একটা জেলা শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা হেঁটে যেতে যেতে সড়কের দুই পাশ দিয়ে চোখে পড়বে অনেক বিদ্যাপীঠ। ব্যাপারটি বেশ চমকপ্রদ। যদি কখনো খেয়াল না করে থাকেন, পরে মিলিয়ে নেবেন। হলফ করে বলা যায়, এ শহর বিদ্যোৎসাহীদের আরাধ্য আশ্রম। ভণিতা ভাঙার আগেই শহরের নামটি যে ফরিদপুর, তা এ অঞ্চলের লোকেরা এরই মধ্যে বুঝে গেছেন। জ্ঞানলাভের এসব প্রতিষ্ঠান সভ্যতার মূর্ত প্রতীক হয়ে আজও তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। মনে হবে এরা একে অন্যের হাত ধরে আছে। এদের মাঝে সবচেয়ে যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম রাজেন্দ্র কলেজ। এক শতাব্দীর অধিক ঘটনাবহুল সময়ের নীরব সাক্ষী!

১৮৫১ সালের মাদারীপুরে জন্ম নেয়া অম্বিকাচরণ মজুমদার (১৮৫১-১৯২২) এ কলেজের প্রধান স্বপ্নদ্রষ্টা। ওকালতি ছিল যার পেশা, আর কংগ্রেসের রাজনীতি ছিল নেশা। ১৯১৬ সালে তিনি নিখিল ভারত কংগ্রেসের ৩১তম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাঝখানে কিছুদিন অধ্যাপনাও করেন। শিক্ষকতায় মন বসেনি, তাতে কী? শিক্ষার প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। তাই তো শিক্ষা-দীক্ষায় ফরিদপুরকে এগিয়ে নিতে নিরলস কাজ করে গেছেন। রাজেন্দ্র কলেজ প্রতিষ্ঠা তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ।

এ কলেজ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ জার্নি রয়েছে। ১৯১২ সালে যখন লর্ড কারমাইকেল ফরিদপুরে আসেন, তখন দাবি ওঠে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার। কিন্তু কারমাইকেলের মন গলেনি। প্রচেষ্টা তাই ভেস্তে যায়। এগিয়ে আসেন অম্বিকাচরণ মজুমদার। তিন বছর পর ১৯১৫ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গড়ে তোলেন একটি কমিটি। ২১ নভেম্বর এ কমিটির সবাই ফরিদপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একমত হন। পরের বছর ১৯১৬ সালের ৯ জানুয়ারি কমিটি বিশদ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে সমর্থ হয়। তারা শহরের পুব পাশের খেলার মাঠে কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। মাঠে থাকা মেলা ভবন কলেজ ভবনে রূপান্তর করতে উদ্যোগী হন। এজন্য সব মিলিয়ে খরচ ধরা হয় ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা নিয়ে কমিটি দুশ্চিন্তায় পড়ে।

অম্বিকাচরণ হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র ছিলেন না। কমিটির সবাইকে নিয়ে তিনি জেলার দানশীলদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেন। আহ্বানে সাড়া দিয়ে মহারাজ মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী কলেজের হোস্টেল নির্মাণের জন্য দান করেন ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু সব মিলিয়ে তাতেও বিশাল অংকের টাকা ঘাটতি থাকে। পরে অম্বিকাচরণ তার মক্কেল বাইশরশির জমিদার রমেশচন্দ্র রায় চৌধুরীর শরণাপন্ন হন। রমেশচন্দ্র কলেজের জন্য ৫০ হাজার টাকা দিতে রাজি হলেন। কিন্তু শর্ত জুড়ে দিলেন কলেজের নাম হতে হবে তার মৃত পিতা রাজেন্দ্র চন্দ্র রায়ের নামে। আর কোনো উপায় না পেয়ে ১৯১৬ সালের ১৩ অক্টোবর কমিটির সব সদস্য মিলিতভাবে নামকরণের এ প্রস্তাবে সম্মতি দেন। এভাবেই প্রতিষ্ঠায় কোনো রকম ভূমিকা না থাকার পরও রাজেন্দ্র চন্দ্র রায় কলেজের নামের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে যান।

তবে কলেজের নামে জায়গা বরাদ্দ পেতে সময় লাগে আরো কিছুদিন। সম্মিলিত প্রয়াসে ১৯১৮ সালের ১২ মার্চ খেলার মাঠের ৫ দশমিক ৫৫ একর জমি বরাদ্দ পায় কলেজ কমিটি। জেলা কালেক্টর তা কলেজ কমিটির কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর ৮ এপ্রিল জেলা কালেক্টর মিস্টার ডানলপ কলেজ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

এবার সামনে এল নতুন চ্যালেঞ্জ। সব বিফলে যাবে যদি কলেজটি সরকার অধিভুক্ত না করে। বারবার চেষ্টার পর শেষে সে চ্যালেঞ্জও উতরে যান অম্বিকাচরণ মজুমদার। ১৯১৮ সালের ১৩ মে ভারত সরকার কলেজটিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার অনুমোদন দেয়। ১ জুন অধ্যক্ষ ও ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন কামাখ্যানাথ মিত্র। পরে আরো ১২ জন অধ্যাপক কলেজে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১ জুলাই ২৯ জন বিদ্যার্থী নিয়ে কলা বিভাগে শুরু হয় প্রথম ক্লাস। আর এভাবেই একটি মহৎ উদ্যোগ সাফল্যের মুখ দেখে। ১০০ বছর পেরিয়ে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন ফরিদপুরকে স্বতন্ত্রভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়।

১৯২৩ সালে ইংরেজি, দর্শন ও অংকশাস্ত্রে অনার্স কোর্স চালু করার অনুমতি দেয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। সে আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কলেজে অনার্স কোর্স চালু হওয়া বিরল ঘটনাই বটে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর সে বছরই জারি হয় ‘ইস্ট বেঙ্গল এডুকেশন অর্ডিন্যান্স’। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী সব প্রতিষ্ঠানকে অধিভুক্তির ক্ষমতা দেয়া হয়। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় অধিভুক্তীকরণের কোনো কর্মসূচির কথা ভাবা হয়নি। অধ্যাদেশের ফলে ১৯৪৭ সালেই দেশের অন্যান্য কলেজের সঙ্গে রাজেন্দ্র কলেজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজস্ব ক্যাম্পাসের বাইরে পরিচালিত সব অনার্স কোর্স বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তাই ১৯৪৯ সাল থেকে রাজেন্দ্র কলেজে অনার্স কোর্স পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব খানের সরকার বেসরকারি ডিগ্রি কলেজ সরকারীকরণের উদ্যোগ নেন। এ বছরই রাজেন্দ্র কলেজকে জাতীয়করণ করা হয়।

ষাটের দশকেই রাজেন্দ্র কলেজের আরেকটি ক্যাম্পাস নির্মাণ শুরু হয়। শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে বায়তুল আমানে স্থাপন করা হয় বেশ কয়েকটি একাডেমিক ভবন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে কলেজে নতুন করে যুক্ত হয় বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স কোর্স। ১৯৮৪ সালে ডিগ্রি পাস কোর্স ও অনার্স কোর্সের ক্লাস শুরু হয় বায়তুল আমান ক্যাম্পাসে। ১৯৯৮ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় উচ্চ মাধ্যমিক কোর্স। এক দশক পর ২০০৮ সালে পুনরায় উচ্চ মাধ্যমিক কোর্স চালু হয়। বর্তমানে ১৯টি বিষয়ে অনার্স ও ২০টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। শিক্ষক রয়েছেন ১৭১ জন, আর প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী। রয়েছে দুই ক্যাম্পাসে দুটি বিশাল খেলার মাঠ। এছাড়া সহশিক্ষা কার্যক্রম নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি, বিতর্ক, স্কাউটিং, বিএনসিসি, সন্ধানী ডোনার ক্লাবসহ দক্ষতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে এমন নানা কার্যক্রমে কলেজের শিক্ষার্থীরা বরাবরই জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে।

লাল-হলুদ-নীল-সাদা-কালো রঙের আশ্রয়ে আঁকা কলেজের বর্তমান লোগোর শিল্পী সাজেদুল ইসলাম তাতা। লোগোয় দৃশ্যমান বইয়ের মাঝে জাজ্বল্যমান প্রদীপ, বীণা, ফুটবল ও ক্রিকেট ব্যাট ঠাঁই করে নিয়েছে। ফরিদপুরের অনেক কীর্তিমান ব্যক্তি রাজেন্দ্র কলেজে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে কবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-৭৬), গল্পকার নরেন্দ্রনাথ মিত্র (১৯১৬-৭৫), চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেন (১৯২৩-২০১৮) প্রমুখ।

রাজেন্দ্র কলেজ যে আজ ফরিদপুরের অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এ ঐতিহ্য যেন ম্লান না হয়, বজায় থাকে এবং দিনে দিনে তার মান আরো বৃদ্ধি পায়—এমন প্রত্যাশা বোধ করি সব রাজেন্দ্রিয়ানের।

 

এইচএম মেহেদী হাসান: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক; রাজেন্দ্র কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী