিল্প এ রকম একটি প্রাতিষ্ঠানিক-সামাজিক চেহারা বজায় রেখেছিল। কিন্তু এ আমলেই এ নৃত্যশিল্পের কফিনে পেরেক ঠোকা হয়েছিল।  খ্রিস্টান মিশনারি ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয় সমাজ সংস্কারকরা এ নাচের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন। যুগ যুগ ধরে ভারতীয় নারীদের হাতে যে নৃত্যকলা লালিত হয়ে এসেছিল, তা এবার নৈতিক সেন্সরশিপের কবলে পড়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেল।

মোগল শাসন পতনের পর থেকেই ভারতের পারফর্মিং আর্ট হিসেবে নৃত্য তার জৌলুস হারাতে থাকে। তার পরও উত্তর ভারতে অওধ ও দক্ষিণ ভারতে তাঞ্জোর তখনো আলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের মধ্যভাগে এ দুটি কেন্দ্র ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিল্পটির বাতি নিভে আসে। এর মধ্যে হাজির হয় পশ্চিমা নৈতিকতার বার্তা। ভারতে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত একটি মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী তৈরি হয়, যারা ব্রিটিশদের নৈতিকতার পাঠ নিয়ে প্রভাবিত। নিজ ভূমির ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। অনেক ব্রিটিশ লেখক, পর্যটক ভারতের নৃত্যকলার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ভালোভাবে না বুঝেই তাকে অনৈতিক, অশ্লীল বলে মত দেন। তাদের এসব লেখা আবার ভারতের নব্য পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মনে ধরে। তারাও পারফর্মিং আর্ট হিসেবে নাচের বিরোধিতায় নেমে পড়েন। এ পশ্চিমা ও ভারতীয় মধ্যবিত্তরা পেশাদার নৃত্যশিল্পী বা দেবদাসীর সঙ্গে পতিতাদের কোনো পার্থক্য না করে তাদের সবাইকেই অসৎ নারী বলে আখ্যা দেয়।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেমন ব্যবসা করছিল, তেমনি খ্রিস্টান মিশনারিরাও এ ভূখণ্ডে তাদের তত্পরতা বৃদ্ধি করে। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাপাখানা, হাসপাতাল তৈরি করে সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। একই সঙ্গে তাদের ধর্মীয় মতাদর্শ ও নৈতিকতাকেও ভারতীয় সমাজে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছিল। ধর্মকে খুব বেশি ছড়াতে না পারলেও তাদের নৈতিকতাকে যে পেরেছিল, সেটা ভারতীয় পোশাক ও পারফর্মিং আর্টের ক্ষেত্রে ধারণার পরিবর্তনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মিশনারিরা খ্রিস্টান সভ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় ধর্ম, সামাজিক রীতি-নীতির সমালোচনা শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে এটাও বলা শুরু হয় যে, নাচ খ্রিস্ট-বিরোধী ধারণার উদ্রেক করে। অন্যদিকে ১৮৫৭ সালের পর থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে ভারতে বিলেতি মেমসাহেবদের আগমন বেড়ে যায়। ফলে সাহেবদের বিনোদনে নাচের আবেদন কমতে থাকে। মিশনারি ও শিক্ষিত ভারতীয়দের নাচবিরোধী প্রচারণা একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় ১৮৯২ সালে মাদ্রাজে। সেখানে ‘নাচবিরোধী’ একটি আন্দোলন শুরু হয়, যা দেশের অন্যান্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান লিটারেচার সোসাইটি। এরা নর্তকীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়েছিল।

১৮৫৭ সালের পর লক্ষেৗ থেকে অনেক বাইজি মুর্শিদাবাদ ও ঢাকায় চলে আসেন। বাংলার অনেক জমিদার এ বাইজিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। যেমনটা তৎকালীন ভারতবর্ষের অনেক রাজ-নবাবরা করেছেন। ঢাকার বিভিন্ন উৎসবে কলকাতা, বেনারস, লক্ষেৗ থেকে নর্তকীরা এসে নাচতেন। এদের অনেকে আবার দীর্ঘদিন ঢাকায় বাস করেছেন। ঢাকায় নর্তকী বা বাইজিদের পাশাপাশি আরেকটি নাচ ছিল, যা খেমটা নাচ নামে পরিচিত। খেমটা নাচনেওয়ালিরা খেমটাওয়ালি নামে পরিচিত ছিল। খেমটা ছিল রসাত্মক, কিছুটা হালকা, উত্তেজক ঘরানার। অন্যদিকে বাইজিদের নাচ ছিল অভিজাত। ঢাকার বাইজি নাচের জীবনকাল ফুরিয়ে যায় গত শতকের চল্লিশের দশকে।

১৮৭৫ সালে ভারত সফরে এসেছিলেন প্রিন্স অব ওয়েলস। তাকে শ্রীরঙ্গম মন্দিরের দেবদাসীরা নাচের মাধ্যমে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এরপর ১৮৯০ সালে ভারতে আসেন প্রিন্স অ্যালবার্ট ভিক্টর। তার জন্য এক নাচের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন মহল থেকে এর সমালোচনা হয়। বিশেষত মিশনারিদের পক্ষ থেকে। এ মিশনারিদের নেতৃত্ব দেন রেভারেন্ড জে. মারডক। তিনি ভারতীয় সমাজ সংস্কারের জন্য বেশকিছু প্রবন্ধ লেখেন, যেখানে তিনি মূলত আক্রমণ করেছেন ভারতীয় নর্তকীদের। ব্রিটিশ অভিজাতদের কাছে আবেদন জানানো হয়, তারা যেন নাচের আসর হয়, এমন কোনো অনুষ্ঠানে না যান। মাদ্রাজের ক্রিশ্চিয়ান সোসাইটির পক্ষ থেকে ১৮৯৩ সালে একটি প্যাম্ফলেটে ইংরেজ নারীদের কাছে আবেদন জানানো হয়, তারা যেন কোনো নাচের অনুষ্ঠানের যোগ না দেন এবং তাদের স্বামীদেরও এ ধরনের অনুষ্ঠানে যেতে বাধা দেন। নাচবিরোধী প্রচারণা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যখন ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক বিশুদ্ধতাবাদী আন্দোলনগুলো এর পেছনে দাঁড়ায়। সমাজ সংস্কারক কেশবচন্দ্র সেন কড়া ভাষায় নর্তকীদের সমালোচনা করেন, যা নাচবিরোধী প্রচারণায় শক্তি জোগায়। মাদ্রাজে চরম আকার নেয়া নাচবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ বাংলায়ও লেগেছিল। ১৮৯৪ সালের ৮ ডিসেম্বরের সঞ্জীবনী জার্নালে স্যার চার্লস এলিয়টের সমালোচনা করা হয় একটি নাচের আসরে যোগ দেয়ায়। পরবর্তীতে সংস্কারকরা লর্ড কার্জনের কাছেও বিষয়টি নিয়ে সাক্ষাৎ করেন, কিন্তু কার্জন বিষয়টিকে তেমন পাত্তা দেননি।

ব্রিটিশ নৈতিক সংস্কারকরা চাচ্ছিলেন, সরকারিভাবে যেন নাচের আসরে ইংরেজ কর্তাদের গমনকে নিষিদ্ধ করা হয়। তাতে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এ নাচ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। ১৯০০ সালে প্রকাশিত হয় মারকাস ফুলারের গ্রন্থ দ্য রংস অব ইন্ডিয়ান ওম্যানহুড। তিনি ছিলেন বোম্বের একজন মিশনারির স্ত্রী। মারকাস তার গ্রন্থে নাচ প্রথা ও মন্দিরে দেবদাসী প্রথার নিন্দা করেন। এদের প্রচারণা ১৯০৫ সালে ফল বয়ে আনে। মাদ্রাজে প্রিন্স অব ওয়েলসের রিসেপশনে নাচের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। ভারতের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যশিল্পের ঘাড়ে এ নৈতিক সেন্সরশিপ মরণ আঘাত হানল। খ্রিস্টান ও স্থানীয় সংস্কারকদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন ওটো রখফিল্ড। তিনি ১৯২০ সালে তার ওম্যান অব ইন্ডিয়ায় লেখেন, “ভারতের জীবিত শিল্পগুলোর মধ্যে নাচ অন্যতম। এ নাচ জীবন্ত ও বিকশিত... নাচ মানুষের আত্মাকে ছুঁয়ে যায়। এটা জীবন্ত ও জবরদস্ত। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, এ শিল্প কিছু প্রগতিশীল সংস্কারকদের স্বেচ্ছাচারী আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তারা এসব করছেন নৈতিকতার প্রেক্ষিত থেকে। তারা কিন্তু নাচ ও গানগুলোকে অনৈতিক বলতে পারছেন না। বরং তারা নর্তকীদের অনৈতিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। এখানে নাচ মাধুর্যমণ্ডিত ও জাঁকজমকপূর্ণ, কিন্তু এর ধরন যথেষ্ট রক্ষণশীল। এটা ঠিক যে, বিবাহিত নারীদের মতো নর্তকীদের কাছ থেকে সতীত্ব বা চরিত্র নিয়ে কঠোর নিয়ম আশা করা যায় না। এসব সতীত্ববিষয়ক নিয়মে নর্তকীদের শিথিলতা কী করে একটি জাতির মূল্যবোধ ও আবেগকে আঘাত করতে পারে, তার কোনো ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাই না। শিল্পকে তার অনুসারীর কোনো পাপ দিয়ে কলঙ্কিত করা যায় না। স্বাধীন, গর্বিতভাবে জীবনধারণ করা একদল নারীকে অবনমিত করা, তাদের অচ্ছুত করে তোলা শুধু পাপ নয়, বরং জীবনের বিরুদ্ধে করা একটি মস্ত ভুল।”

ঐতিহ্য সংরক্ষণবাদীরা দেবদাসী ও নর্তকীদের প্রতি সমাজের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। অন্যদিকে সংস্কারবাদীরা নাচ ও নর্তকীদের কলঙ্কিত করেন। যে নর্তকীরা সচ্ছল জীবনযাপন করতেন, তারা এবার পথের ভিখারি হয়ে গেলেন। নৃত্য ও সংগীতের পণ্ডিতদের নতুন পেশার সন্ধানে পথে নামতে হলো। কিছু রাজ্যে এমন কিছু পণ্ডিত তখনো আশ্রয় পেয়েছিলেন। নর্তকীদের আসরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তাদের কুঠি বিরান পড়ে রইল। আর্য সমাজ থেকে ঘোষণা করা হলো, সভ্য সমাজে নর্তকীদের পেশার কোনো জায়গা থাকতে পারে না।

বাইজি, তাওয়ায়েফ, দেবদাসী বা নায়িকা, নর্তকী, বাইজি, নাচ গার্ল— যে নামেই নৃত্যশিল্পীদের ডাকা হোক না কেন, গত শতকের বিশ ও তিরিশের দশকে ভারতীয় ক্ল্যাসিক্যাল নৃত্যের পুনর্জাগরণ হয়। এ জাগরণের পেছনে বিদেশী কয়েকজন শিল্পীর একটি বিরাট ভূমিকা ছিল, যার মধ্যে আছেন কিংবদন্তি রুশ ব্যালেরিনা অ্যানা পাভলোভা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রুথ ডেনিস ও টেড শন। অন্যদিকে ভারতে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে আছেন উত্তর ভারতের গুরুদেব ঠাকুর, উদয় শংকর ও মেনকা; দক্ষিণ ভারতের ই. কৃষ্ণ আইয়ার, রুক্মিনী দেবী ও রাগিণী দেবী। এ শিল্পীরা ভারতীয় নৃত্যের অতীত গৌরব সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করেন। নাচ নিয়ে সমাজে গড়ে ওঠা কুসংস্কারকে তারা ভাঙতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং নাচকে সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পারফর্মিং আর্টিস্টদের নতুন ঠিকানা হয় রেডিও ও টেলিভিশন। তবে এসবই হয়েছিল সেই ঔপনিবেশিক নৈতিকতার কাঠামোর মধ্যে।

অল ইন্ডিয়া রেডিও বা সিনেমার মাধ্যমে কিছু শিল্পী পুনরায় কাজের সুযোগ পেলেন, কিন্তু বেশির ভাগই ততদিনে স্মৃতির অতলে বিস্মৃত হয়েছিলেন। ১৯৩০-এর দশকে ক্লাসিক্যাল শিল্পের কিছু সমঝদার ভারতের পারফর্মিং আর্টকে পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করেন। তবে তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এ শিল্পকে তাওয়ায়েফ ও দেবদাসী নামক ‘কুখ্যাত’ পরিচয় থেকে মুক্ত করা। ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভের পরও সমস্যা কাটল না। অল ইন্ডিয়া রেডিও পেশাদার গায়িকাদের কাজে নিল না। কারণ তাদের ব্যক্তিগত জীবন নাকি কলঙ্কময়। তাই এবার স্বাধীন দেশের সরকার নৈতিক পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। শিল্পীদের কাছে তাদের সামাজিক জীবনের মর্যাদা দাবি করা হলো। অর্থাৎ তাদের এবার আর স্বাধীন শিল্পী হিসেবে ‘বাঈ’ হয়ে থাকা চলবে না। এবার তাদের কারো ঘরণি হয়ে ‘দেবী’ বা ‘বেগম’ হতে হবে। অর্থাৎ নৃত্য কিংবা নর্তকীদের পুনরুজ্জীবন হলেও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান নিল।

 

সূত্র :

নাচ গার্ল অব দ্য রাজ, প্রাণ নেভিল

বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলা একাডেমি

পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ, হেমস ওয়াইজ (অনুবাদ : ফওজুল করিম),

রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর ও উত্তরকাল, দ্বিতীয় খণ্ড, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি